বনহুর আবার নূরীর জন্য চিন্তিত হলো। কোথায় মনি কে জানে আর কি তাকে কোন দিন ফিরে পাবে। অসম্ভব সে আশা–নূরীর জন্য বনহুর বেশ আশঙ্কিত হয়ে পড়লো। এখন মিছেমিছি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাখছে–মনি তাদের আস্তানায় আছে, কিন্তু আস্তানায় ফিরে যখন নূরী মনিকে খুঁজে পাবেনা, তখন কি বলবে বনহুর তাকে?
বনহুরও চিন্তিত হয়ে পড়লো, এখানে মিথ্যা বলে নূরীকে ভুলিয়ে রাখলেও কান্দাই পৌঁছে তাকে কিছুতেই মিথ্যা ছলনায় ভুলানো যাবে না।
০৫.
সেদিন হোটেলের ক্যাবিনে নিজের বিছানায় বনহুর আপন মনে চিন্তা করছিলো।
নূরী এসে দাঁড়ালো তার পাশে, বনহুরের চুলের ফাঁকে আংগুল চালাতে চালাতে বললো–হুর, আর আমি থাকতে পারছিনা।
বনহুর একটু হেসে বললো–কেনো?
নূরী এবার বসে পড়লো বনহুরের পাশে–মনিকে না দেখে।
ওঃ এই কথা! আচ্ছা নূরী!
বলো?
মনিকে তুমি বেশি ভালবাসো, না আমাকে?
নূরী গম্ভীর কণ্ঠে বললো–এ প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য?
দেখো নূরী, মনিকে তোমার ছাড়তে হবে, নয় আমাকে……
কি বললে? নূরী যেন আর্তনাদ করে উঠলো।
বনহুর কথাটা বলে ভুল করছে বুঝতে পারলো। তাড়াতাড়ি কথার মোড় ফিরিয়ে নিয়ে বললো–নূরী, তোমার মন বুঝলাম। তুমি কান্দাই পৌঁছেই তোমার মনিকে পাবে।
নূরীর গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়লো ফোটা ফোটা অশ্রু।
বনহুর ওকে টেনে নিলো কাছে। স্নেহ ভরা কণ্ঠে বললো–নূরী, এতো অল্পে তুমি ভেংগে পড়ো, কই আগে তো এমন ছিলেনা?
বনহুরের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে বললো নূরী-. আর কোন দিন তুমি ওরকম প্রশ্ন আমাকে করোনা।
না, আর করবো না, কথা দিলাম তোমাকে।
নূরীর চোখের পানি হাত দিয়ে মুছে দিলো বনহুর, বললো–যাও, তৈরি। হয়ে নাও নূরী, আজই আমরা কান্দাই এর পথে রওয়ানা হবো।
খুশিতে নূরীর মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো–সত্যি বলছো?
হুঁ।
নূরী আনন্দে মেতে উঠে, ছুটে চলে যায় সে নিজের কামরায়।
ঝাম শহর থেকে প্লেনযোগে কান্দাই পৌঁছানো যায়। বনহুর প্লেনের দুখানা টিকিট কেটে নিলো। কত দিন পর বনহুর আর নূরী কান্দাই ফিরে চলেছে–কত আনন্দ হবার কথা, কিন্তু বনহুরের মনে পূর্বের সে আনন্দ নেই। নূরীকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়েছে সে–মনিকে কান্দাইয়ে তাদের আস্তানায় গিয়েই দেখতে পাবে। সে সান্ত্বনা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বনহুর ভিতরে ভিতরে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লো।
মেঘের বুক চিরে প্লেনখানা এগিয়ে চলেছে। পাশ কেটে ভেসে যাচ্ছে পেঁজা তুলার মত খণ্ড খণ্ড মেঘের স্তুপগুলো। বনহুর নিজের আসনে বসে তাকিয়ে ছিলো পাশের শার্শী দিয়ে নীচের দিকে।
খণ্ড খণ্ড মেঘের ফাঁকে পৃথিবীটাকে ঠিক ছবির মতই মনে হচ্ছিলো। ছোটবড় দালান-কোঠা আর নদী-নালাগুলো যেন রূপকথার স্বপ্নপুরীর মতই মনে হচ্ছিলো।
