ডাক্তার জামরুদী কথা শেষ করে পাশের দরজার পর্দা ঠেলে চলে গেলেন। কোথায় গেলেন কে জানে।
বনহুর আর নূরী দুটি আসনে বসে রইলো চুপচাপ। বনহুরের বিস্ময় তখনও কমেনি, সে নিপুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলো সব।
নূরী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছিলো এদিকে ওদিকে।
বনহুর বললো–নূরী, জানো এখানে কেনো এসেছি?
নূরী মাথা দোলালো, বললো-জানি, আমার চিকিৎসার জন্য!
কি করে বুঝলে তোমার চিকিৎসার জন্য?
ডাক্তারের কথা আমি কি বুঝতে পারিনি ভাবছেন?
নূরী, এসব যদি বুঝতে পারো, তবে আমার মনের ব্যথা কেনো বুঝতে পারো না? আজও কেনো তবে আমাকে চিনতে পারো না?
নূরী মাথা নাড়লো, কিছু স্মরণ করতে চেষ্টা করলো, কিন্তু পারছে না। ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো।
বনহুর নূরীর দক্ষিণ হাত মুঠায় চেপে ধরলো–নূরী, তোমাকে ডাক্তার কয়েক দিনের জন্য…..
কথা শেষ হয় না বনহুরের, কক্ষে প্রবেশ করেন ডাক্তার জামদ–মি চৌধুরী, আসুন, আপনার সঙ্গে আমার কয়েকটা নিভতে কথা আছে।
বনহুর নূরীকে লক্ষ্য করে বললো–বসো তুমি, এক্ষুণি ভাসছি। ডাক্তার জামরুদীকে অনুসরণ করলো বনহুর।
পাশের কামরায় প্রবেশ করে বনহুর আরও বিস্মিত হলো! সমস্ত কক্ষ গাঢ় রক্তাভ আলোকে আলোকিত।
মনে হলো সমস্ত কক্ষটায় রক্ত ছড়িয়ে আছে। এ কক্ষে পূর্বে কফ চেয়ে অনেক বেশি শিশি ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। নানা রকম জং ও কাচপাত্র ঔষধপূর্ণ। রক্তাভ আলোতে কাচ পাত্র ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপতি কেমন যেন লাল টক টকে দেখাচ্ছে।
বনহুরকে বসতে বললেন ডাক্তার জামরুদী।
বনহুর ডাক্তারের কথা অনুযায়ী আসন গ্রহণ করলো বটে, কিন্তু তার মধ্যে একটা আশঙ্কা দোলা জাগালো। কক্ষটার মধ্যে একটা উট ঔষও গন্ধ ছড়িয়ে ছিলো। বনহুরের যেন নিশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগলো।
ডাক্তার জামরুদী সম্মুখের কাচের টেবিলে একটি কাচ পাত্রে গাঢ় সবুজ রং এর ঔষধ রেখে পরীক্ষা করছিলেন। সবুজ তরল ঔতার উপরে ভাল আলো কেমন যেন কালো রঙ এর সৃষ্টি করছিলো। বললো ভ্রামদী মিঃ চৌধুরী, আপনিও ঘাবড়ে গেছেন?
ব্যস্তভাবে বলে উঠলো বনহুর–না না, আপনি ভুলে বুঝছেন ডক্টর। ডাক্তার জামরুদী বনহুরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন–দেখুন মিঃ চৌধুরী, আমি আপনার বোনের উপর এখনই ঔষধ প্রয়োগ করবো, এবং আপনার সাক্ষাতে করবো।
ধন্যবাদ ডক্টর।
এই আমার জীবনে প্রথম কোন আত্মীয়ের সম্মুখে রোগিকে তার স্বাভাবিক জ্ঞান থেকে বিলুপ্ত করা। আপনি কোন রকম বিচলিত হবেন না তো?
