সরকার সাহেব চশমাটা খুলে মুছে নিয়ে আবার বললেন–তাই তো মনে হচ্ছে বেগম সাহেবা!
মনিরা কিন্তু নিশ্চুপ স্থির হয়ে পর্দায় তাকিয়ে আছে। বেঁচে আছে, সুখে আছে, দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে চিত্রনায়ক হয়েছে আর এক বারও মনে পড়ছে তার কথা। কোথায় মা, কোথায় মনিরা আর কোথায় নূর। পুরুষ জাতটাই কি হৃদয়হীন!
ক্রমেই মনিরার অন্তর অভিমানে ভরে উঠে।
নায়িকার সঙ্গে স্বামীর এই ঘনিষ্ঠতা মনিরার হৃদয়ে একটা তীব্র জ্বালা ধরিয়ে দিলো। অসহ্য-অসহ্য এ দৃশ্য। বাসর কক্ষের দৃশ্যে মনিরা দুহাতে চোখ ঢেকে ফেললো, না না, এসব সে নিজ চোখে দেখতে পারবে না। উঠে দাঁড়ালো মনিরা, নূরকে সরকার সাহেবের কোল থেকে টেনে নিয়ে বললোচলো মামীমা, আর দেখবো না।
মরিয়ম বেগম তার হারানো ধন ফিরে পেয়েছেন, তিনি হাঁ করে দৃশ্যের পর দৃশ্য দেখছেন আর বিড় বিড় করে বলছেন–আমার মনির বেঁচে আছে। আমি আগেই বলেছিলাম–সে আবার ফিরে আসবে।
মনিরা উঠে দাঁড়াতেই বললেন মরিয়ম বেগম–চলে যাচ্ছিস মা?
হাঁ, চলো মামীমা, ভাল লাগছে না।
মরিয়ম বেগম বললেন–আর একটু বস্ মা, ওকে দেখতে দে। প্রাণভরে একটু দেখতে…….
অগত্যা মনিরা বসতে বাধ্য হলো।
ইচ্ছে করেই মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো মনিরা। কিন্তু বেশিক্ষণ মুখ ফিরে থাকতে পারলো না সে। বহুদিন পর স্বামীকে দেখার লোভটুকু সংযত রাখা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ালো।
ছবি শেষ হলে হল থেকে বেরিয়ে এলো তারা।
মরিয়ম বেগমের চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস। তিনি গাড়িতে বসে বললেন–আমার মনির বেঁচে আছে, খোদার কাছে আমি লাখো শুকরিয়া করছি।
মনিরা কোন কথা বললো না, নিশ্চুপ বসে রইলো স্থবিবের মত গাড়ির এক পাশে।
নূর তখন সরকার সাহেবকে একটির পর একটি প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে।
বাড়ি ফিরে মরিয়ম বেগম শোকরানার নামায আদায় করলেন। চাকরবাকরদের ডেকে বললেন–ওরে তোরা শুনছিস–আমার মনির বেঁচে আছে। ভাল আছে সে। হাঁ, ভালই আছে, যেখানেই থাক সে, ভাল আছে।
মনিরা যে খুশি হয়নি তা নয়, স্বামী বেঁচে আছে, সুস্থ আছে–এতে কি তার আনন্দ নয়? অন্তরে আনন্দের হিল্লোল বইলেও মুখে তা প্রকাশ পেলোনা। একটা অভিমান দানা বেধে উঠলো তার মনের গহনে। তার স্বামী সুস্থ্য থেকেই তাকে ভুলে আছে, আজ দুবছর হলো একটি দিনের জন্যও কি মনে পড়েনি একবার তাকে। পুরুষ-প্রাণ ঐ রকমই পাষাণ হয়।
নূরু ঘুমিয়ে পড়েছে কখন–পাশের ঘরে ঘুমিয়েছেন মরিয়ম বেগম। গোটী চৌধুরী বাড়ি ঝিমিয়ে পড়েছে। একটি প্রাণীও জেগে নেই।
শুধু চৌধুরী বাড়িই নয়, সমস্ত শহর সুপ্তর কোলে ঢলে পড়েছে। মাঝে মাঝে দুএকটা প্রাইভেট মোটর-কার এদিক থেকে ওদিকে চলে যাবার শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।
