বনহুর কিছুটা প্রকৃতিস্থ হয়ে বললো–আপনারা আর বিলম্ব করবেন না, গাড়িতে উঠে বসুন। তারপর নূরীকে লক্ষ্য করে বললো সে–নূরী, এসো আমার পাশে।
বনহুরের কথায় নূরী ট্রাকের ড্রাইভ আসনের পাশে উঠে বসলো।
আর ব্যবসায়ী লোক দুজন ট্রাকের পিছনে উঠে বসলো।
বনহুর গাড়ি স্টার্ট দিলো।
এই সে জীবনের প্রথম ট্রাক চালকের ভূমিকা গ্রহণ করলো।
০৩.
পথে আর কোন বিপদ দেখা দিল না।
বনহুর ট্রাক সহ এসে পৌঁছলো ঝাঁম শহরে।
ব্যবসায়ী লোক দুজন বনহুরের দয়ায় নিজেদের জীবন ও তাদের লুষ্ঠিত দ্রব্যাদি ফিরে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হলো। নিজেদের বাড়িতে বনহুর আর নূরীকে নিয়ে গেলো তারা অতি সমাদর করে।
লোক দুজন অত্যন্ত ধনবান তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিরাট বাড়িগাড়ি, শহরের মধ্যে বড় বড় দোকান-পাট অনেক রয়েছে তাদের। ব্যবসায়ী লোক হিসাবে শহরময় তাদের অনেক নাম রয়েছে।
হঠাৎ গত দুদিন আগে ব্যবসায়ীদ্বয় নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় শহরময় একটা ভীষণ চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছিলো। পুলিশ হন্তদন্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিলো। কিন্তু এ লোক দুজনার কোন সন্ধান করে উঠতে পারেনি।
ব্যবসায়ীদ্বয়ের বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গিয়েছিলো। এমন দিনে আবার ফিরে পেলো তারা তাদের হারানো ধনকে। ব্যবসায়ীদ্বয়ের আত্মীয়স্বজন সবাই বনহুরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলো। শহরের বহু ব্যক্তি এলেন দেখা করতে বনহুরের সঙ্গে।
এদের মধ্যে শহরের এক অভিজ্ঞ ডাক্তারও এলেন, ব্যবসায়ী প্রথম ব্যক্তির বন্ধুলোক তিনি।
ব্যবসায়ীদ্বয়ের প্রথম ব্যক্তির নাম কামরান আলী ও দ্বিতীয় জনের নাম জামশেদ মিয়া, উভয়ে আপন সহোদর ভাই না হলেও তারা উভয়ে উভয়ের পরম আত্মীয়।
অভিজ্ঞ ডাক্তার জামরুদী কামরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
জামরুদী বনহুরের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন।
কামরান বনহুরকে নিয়ে একটা ভোজের আয়োজন করলেন, কাজেই এক দিনের জন্য বনহুরকে ঝাম শহরে বাধ্য হয়ে থেকে যেতে হলো।
কথায় কথায় ডাক্তার জামরুদী ও বনহুর অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো। একথা সে কথায় বনহু জানতে পারলো–ডাক্তার জামরুদী শুধু ডাক্তারই নন, তিনি মস্তবড় বৈজ্ঞানিক। জীবনে তিনি বহু দেশ ঘুরেছেন এবং বহু রোগের ঔষধ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।
ভাজার জামরুদীর কথায় বনহুরের মনের আকাশে একটা আশার আলো উঁকি দিয়ে গেলো। নূরী আজ জ্ঞান-শূন্যা। যাদুকরের কোন ঔষধ তা স্বাভাবিক জ্ঞান লুপ্ত করে দিয়েছে।
