মনিরা, এ তুমি কি বলছে?
না, না, তুমি চলে যাও, আমি চাইনা তোমাকে।
বনহুরের মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠেছে। কত আশা আর আকাখা নিয়ে সে আজ হোটেল থেকে রাতের অন্ধকারে চলে এসেছে। এখনও সে আস্তানায় গিয়ে পৌঁছে নাই। নূরীকে হোটেলে রেখে সে এই রাতের প্রতীক্ষায় ছিলো। সব বাসনা মুহূর্তে ধুলিস্মাৎ হয়ে গেলো।
বনহুর টেবিলের পাশে চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়লো। দু হাতে মাথার চুলগুলো টেনে ছিড়তে লাগলো সে। অধর দংশন করতে লাগলো।
মনিরা নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বনহুরের অন্তরের দাহ মনিরার হৃদয়ে যে আঘাত করছেনা, তা নয়। তার মনটাও ব্যথায় গুমড়ে কেঁদে উঠছে। কতদিন পর স্বামীকে পেয়েও সে যেন পাচ্ছে না, কোথায় যেন বাধা।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো, টেবিল থেকে রিভলভারটা হাতে তুলে নিয়ে বললো–বেশ, আর আসবোনা।
মনিরার অন্তর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো, কিন্তু একটা দারুণ অভিমান তাকে যেন সংজ্ঞাহারা করে ফেলেছিলো। স্বামী চলে যাচ্ছে, তবু এক পাও এগুতে পারছে না।
বনহুর যেমন এসেছিলো তেমনি বেরিয়ে গেলো মনিরার কক্ষ থেকে।
বনহুর বেরিয়ে যেতেই মনিরা ছুটে গিয়ে ঘুমন্ত নূর কে বুকে চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কেনো সে এমন ভুল করলো, কেনো সে স্বামীকে অমন বিমুখ করে ফিরিয়ে দিলো। কেনো বলতে পারলো না মনের গোপন কথা। সে তো কিছুই জানলোনা বা বুঝতে পারলোনা। মনিরা যা বললো সে তার মনের কথা নয়। সে ভুল বুঝলো তাকে, হয়তো আর কোন দিন সে আসবেনা। একি করলো মনিরা, কত আরাধনার পর তবেই না তাকে ফিরে পেয়েছিলো। কেনো সে এমন কাজ করলো। ব্যথা-বেদনায় ভেংগে পড়লো মনিরা।
০৭.
মনিরার নিকট থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে চললো বনহুর। বহুদিন পর কত আশা আকাংখা আর বাসনা নিয়ে ছুটে গিয়েছিলো সে মনিরার পাশে। মনিরা আজ তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করবে–ভাবতেও পারেনি সে।
মনিরাকে একটু দেখবার জন্য কতদিন ধরে মন তার অস্থির হয়ে পড়েছিলো। মনিরার বিরহ-বেদনা তাকে অহঃরহঃ উদ্বিগ্ন করে রাখতো, আর আজ সেই মনিরা তাকে …….না, না, মনিরা তো এমন ছিলনা কোনদিন। আজ সে এতোদিন পর তাকে কাছে পেয়েও এতোটুকু খুশি হলো না। কেনো, কেনো মনিরা এমন হলো…
বনহুর আপন মনে পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ তার কানে এলো কোন এক করুণ কণ্ঠের বিলাপ ধ্বনি।
–মায় ভূখা হু, খোদা কে ওয়াস্তে মুঝে কুছ খানা দো–মায় ভূখা ই–
থমকে দাঁড়ালা, বনহুর, কান পেতে শুনলো শব্দটা কোন্ দিক থেকে আসছে।
তখনও করুণ আর্তকণ্ঠ শোনা যাচ্ছে–খোদা কে ওয়াস্তে মুঝে কুছ খানা দো।
বনহুর অন্ধকারে এগিয়ে গেলো, দেখতে পেলো–অদূরে ফুটপাতে এক বৃদ্ধ বসে বসে ধুকছে, আর বিলাপ করছে।
বনহুর বৃদ্ধের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো, পকেটে হাত দিয়ে বিমর্ষ হলোপকেট শূন্য। দ্বিতীয় পকেটে হাত দিতেই হাতে উঠে এলে সেই লকেটখানা, যে লকেটখানা বনহুর কৌশলে পারভীনের কণ্ঠ থেকে আত্মসাৎ করেছিলো।
বনহুর বেশি কিছু চিন্তা করবার অবসর পেলো না, লকেটটা খুঁজে দিলো বৃদ্ধের হাতের মুঠায়।
দুহাত তুলে বৃদ্ধ দোয়া জানাতে লাগলো।
বনহুর তখন নিজের গন্তব্য পথে পা বাড়িয়েছে।
০৮.
