যুবতী বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে দেখা করবেন?
হেসে বললো বনহুর–নিশ্চয়ই।
একসঙ্গে সারিবদ্ধভাবে যাত্রীগণ প্লেন থেকে অবতরণ করছে। যুবতী ইচ্ছা করেই একটু পিছিয়ে পড়লো, বনহুরের পাশে গা ঘেষে সিঁড়ি। বেয়ে নামতে লাগলো।
বনহুর এ সময়টুকুর প্রতীক্ষাতেই ছিলো।
আলগোছে কখন যুবতীর কণ্ঠ থেকে মূল্যবান লকেটখানা বনহুরের পকেটে গিয়ে পৌঁছলো।
বনহুর আর নূরী যুবতীর নিকটে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো এরোড্রাম থেকে।
যুবতী এগিয়ে গেলো তার আত্মীয়-স্বজনের দিকে।
অনেকেই এসেছে যুবতী পারভিনকে সাদর সম্ভাষণ জানাতে। তার পিতা মহব্বৎ আলীও এসেছেন।
কন্যাকে দেখেই এগিয়ে গেলেন মহব্বৎ আলী–হ্যালো পারভিন, প্লেনে কোন কষ্ট হয়নি তো?
আব্বা, কোন কষ্ট হয়নি।
মহব্বৎ আলী বললেন–তোমার লকেটটা খুলে রেখেছো কেনো মা?
লকেট! অস্ফুট ধবনি করে নিজের গলায় তাকালো পারভিন। সঙ্গে সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠলো। আমার পকেট গেলো কোথায়?
এখানে যখন মহব্বৎ আলী এবং পারভিন লকেট খোজা নিয়ে তোলপাড় শুরু করলো, বনহুর আর নূরী তখন ট্যাক্সিতে চেপে বসেছে।
কান্দাই এর একটা হোটেলে গিয়ে উঠলো বনহুর ও নুরী।
বনহুর জানে, দিনের আলোতে কান্দাই শহরে সে নিরাপদ নয়।
কান্দাই এর পুলিশ মহলের অনেকেই দস্যু বনহুরের আসল রূপ দেখেছেন। তারা অতি সহজেই বনহুরকে চিনে নিতে পারবেন।
রাতের অন্ধকারে নূরীকে আস্তানায় নিয়ে যেতে হবে।
নূরী কিন্তু অস্থির হয়ে পড়লো, মনিকে দেখার জন্য ভীষণ ভাবে ছটফট করতে লাগলো।
বনহুর কান্দাই পৌঁছে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলো না। আস্তানায় গিয়ে কি জবাব দেবে নূরীকে যখন নূরী তার মনিকে চাইবে?
০৫.
কান্দাই শহরে সাড়া পড়ে গেছে–মতি মহল সিনেমা হলে আজ মহা সমারোহে মুক্তিলাভ করবে নতুন ছবি কুন্তিবাঈ। দেয়ালে দেয়ালে, দোকান-পাটে, গাড়িতে কুন্তিবাঈ ছবির পোষ্টার লাগানো হয়েছে।
বছরের সেরা ছবি কুন্তি বাঈ।
ছবি এসেছে দূর দেশ থেকে শুধু কান্দাই শহরেই নয়, আরও কয়েকটি শহরেও এক সঙ্গে মুক্তি লাভ করছে ছবিটা।
সেদিন মনিরা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিলো, অদূরে একটা ছোট্ট গাড়ি নিয়ে খেলা করছিলো নূর।
এমন সময় নকিব কক্ষে প্রবেশ করে–আপামনি!
ই থেকে চোখ না তুলেই বলে মনিরা কিছু বলবি?
