তাই নাকি? নতুন ছবি? যাও, মা-ছেলে দেখে এসো গে। নকিবকে বলে, সবার সাহেবকে ডেকে দেবে খন।
এমন সময় সরকার সাহেব প্রবেশ করলেন কক্ষ মধ্যে–আমাকে ডেকেছেন?
মরিয়ম বেগম বললেন–সরকার সাহেব, মতি মহল হলে নাকি নতুন ছবি এসেছে?
জি হ্যাঁ। বললেন সরকার সাহেব।
বললেন মরিয়ম বেগম–মনিরা ও নূর ছবি দেখতে যাবে, ওদের নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে।
মনিরা বলে উঠে–মামীমা, তোমাকেও যেতে হবে। মান হাসলেন মরিয়ম বেগম–আমার ও সব সখ মিটে গেছে মা, তোমরা যাও।
মনিরা পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো–আজ নূর তোমাকে ছাড়া কোথাও যাবেনা। নূর, সত্যি বলো তো, তোমার দাদীমাকে ছাড়া তুমি ছবি দেখতে যাবে?
মাথা দোলালো নূর–দাদীমা, আজ তোমাকে দেতে হবে। তুমি না দেলে আমি দাবোনা।
শুনলে মামীমা, শুনলে তো?
পাগলা দাদু, আমি বুঝি ছবি দেখতে যাবো?
কোনো দাবেনা দাদীমা? আমি তোমাকে ধলে নিয়ে দাবো। কথাটা বলে নূর মায়ের কোল থেকে নেমে মরিয়ম বেগমের হাত ধরে টানাটানি শুরু করলো।
সরকার সাহেব হেসে বললেন–আজ নূর আপনাকে না নিয়ে গিয়ে ছাড়বে না বেগম সাহেবা।
মরিয়ম বেগম হাসতে লাগলেন।
মনিরা বললো–চলুন না মামীমা, নূর যখন সখ করেছে!
শেষ পর্যন্ত মরিয়ম বেগম মনিরা ও নূরের সঙ্গে ছবি দেখতে যাওয়ার। জন্য রাজি হলেন।
০৬.
অগণিত জনতায় মতিমহল হলের সম্মুখভাগ ভরে উঠেছে। পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত মোটর গাড়ি। নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতীর অসংখ্য ভীড়।
শো শুরু হবার আর বেশি বিলম্ব নেই।
মতিমহল হলে আজ প্রথম শুভমুক্তি কুন্তি বাঈ-হল ফুল। বক্সের আসনে বসে আছে মরিয়ম বেগম আর মনিরা। সরকার সাহেব অদূরে নূরকে কোলে করে বসে আছেন, ফিস ফিস করে কথা বলছেন তিনি তার সঙ্গে।
মরিয়ম বেগম অনেক দিন হতে সিনেমা দেখেন না, কাজেই তিনি অস্বস্তি বোধ করছিলেন।
মনিরা উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করছিলো। ছবি দেখা তার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য তার ছবির নায়ককে দেখবে–সত্যই অন্য কেহ না, তার স্বামী দুস্য বনহুর।
পাশের আসনে এক যুবতী বসেছিলো।
মরিয়ম বেগম যুবতীর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলেন, কারণ শো শুরু হবার এখনও কয়েক মিনিট বাকি।
বললেন মরিয়ম বেগম–তোমার বাড়ি কোথায় মা?