হাসলো বনহুর–আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন ডক্টর।
থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ চৌধুরী, যান, আপনার ভগ্নিকে নিয়ে আসুন এ কক্ষে।
বনহুর চলে গেলো। একটু পরে ফিরে এলো নূরী সহ।
এ কক্ষে প্রবেশ করে নূরী বেশ ঘাবড়ে গেলো। কক্ষটা সত্যি অত্যন্ত ভীতিকর ছিলো।
বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো নূরী আমাকে আপনারা হত্যা করবেন না তো?
বনহুর হেসে বললো–উনি দস্যু বা ডাকু নন যে, তোমাকে হত্যা করবেন।
বনহুরের কথায় গম্ভীর কণ্ঠে বললেন ডাক্তার জামরুদী–চৌধুরী, আপনি ভুল করছেন, কারণ দস্যু বা ডাকু হলেই তারা বিনা কারণে হত্যা করে না।
আপনিই ভুল করছেন ডক্টর, দস্যু বা ডাকুদের হত্যা করা একটা নেশা।
ওকথা আপনি জানেন না বলেই বলছেন মিঃ চৌধুরী, দস্যু বনহুরের কথা নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে।
হাঁ, শুনেছি তার নাম। বললো বনহুর।
ডাক্তার জামরুদী বললেন–দস্যু হলেও সে এক মহান ব্যক্তি। যদিও তাকে কোনদিন চোখে দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কিন্তু তার নাম আমি অন্তরে গেথে রেখেছি।
ডক্টর!
হাঁ মিঃ চৌধুরী, আমি তাকে শ্রদ্ধা করি! দস্যু হলেও সে মানুষ, কিন্তু আজ শত শত মানুষরূপী ব্যক্তি, যারা সমাজের বুকে স্বনামধন্য হয়ে জেকে বসে আছেন, তারা দস্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর,
ডক্টর, আপনার অন্তরকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। পৃথিবীতে এমন জনও আছে, যারা মানুষের নকল রূপের পিছনে আসল রূপটা দেখতে পায়।
জামরুদী দস্যু বনহুরের কথায় বেশ আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েছিলেন, তাড়াতাড়ি স্বাভাবিকভাবে কণ্ঠে বললেন–ওঃ এবার কাজ শুরু করবো।
বনহুর নূরীর দিকে তাকালো–ভয় নেই, আমি আছি নূরী।
ডাক্তার জামরুদী নূরীকে নিয়ে একটি সোফায় বসালেন। সোফার চারদিকে কয়েকটা বৈদ্যুতিক আলোর সুইচ ছিলো। পাশেই একটা রবারের শয্যা।
জামরুদী সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষটা গাঢ় লালে ভরে উঠলো। নূরীকে দেখে মনে হলোতার সমস্ত দেহে কে যেন একপোঁচ রক্ত মাখিয়ে দিয়েছে। বনহুর নূরীর অদূরে এসে দাঁড়ালো। চোখে-মুখে তার একটা ভীতির ভাব ফুটে উঠলো, আজ তার নিজের এ অবস্থা হলে এতোটুকু ঘাবড়ে যেতোনা সে। কিন্তু নূরীর জন্য আশঙ্কা–যদি নূরীর জ্ঞান আর ফিরে না আসে।
ডাক্তার জামরুদী টেবিল থেকে সবুজ তরল পদার্থ সহ কাচপাত্রটা হাতে উঠিয়ে নিলেন।
বনহুর তাকিয়ে আছে নির্বাক নয়নে নূরীর মুখের দিকে।
ডাক্তার জামরুদী কাঁচ-পাত্রটা নূরীর মুখের কাছে নিয়ে এলেন।
নূরী নিঃশব্দে পান করল তরল সবুজ পদার্থটুকু।
জামরুদী এবার দ্রুত হস্তে কাঁচ-পাত্র টেবিলে রেখে নূরীর সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন।
বনহুর তাকিয়ে আছে তখনও নূরীর দিকে অপলক নয়নে। ধীরে ধীরে নূরীর চোখ দুটো যেন মুদে আসছে।
মাথাটা নুয়ে আসছে সম্মুখের দিকে।