নূরী বসেছিলো বনহুরের পাশে। প্লেনে সে কোনদিন উঠে নি, বিস্ময় জাগছিলো তার মনে। অবাক হয়ে সব দেখছিলো নূরী।
বোয়িং বিমান এটা।
অগণিত যাত্রী নিজ নিজ আসন দখল করে নিয়ে বসে আছে।
বনহুরের সম্মুখ আসনে বসে ছিলে কয়েকজন মহিলা, একটি যুবতিও ছিলো বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে। যুবতীর শরীরে আধুনিক আটসাট পোশাক।
যুবতী বার বার বনহুরের দৃষ্টি তার দিকে আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করছিলো।
বনহুরের চোখ দুটো শার্শির ফাঁকে নিবদ্ধ থাকলেও যুবতীর গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো। মনে মনে হাসলো বনহুর। যুবতীর কণ্ঠে একটা মূল্যবান লকেট জ্বলজ্বল করছে।
বনহুরের চোখ দুটো ধক করে জ্বলে উঠলো, ঐ মূল্যবান লকেটখানা তার চাই।
প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের কেসটা বের করে একটি সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো বনহুর।
প্লেনখানা তখন মেঘের মধ্য দিয়ে বাম্পিং করে এগোচ্ছিলো।
একটা সমুদ্রের উপর দিয়ে যাচ্ছিলো প্লেনখানা।
বনহুর সিগারেটের ধুম্ররাশির ফাঁকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলো যুবতীটিকে।
যুবতীটিও তাকাচ্ছিলো বার বার বনহুরের দিকে।
দৃষ্টি বিনিময় হচ্ছিলো বনহুর আর যুবতীর মধ্যে।
যুবতীর হৃদয়ে এক অপলক আনন্দের লহরী দোলা জাগাচ্ছিলো।
এক সময় বোয়িং কান্দাই শহরের আকাশে এসে পৌঁছলো। বনহুর নূরীকে লক্ষ্য করে বললো–কতদিন পর কান্দাইয়ের হাওয়া গ্রহণ করলাম, নুরী।
নূরীর চোখে আনন্দের দ্যুতি ফুটে উঠেছে।
যুবতী বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেই বসলো–আপনি কি কান্দাইয়ে নামবেন?
বনহুর হেসে জবাব দিলো–হাঁ, কান্দাই আমার গন্তব্য স্থান।
যুবতী প্রফুল্ল কণ্ঠে বললো–কান্দাই আমিও নামবো।
যুবতীর গায়ে পড়ে আলাপ ভালো লাগলো না নূরীর। যুবতী পুনরায় বলে উঠলো–ওনি বুঝি আপনার…….
আমার আত্মীয়া।
ওঃ–যুবতীর বুক থেকে একটা জমাট অন্ধকার পরিষ্কার হয়ে গেলো। যুবতী নিজেই বলে উঠলো–গুলবাগ হোটেলের মালিক আমার আব্বা। আসবেন একদিন গুলবাগে, দেখা হবে আমার সঙ্গে।
বনহুর বললো–মহব্বৎ আলী আপনার আব্বা?
হাঁ, ফুলবাগের পাশেই আমাদের বাড়ি।
যুবতী যখন বনহুরের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় রত, তখন মাইকে ক্যাপ্টেনের কণ্ঠ শোনা গেলো–আপনারা নিজ নিজ আসনে স্থির হয়ে বসুন। এবং বেল্ট বেধে নিন। কান্দাই এরোড্রামে এসে গেছি আমরা।
প্লেনের যাত্রীগণ আসনের সঙ্গে নিজ নিজ বেল্ট বেধে নিলো।
কান্দাই এরোড্রামের উপরে চক্রাকারে উড়ে বেড়াতে লাগলো প্লেনখানা। আশায় আনন্দে উফুল্ল সমস্ত যাত্রীগণ। এক সময় রানওয়েতে প্লেন অবতরণ করলো। এরোড্রামে উনখ জনতা স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা করছে। যার যার আত্মীয়-স্বজন এসেছে তাদের রিসিভ করে নিতে। প্লেন এসে এবোড্রামে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে যাত্রীগণ।
