ভোরের হাওয়া বইছে।
পূর্ব আকাশ রাঙা করে উঁকি দিলো অরুণ আলো। গোটা বিশ্ব নতুন জীবন লাভ করলো যেন।
বনহুর নিৰ্ণিমেষ নয়নে তাকালো নুরীর স্থির-নিশ্চল মুখমণ্ডলের দিকে। গাছে গাছে পাখির কলরব জেগে উঠলো। নদীর কুল কুল ধ্বনির সঙ্গে ভেসে এলো ভোরের আযানের শব্দ।
হঠাৎ বনহুরের চোখে মুখে ফুটে উঠলো এক অপূর্ব আনন্দ উচ্ছ্বাস। নূরী ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো।
বনহুর ব্যাকুল আগ্রহে ঝুঁকে পড়লো নূরীর মুখের কাছে। গভীর আবেগে ডাকলো–নূরী! নূরী।
নূরীর সমস্ত দেহটা নড়ে উঠলো, হাতখানা উঁচু করতে গিয়ে আবার পড়ে গেলো এক পাশে।
বনহুর হাতখানা ধরে ফেললো হাতের মুঠোয় পুনরায় ডাকলো–নুরী।
নূরীর ঠোঁট দুখানা কেঁপে উঠলো, অস্পষ্ট কণ্ঠে বললো–পানি।
বনহুর ব্যস্তভাবে নদীর দিকে এগিয়ে গেলো, দুহাতে খানিকটা পানি নিয়ে দ্রুত ফিরে এলো নূরীর পাশে।
হাটু গেড়ে বসে পানিটুকু নূরীর মুখে দিলো।
এতোক্ষণে নূরীর গলা কিছুটা যেন ভিজে শব্দ বেরিয়ে এলো, অস্ফুট কণ্ঠে বললো–আমি কোথায়?
বনহুর নূরীর কপালে মুখে হাত বুলিয়ে বললো–তুমি আমার পাশে, নূরী।
নুরী দুহাতে চোখ দুটো একবার মুছে নিলো–আমি তোমায় দেখতে পাচ্ছি না, তুমি …………তুমি…….
বলো, বলো……. বলো নূরী?
তুমি আমার হুর ……. হুর……..
বনহুর উচ্ছ্বসিত আনন্দে নূরীকে ভূতল থেকে তুলে নেয় হাতের উপর, : আকুলভাবে বলে সে–নূরী আমি, আমি তোমার বনহুর!
নূরী ক্ষীণকণ্ঠে বললো–আমি কেনো তোমাকে দেখতে পাচ্ছিনা হুর?
জানিনা, জানিনা নুরী কেনো, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছো না!
নূরী, দুহাতে চোখ রগড়ে ভাল করে তাকালো–আমার চোখে পানি, দাও! পানি দাও!
বনহুর আবার নূরীকে নদী তীরস্থ দূর্বাকোমল শয্যায় শুইয়ে দিয়ে পানি আনতে ছুটলো। এবার রুমাল ভিজিয়ে পানি নিয়ে এলো সে। নূরীর চোখ মুখে পানির ছিটা দিতে লাগলো।
নূরী এবার তাকালো মুক্ত আকাশের দিকে। আজ নূরী নব জীবন লাভ। করলো। আকাশের নীল রঙ তার দৃষ্টিকে উজ্জ্বল করে তুললো। নূরী তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। মুহূর্তে নূরীর চোখে-মুখে এক খুশির উচ্ছাস ফুটে উঠলো। দুহাত বাড়িয়ে দিলো বনহুরের দিকে বনহুর তুমি…. তুমি….