যুবতী অন্য কেহ নয়, গুলবাগ হোটেলের মালিকের কন্যা মিস পারভিন; যার লকেট এখন বনহুরের পকেটে।
তার বহু মূল্যবান লকেট খানা হারিয়ে যাওয়ায় যদিও মন মোটেই ভাল নয়, তবু নতুন ছবি দেখবার সখ দমিয়ে রাখতে পারেনি সে। এসেছে মা ও বোনের সঙ্গে।
মা ও বোন এক পাশে বসেছিলো, পারভিন কয়েকটা সিট সরে এসে বসেছে, এখান থেকে ছবি নাকি তার চোখে ভাল লাগে।
কথায় কথায় অনেক কথা বললো পারভিন, তার লকেট হারিয়ে যাওয়ার কথাও বললো সে মরিয়ম বেগম ও মনিরার কাছে।
শো শুরু হলো।
টাইটেল দেখানো হচ্ছে।
মরিয়ম বেগম অনিচ্ছা সত্বেও তাকিয়ে আছেন পর্দার দিকে। মনিরা পর পর চরিত্র ও নামগুলো পড়ে যাচ্ছিলো।
আতিয়া ফ্লিমের দ্বিতীয় অবদান কুন্তি বাঈ, প্রযোজক আরফান উল্লাহ, পরিচালক…………
মনিরা দ্রুত চরিত্র ও নামগুলো পড়ে যাচ্ছিলো।
আতিয়া ফ্লিমের দ্বিতীয় অবদান কুন্তি বাঈ। প্রযোজক আরফান-উল্লাহ। পরিচালক নাহার চৌধুরী। শ্রেষ্ঠাংশেঃ জ্যোছনা রায় ও মকছুদ চৌধুরী………
মনিরার কণ্ঠ দিয়ে অস্ফুট শব্দ বের হলো–মকছুদ চৌধুরী….
পাশের চেয়ার থেকে পারভিন বলে উঠলো–নতুন কোন নায়ক হবে।
মনিরা কোন জবাব দিলো না।
শো শুরু হলো।
কয়েকটা দৃশ্যের পরই ছবির হিরোর আবির্ভাব হলো।
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা স্তব্ধ হয়ে গেলো–না না, তার মন যা বলেছিলো সেই সত্য। মকছুদ চৌধুরী নয়তার স্বামী বনহুর।
মরিয়ম বেগম কি বলেন শোনার জন্যে উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষা করে মনিরা। পর্দায় তাকিয়ে থাকলেও মন তার পড়ে রইলো মামীমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য।
মরিয়ম বেগম বললেন–একি, আমি কি চোখে ধাঁ ধাঁ দেখছি? মনিরা, কি দেখছিস মা?
মামীমা, তুমি যা দেখছো তাই দেখছি।
এযে আমার মনির ছাড়া কেউ নয়। সরকার সাহেবকে লক্ষ্য করে ডাকলেন এখানে আসুন তো!
মরিয়ম বেগম আর মনিরার কথাবার্তায় বিরক্ত বোধ করছিল পারভিন। সেও কম আশ্চর্য হয়নি, এই যুবকই আজ সকালে তাদের প্লেনে কান্দাই এলেন। নিশ্চয়ই তিনি কুন্তি বাঈ ছবির হিরো। পারভিন স্বচক্ষে এই হিরোকে দেখেছে, এমন কি তার সঙ্গে আলাপ আলোচনাও করেছে সে। পারভিন ভুলে গেলো তার লকেটের শোক। কৃন্তি বাঈ ছবির হিরোর সঙ্গে তার প্রকাশ্য আলাপ হয়েছে–এ কম কথা নয়। মনিরাকে লক্ষ্য করে গর্ব করে বললো–আজই আমি কুন্তি বাঈ ছবির হিরো মকছুদ চৌধুরীর সঙ্গে একই প্লেনে এলাম।
কথাটা কানে যেতে মনিরা ছবি দেখা বন্ধ করে তাকালো পারভিনের মুখের দিকে মকছুদ চৌধুরীকে আপনি চেনেন?
হাঁ, তার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে। আজই তিনি তার এক বান্ধবী সহ কান্দাই এসে পৌঁছেছেন।
সত্যি! মনিরা পারভিনের হাত মুঠোয় চেপে ধরলো।
পারভিন মনিরার ব্যাকুলতা লক্ষ্য করে বিস্মিত হলো। এ এমন করছে কেন? মকছুদ চৌধুরীর অপরূপ রূপ একে একবারে উন্মুক্ত করে তুলছে। কিছুটা রাগও হলো পারভিনের, ছবি দেখায় অসুবিধা হচ্ছে, কাজেই পারভিন উঠে চলে গেলো, যেখানে বসে ছবি দেখছিলো তার মা আর বোন।
মরিয়ম বেগম তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে আছে পর্দার দিকে। দুচোখে তার অপলক চাহনী। নিশ্বাস পড়ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। বিড় বিড় করে হঠাৎ বলে উঠেন–আমার মনির ছাড়া ও কেউ নয়। মকছুদ চৌধুরী ও নয়। আমার মনির… দেখছোনা সেই?