মনিরা বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলো, কিছুতেই ঘুম আসছিলো না তার চোখে।
এ কি হলো! এমন তো কোন দিন হয়নি, আজ এতো অস্থির লাগছে। কেনো। সেই যে ছবি দেখে আসার পর একটি বারের জন্য তার চোখের সম্মুখ হতে মুছে যায়নি স্বামীর মুখখানা। সেই পৌরুষ ভরা কণ্ঠস্বর। সেই দীপ্ত সুন্দর নীল চোখ দুটি। সেই কুঞ্চিত কেশ রাশি। প্রশস্ত ললাট, বলিষ্ঠ বাহু, মিষ্টি হাসি, সব যেন আজ আবার বেশি করে মনটাকে আচ্ছন্ন করে তুলছে। কিছুতেই নিজকে সংযত রাখতে পারছে না, স্বামীর বুকে মুখ রাখবার জন্য আকুল হয়ে উঠলো মনিরার প্রাণ।
নূরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে রইলো।
রাত বেড়ে আসছে।
দূর দূরান্ত থেকে ভেসে আসছে কুকুরের গলার আওয়াজ।
মনিরা নিদ্রাহীন চোখে ঠিক তেমনি করে বসে আছে। যেমন সে বসেছিলো নূরের শিয়রে।
আলোটা ডিম করা ছিলো। মনিরা ভাবছিলো, তার স্বামী যার সঙ্গে অভিনয় করলো কে সে মেয়ে, কে সে জ্যোছনা রায়। সত্যি কি তার স্বামীর সঙ্গে জ্যোছনা রায়ের কোন সম্বন্ধ ঘটেছে। হয়তো তাই হবে নইলে এতোদিন কি করে সে ভুলে থাকতে পারে তাকে, আর স্নেহময়ী জননীকে।
মনিরার গণ্ড রেখে গড়িয়ে পড়তে লাগলো অশ্রুধারা।
ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন শার্শি খুলে গেলো আচম্বিতে।
মনিরা চমকে উঠলো, মশারীর বাইরে বেরিয়ে এলো, সে ভয় বিহ্বল চোখে তাকালো শার্শির দিকে।
পর মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর। সমস্ত শরীরে জমকালো ড্রেস। মুখে কালো রুমাল বাধা। দক্ষিণ হস্তে রিভলভার।
বনহুরকে দেখেই মনিরার চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, ছুটে এসে ঝাপিয়ে পড়লো সে তার বুকে। অস্ফুট কণ্ঠে বললোএসেছো?
বনহুর নিজের মুখের রুমাল খুলে ফেললো, গভীর আবেগে মনিরাকে বুকের মধ্যে নিবিড়ভাবে চেপে ধরে বললো–এসেছি। মনিরা কেমন ছিলে?
মনিরা ভুলে গিয়েছিলো অভিমান, ভুলে গিয়েছিলো কিছুক্ষণ আগের কথাগুলো। স্বামীর প্রথম দর্শনে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছিলো সে।
এবার মনিরার মনে উঁকি দেয় রাগ, ক্ষোভ আর অভিমান। স্বামীর বাহুবন্ধন থেকে নিজকে মুক্ত করে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে মনিরা। কেনো এলে তুমি!
বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠে বনহুর–সেকি মনিরা?
হাঁ, না এলেই খুশি হতাম বেশি। মনিরা!
ব্যাকুল কণ্ঠে বললো বনহুর।
মনিরার অভিমান মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো ভীষণভাবে। এতোদিনের স্বামীর বিরহ-বেদনা আজ একযোগে ধাক্কা মারলো তার বুকে। কঠিন গলায় বললো–আমি বেশ ছিলাম, আবার কেনো আমাকে বিরক্ত করতে এলে বলো তো?