হোটেল কক্ষে প্রবেশ করে এগিয়ে গেলো শয্যার দিকে। চমকে উঠলো বনহুর নূরী তার বিছানায় শায়িত। শিয়রের টেবিলে ডিম লাইট জ্বলছে।
বনহুর নূরীর ঘুমন্ত মুখে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।–মনিরার মুখখানা ভেসে উঠলো তার চোখের সম্মুখে। নূরীর মুখ মুছে গেলো ধীরে ধীরে।
বনহুর নূরীর পাশে বসে হাত রাখলো নূরীর হাতে।
চমকে জেগে উঠলে নূরী, ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে চোখ রগড়ে বললো নূরী–হুর, কখন এলে?
নুরী জেগে উঠতেই বনহুর উঠে দাঁড়িয়ে ছিলো, মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে বললো–এখনই এলাম।
কোথায় গিয়েছিলে?
বনহুর কোন জবাব না দিয়ে ওদিকের খোলা জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়।
নূরী শয্যা ত্যাগ করে উঠে আসে বনহুরের পাশে–ও ঘরে আমার বড়। ভয় করছিলো।
বেশ, তুমি এ কক্ষেই শোও।
আর তুমি?
আমার ঘুমের কোন প্রয়োজন হবে না।
সেকি হুর?
নূরী! বনহুর নূরীকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিলো। কিন্তু মুহূর্তে নূরীকে সরিয়ে দিয়ে বললো বনহুর–তুমি শুয়ে পড় নূরী, আমি মেঝেতে শুচ্ছি।
বনহুর একটা চাদর আর বালিশ নিয়ে হোটেল কক্ষের মেঝেতে শুয়ে পড়লো
নূরী দাঁড়িয়ে রইলো স্তব্ধ হয়ে।
বনহুর পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে বললো–রাত বেশি নেই। খুব ভোরে আমরা আস্তানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবো। একটু ঘুমিয়ে নাও।
নূরী বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।
০৯.
বনহুর যখন আস্তানায় পৌঁছলো তখন তার অনুচরগণের মধ্যে একটা আনন্দমুখর সাড়া পড়ে গেলো। সর্দারকে ফিরে পেয়েছেএ যেন তাদের রাজ্যজয়ের আনন্দ। সর্দার তাদের শুধু মনিব নয়, পরম আপন জনের চেয়েও অধিক।
সমস্ত আস্তানাটা ঝিমিয়ে পড়েছিলো যেন। কারো মনে ছিলোনা এতটুকু খুশি। সবাই খেতো–ঘুমাতো-বেড়াতো। দরকার মত দস্যুতা করতেও বের হতো কিন্তু তবু যেন কারো মনে শান্তি ছিলোনা।
রহমান তাদের পরিচালনা করতো বটে, তা হলেও সর্দারের অভাব সকলের মনে একটা হাহাকার জাগাতো। কি যেন ছিলো, কি যেন নেইএমনি লাগতো সকলের। যদিও অনুচরগণ দস্যু বনহুরকে ভয় করতো ভীষণ ভাবে, তবুও শ্রদ্ধা করতো অনেক।
