বনহুর স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে….. হঠাৎ বনহুর নূরীকে ডাকতে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে জামরুদী ঠোঁটে আংগুল চাপা দিয়ে বারণ করল তাকে কথা বলতে।
নৃরী টলে পড়ে যাচ্ছিলো, জামরুদীর ইংগিতে নূরীকে ধরে ফেললো বনহুর। তুলে নিলো সে নূরীর ছিন্ন লতার মত সংজ্ঞাহীন দেহটা হাতের উপর।
ডাক্তার জামরু এবার কথা বললেন–ঐ বিছানায় শুইয়ে দিন।
বনহুর নূরীকে ওপাশের রবারের বিছানায় শুইয়ে দিলো ধীরে ধীরে। তারপর নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো শিয়রে।
ডাক্তার জামরুদী বললেন–আজ থেকে পরশু পর্যন্ত অজ্ঞান থাকবে। তারপর চতুর্থ দিনে জ্ঞান ফিরে আসবে। মিঃ চৌধুরী ঐ দিন আপনার ভগ্নি আপনাকে নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন।
ডক্টর, আপনার দয়ায় আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।
প্রবল আগ্রহ নিয়ে বনহুর নূরীর পাশে বসে আছে। তাকিয়ে আছে সে। তার মুদিত আঁখি দুটির দিকে।
০৪.
আজ চতুর্থ দিন। কক্ষে যে গাঢ় লাল আলো জ্বলছিলো, প্রতি দিন একটি করে সুইচ টিপে এক একটি আলো নিভিয়ে দিচ্ছিলেন ডাক্তার জামরুদী। আজ শেষ বাবের সুইচ টিপলেন ডাক্তার।
কমধ্যে আজ কোন লাল রঙের আলো নেই।
একটা উজ্জ্বল আলো কক্ষটিকে আলোকিত করে রেখেছিলো। এতদিন কক্ষটা গভীর আলোতে আলোকিত থাকায় বনহুরের চোখে ধাধা লেগে গিয়েছিলো।
মাঝে মাঝে বাইরে গিয়েছে বনহুর আহার ও স্নানের জন্য। কিন্তু সর্বক্ষণ সে নূরীর শয্যার পাশ থেকে সরে যায়নি। কোন কোন সময় ডাক্তার জামরুদীর অন্দরে পাশের চেম্বারে একটু বিশ্রাম করে নিয়েছে সে, কিন্তু ঘুম তার চোখে আসেনি। নানা দুশ্চিন্তায় মনটা সর্বক্ষণ ভরে থাকতো। নূরীকে বনহুর শুধু ভালই বাসেনা নূরী বনহুরের একজন জীবন-সঙ্গিনী।
নূরীর অমঙ্গল আশঙ্কা বনহুরকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলেছিলো। কখন জ্ঞান ফিরে আসবে কে জানে ফিরবে কি না তাইবা কে বলতে পারে।
আজ চতুর্থ দিবস। নূরীর শিয়রে বসে উত্তেজিত হয়ে প্রতীক্ষা করছে বনহুর।
ডাক্তার জামরুদীও উন্মুখ হৃদয় নিয়ে অপেক্ষা করছেন, একটা কি যেন ঔষধ সহ পাইপ ধরে আছেন নূরীর নাকের কাছে। মাঝে মাঝে নার্ভ পরীক্ষা করে দেখছেন তিনি।
চতুর্থ দিনও প্রায় শেষ হয়ে এলো।
ডাক্তার জামরুদীর ললাট কুঞ্চিত হলো, মুখভাবে ফুটে উঠলো গভীর চিন্তার ছাপ। কেমন যেন বিহ্বল মনে হচ্ছে তাকে।
বনহুর বুঝতে পারলো–নূরীর জীবন আশঙ্কাজনক। ডাক্তার জামরুদীর মুখভাব লক্ষ্য করে বনহুরের মনের মধ্যে আলোড়ন শুরু হলো। তাহলে নূরীকে ও হারালো এবার।
ক্রমেই বনহুরের মুখ কঠিন হয়ে উঠতে লাগলো। একটা জীবন নিয়ে। ছিনিমিনি খেলা, এ মুহূর্তে ডাক্তার জামরুদীকে সমুচিত শাস্তি দিতে পারে। বনহুর তবু ধৈর্য সহকারে বললো—ডক্টর, কেমন দেখছেন?