নকিবের হাতে একটা বিজ্ঞপ্তি, বলল নকিব–আপামনি, দেখুন মতি মহল ছবিঘরে নতুন একটা ছবি এসেছে। শুনলাম, ছবিটা নাকি খুব ভাল। নায়কটা কিন্তু ঠিক আমাদের দাদা মনির মত।
কথাটা শুনে মনিরা চোখ তুলে তাকালো নকিবের দিকে।
নকিব এগিয়ে গিয়ে বিজ্ঞপ্তিটা তুলে দিলো মনিরার হাতে–সত্য করে
বলছি আপামনি, দেখুন নিজের চোখে।
মনিরা নকিবের হাত থেকে বিজ্ঞপ্তি নিয়ে মেলে ধরলো চোখের সামনে। পাশা-পাশি দুখানা মুখ হিরো আর হিরোইনের। একি? এ যে তার স্বামীর চেহারা! না না, ভুল নেই–ঠিক সেই নাক-মুখ সব। মনিরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে বিজ্ঞপ্তিখানার দিকে।
নকিব মনিরার মনোভার বুঝতে পেরে বললো–তাইতো আমি বিজ্ঞপ্তিটা পথের একটা ছেলের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এলাম।
মনিরার চোখের সম্মুখে তখন স্বামীর মুখখানা ভাসছে। অনেক দিন স্বামীর কোন সন্ধান না পেয়ে মুষড়ে পড়েছিলো মনিরা। আজ আবার নতুন করে মনের পর্দায় ভেসে উঠলো স্বামীর স্মৃতি।
মনিরা বই রেখে বিজ্ঞপ্তি হাতে উঠে দাঁড়ালো, কি যেন চিন্তা করে বললো নকিব, সরকার সাহেবকে পাঠিয়ে দে। আমি মামীমার ঘরে রয়েছি।
নকিব চলে গেলো, মনিরা বিজ্ঞপ্তিটা আবার মেলে ধরলো চোখের সামনে, নিপুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। মানুষের মত কত মানুষ আছে, কিন্তু তার মন এমন করছে কেনো! মামীমাকে এ বিজ্ঞপ্তি দেখাবে না–বলবে না এ সম্বন্ধে কোন কথা। ছবি দেখতে নিয়ে যাবে তাকে, হাজার হলেও মা আর সন্তান। যদি সত্যিই সে হয়, তাহলে মায়ের চোখে ধরা না পড়ে যাবে না। যত লোকেরই ভুল হোক, মায়ের কোন দিন ভুল হবে না সন্তানকে চিনতে।
মনিরাকে একটা কাগজ তন্ময় হয়ে দেখতে দেখে গাড়ি রেখে ছুটে এলো নূর, বললো–আম্মা, কি দেখছো অমন করে?
কিছু না বাবা, কিছু না। তাড়াতাড়ি বিজ্ঞপ্তিটা লুকিয়ে ফেললো মনিরা জামার ফাঁকে। তারপর নূরকে কোলে তুলে নিয়ে বললো মনিরা–বাপু, ছবি দেখতে যাবে? সিনেমা?
ইতিপূর্বে একদিন মনিরা নূরকে নিয়ে মতি মহল হলে ছবি দেখতে গিয়েছিলো। নূর তাই কিছুটা পরিচিত হলো সিনেমা সম্বন্ধে। বললো নূরদাবো আম্মা। আমি দাবো, সত্য নিয়ে দাবে তো আমাকে?
হাঁ বাবা, নিয়ে যাবো।
তারপর নূরকে কোলে করে মামীমার কক্ষে প্রবেশ করলো মনিরা।
মামীমা কোন একটা কিছু করছিলেন মনিরাকে দেখামাত্র সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন–কি দাদু, খুব যে। মায়ের কোলে চাপা হয়েছে। বলি ব্যাপার কি?
মনিরা নূরকে লক্ষ্য করে বললো–বলোনা বাবা, তুমি কি বলবে তোমার দাদীমাকে?
এগিয়ে এলেন মরিয়ম বেগম, নূরের গাল টিপে দিয়ে বললেন–বলো দাদু? বলো?
নূর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো–দাদীমা, আজ আমলা ছবি দেখতে যাবো।
ছবি!
মনিরা বললো এবার মামীমা, নূর সখ করেছে, আজ নাকি সে ছবি দেখতে যাবে!
বেশ তো, সরকার সাহেবকে বলো, নিয়ে দাবেন উনি।
মামীমা।
বলো মা?
মতি মহল হলে সুন্দর একটা নাকি ছবি হচ্ছে, নতুন ছবি।