বনহুর এক সময় ডাক্তার জামরুদীর নিকটে নূরীর সম্বন্ধে সমস্ত কথা খুলে বললো।
বনহুরের কথায় জামরুদী গভীরভাবে কিছু চিন্তা করলেন, তারপর হেসে বললেন তিনি–আমি তাকে দেখতে চাই।
বনহুর সেই মুহূর্তেই নূরীকে ডেকে আনলো ডাক্তার জারুদীর সম্মুখে।
নূরীকে কিছু সময় পরীক্ষা করে জামরুদী বললেন–মিঃ চৌধুরী, আপনি চিশ্চিন্ত থাকুন, আমি আপনার বোনকে সুস্থ করে দেবো। আবার সে স্বাভাবিক জ্ঞান শক্তি ফিরে পাবে।
বনহুর নিজের নাম মিঃ ইউসুফ চৌধুরী ও নূরীকে বোন বলে পরিচয় দিয়েছিলো এখানে। সত্যি পরিচয় দিলে বনহুরকে তারা নিশ্চয়ই সুনজরে দেখবে না, কাজেই তাকে এই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছিলো। ডাক্তারের কথায় বনহুর খুশি হলো। মনে মনে খোদাকে ধন্যবাদ জানালো বনহুর।
কামরান আলী ও জমশেদ মিয়ার বাড়িতে বনহুর আতিথ্য গ্রহণ করবার পর বিদায় নিয়ে ডাক্তার জামরুদীর বাড়িতে গেলো। জামরুদী অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বনহুর আর নূরীকে নিজ আবাসে নিয়ে রাখলেন।
নূরীর চিকিৎসা করবেন স্বয়ং জামরুদী।
যেদিন নূরীকে জামরুদী নিজের চেম্বারে নিয়ে গেলেন। সঙ্গে বনহুর।
জামরুদী বললেন–মিঃ ইউসুফ, আপনার বোনকে আমি এমন একটা ঔষধ সেবন করাবো, যে ঔষধ সেবনের পর আপনার বোন সম্পূর্ণ জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে কয়েক দিন আমি রাখবো।
বনহুরের মনে একটা দুশ্চিন্তার ঝড় বইলেও সে বিচলিত হলো না। কারণ, একদিনে ডাক্তার জামরুদীকে চিনতে বাকী রাখেনি বনহুর। লোকটা মহৎ এবং নিষ্ঠাবান তাতে কোন ভুল নেই। বয়স তার পঞ্চাশের বেশি হবে, ধীর-স্থির সৌম-সুন্দর পুরুষ। ডাক্তার জামরুদীকে কথা দিলো বনহুর, তিনি যে ভাবে নূরীকে সুস্থ করতে চান তাতেই রাজি আছে সে।
বন আর নূরী এসে বসলো ডাক্তার জামরুদীর চেম্বারে। কক্ষটা খুব প্রশও নয়, মাঝারি গোছের। কক্ষের চারদিকে আলমারী আর টেবিল সাজানো। প্রত্যেকটা আলমারীতে নানাবিধ শিশি সুন্দরভাবে রাখা হয়েছে। সবগুলো শিশিতে তরল পদার্থ। টেবিলে নানারকম বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি থরে থরে সাজানো রয়েছে। এক পাশে একটি রবারের শয্যা পাতা রয়েছে।
এ শয্যায় রোগিগণকে শোয়ানো হয়।
বনহুর কক্ষমধ্যে প্রবেশ করে নিপুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।
হেসে বললেন ডাক্তার জামরুদী, খুব বিস্ময় লাগছে আমার এ সব দেখে, না?
হাঁ, সত্যি আমি অবাক হচ্ছি ডক্টর, ইতিপূর্বে আমি কোন বৈজ্ঞানিকের চেম্বারে প্রবেশ করিনি।
ডাক্তার জামরুদী বললেন–ইতিপূর্বে আমার চেম্বারেও কোন বাইরের আগন্তক প্রবেশে সক্ষম হয় নি মিঃ চৌধুরী, আপনিই সর্ব প্রথম …….
তাহলে আপনি আমাকে যথেষ্ট বিশ্বাস করেছেন?
হাঁ, আপনার কথাবার্তা ও ব্যবহারে আমি সত্যি মুগ্ধ হয়েছি। আমি রোগির কোন আত্মীয়কে আমার চেম্বারে প্রবেশে অনুমতি দেই না।