জামরুদী বললেন–আমি ইতিপূর্বে আরও অনেকগুলো এ ধরণের কেস সুস্থ্য করেছি, কিন্তু–থেমে যান ডাক্তার জমরুদী।
বনহুর ডাক্তারের কলার চেপে ধরলো–থামলেন কেনো বলুন? বলুন ডক্টর, নূরীর জ্ঞান ফিরবে তো?
ডাক্তার জমাদী বলে উঠেন–হাঁ হাঁ ফিরবে–কিন্তু—কিন্তু—
কিন্তু কি? বলুন, বলুন ডাক্তার?
এমন তো কোনদিন হয়নি!
কি বলছেন! বনহুর যেন আর্তনাদ করে উঠলো।
ডাক্তার জামরুদীর ললাটে ফুটে উঠলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। মুখ মণ্ডল অন্ধকার হলো, অস্ফুট কণ্ঠে বললেন তিনি–পারলাম না মিঃ চৌধুরী ….
জামরুদীর কথা শেষ হতে না হতে গর্জে উঠলো বনহুরের হাতের রিভলভার।
একটা আর্তনাদ করে ডাক্তার জামরুদী পড়ে গেলেন তার ল্যাবরেটরীর মেঝেতে। জামরুদীর বুকের রক্তে রাঙা হয়ে উঠলো ল্যাবরেটরীর মেঝের কার্পেট।
বনহুর রিভলভার পকেটে রেখে ফিরে তাকালো শয্যায় শায়িত নূরীর দিকে। নূরীর মুদিত আঁখি কোণে দুফোটা অশ্রু মুক্তা বিন্দুর মত চক্ চক্
করছে।
বনহুর নিজেকে কিছুতেই সংযত রাখতে পারলো না। নূরীর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বালকের ন্যায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে ল্যাবরেটরীর বাইরে শোনা গেলো দ্রুত পদ শব্দ। রিভলভারের গুলীর শব্দ বাইরে গিয়ে পৌঁছেছে, তারই শব্দে ছুটে আসছে ডাক্তার জামরুদীর কর্মচারীগণ।
বনহুর একবার তাকালো ল্যাবরেটরীর পিছন শার্শির দিকে। ক্ষিপ্র হস্তে খুলে ফেললো পিছন শার্শিটা।
পুনরায় ফিরে এলো নূরীর শয্যার পাশে।
ল্যাবরেটরীর বাইরে দাঁড়িয়ে উচ্চ কণ্ঠে কেউ ডাকছে–স্যার, স্যার কি হলো? স্যার…
বাইরে এসে সবাই জড়ো হয়েছে কিন্তু ল্যাবরেটরীর ভিতরে প্রবেশের কেউ সাহস পাচ্ছে না।
বনহুর হাতের উপর তুলে নিলো নূরীর মৃতবৎ দেহটা। এক বার তাকালো ভুলুণ্ঠিত ডাক্তার জমরুদীর রক্ত মাখা দেহটার দিকে।
জামরুদীর মুখে এখনও গভীর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। রোগিকে হত্যার করার অভিপ্রায় তার ছিলো না, তিনি চেয়েছিলেন রোগিকে নতুন জীবন দান করতে।
বনহুর নূরীর এলিয়ে পড়া দেহটা নিয়ে পিছন শার্শি দিয়ে লাফিয়ে পড়লো। বাইরে।
নির্জন নদীর তীর।
নূরীর নিস্তব্ধ দেহটার পাশে পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। বনহুর। গোটা রাত এমনি ভাবে কেটে গেছে বনহুরের, একবারও সে নূরীর দেহের পাশ থেকে সরে যায়নি কোথাও। সত্যি কি নূরী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য চলে গেলো? কিছুতেই যেন বিশ্বাস হয়না বনহুরের। কত বার নূরীর নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখেছে সে, মনে হয়েছে অতি ধীরে মৃধু ভাবে নিশ্বাস বইছে। একটা ক্ষীণ আশা এখনও ত্যাগ করতে পারেনি বনহুর। উন্মুখ হৃদয় নিয়ে ব্যাকুল আঁখি মেলে নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