বনহুর গলাটা এগিয়ে দিলো নূরীর দিকে, নিজের হাত দুখানা দিয়ে নূরীর অবশ হাত দুখানা তুলে নিলো।
নব জীবন লাভ করলে নূরী। বহুদিন পর আজ প্রথম বনহুরের নাম ধরে ডাকলো আর চিনতে পারলো তাকে।
বনহুর এতো খুশি হয়েও ব্যথায় মুষড়ে পড়লো, ভুল করে সে ডাক্তার জামরুদীকে হত্যা করেছে। ভুল শুধু বনহুরেরই হয়নি, ভুল করেছিলো জামরুদী-তার ঔষধ তিন দিনের স্থানে চার দিন সময় নিয়েছিলো, কারণ ঔষধের মাত্রা সামান্য একটু বেশি হয়ে গিয়েছিলো সেবনকালে। এবং সে জন্যই নূরীর সংজ্ঞালাভে বিলম্ব ঘটেছিলো। ডাক্তার জামরুদী হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, মনের দুর্বলতা প্রকাশ করেছিলো বনহুরের নিকটে।
বনহুরের ধৈর্যের বাধ ভেংগে গিয়েছিলো সে মুহূর্তে। জামরুদী ইচ্ছা করেই তার নূরীকে হত্যা করেছে মনে হয়েছিলো তার। তাই বনহুর হত্যা করেছিলো ডাক্তার জামরুদীকে।
এখানে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ব্যথায় বনহুরের অন্তর জর্জরিত হলো।
নূরী তখন বনহুরের মুখে-মাথায়-গলায় হাত বুলিয়ে গভীরভাবে অনুভব করছিলো, সত্যি তার বনহুর ফিরে এসেছে কিনা তার পাশে।
বনহুর অশ্রু ছলছল চোখে তাকিয়ে দেখছিলো নূরীকে। কত দিনের প্রতীক্ষার পর আজ যেন সে তার আকাঙ্খিত জিনিসটিকে খুঁজে পেয়েছে।
বনহুর নূরীকে নিবিড়ভাবে টেনে নিলো কাছে। আবেগভরা কণ্ঠে বললোনুরী!
বলো?
তুমি কি হয়ে গিয়েছিলে নূরী? কেন তুমি অমন হয়ে গিয়েছিলে? কেনো এতোদিন তুমি আমায় হুর বলে ডাকোনি?
আমি তো এ সব কিছুই জানিনা। আমি কি ছিলাম তোমার পাশে?
হাঁ নূরী, কিন্তু পাশে থেকেও তুমি ছিলে অনেক দূরে। কোন দিন আমি তোমার নাগাল পাইনি।
বনহুর, আমাকে তুমি ক্ষমা করো। কিন্তু আমার মনি-মনি কই? ওকে কোথায় রেখেছো? ব্যাকুল কণ্ঠে নূরী বনহুরকে প্রশ্ন করে বসলো।
হঠাৎ নূরীর প্রশ্নের জবাব দিয়ে উঠতে পারলো না বনহুর। কেমন যেন থ মেরে গেলো। একটু চিন্তা করে বললো সে–মনি আছে।
কোথায়? কোথায় সে বলো? বনহুর এবার বিপদে পড়লো, মনি কোথায় সে-ই জানেনা। বেঁচে আছে
মরে গেছে কে জানে। কিন্তু হঠাৎ এখন মনি নেই কথাটা বলা ঠিক হবে না নূরীর কাছে। হয়তো আবার তার মস্তিষ্কে কোন গণ্ডগোল হয়ে যেতে পারে। ভয় হলো বনহুরের, একটু হাসবার চেষ্টা করে বললো–দেখছো না এটা অন্য দেশ? তোমার মনি আস্তানায় আছে।
আনন্দভরা কণ্ঠে বললো নূরী–সত্যি বলছো তো?
হাঁ-হাঁ, নূরী। বনহুর, আমাকে নিয়ে চলো, আর বিলম্ব সইছে না। কখন আমি মনিকে বুকে পাবো। চলো চলো হুর……….
চলো।
বনহুর আর নূরী উঠে দাঁড়ালো।
নূরীর শরীর অত্যন্ত দুর্বল, কাজেই বনহুর নূরী সহ একটি বড় হোটেলে কয়েক দিনের জন্য আশ্রয় গ্রহণ করলো। শহরের সবচেয়ে সেরা এবং উৎকৃষ্ট হোটেল-বনহুর ও নুরীর কোন অসুবিধা হলো না এখানে। নানা রকম ফল-মূল ও ঔষধ-পত্রের ব্যবস্থা করে দিলো বনহুর নূরীর জন্য।
নূরীকে নিয়ে মাঝে মাঝে বনহুর শহর ভ্রমণে বের হতো। কখনও পার্কে বা লেকের ধারে গিয়ে বসতো।
কিন্তু এতো করেও নূরীর মনে বনহু শান্তি আনতে পারলো না। নূরী সব সময় মনির জন্য ব্যস্ত উক্তষ্ঠিত হয়ে রয়েছে। নূরীর মুখের হাসি যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে।
