প্রথম ব্যক্তি বললো–কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?
বনহুর একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে এক মুখ ধূয়া নির্গত করে বললো–গাড়ি ফেরানোর মত খানিকটা জায়গা আবিষ্কার করে তবেই ফিরলাম। নিন, আপনারা গাড়িতে চেপে বসুন, আমি গাড়ি ব্যাক করে নিয়ে যাচ্ছি।
প্রথম ব্যক্তি বললো–যে দুর্গম পথ, গাড়ি ব্যাক করা কি সহজ হবে? হঠাৎ যদি পড়ে যায়?
তাহলে মৃত্যু। বললো বনহুর।
শিউরে উঠে বললো দ্বিতীয় ব্যক্তি কাজ নেই, হেঁটেই চলুন।
যে কদিন লাগে লাগবে।
বনহুর তার কথা শুনে হাসলো, তারপর বললো–আচ্ছা, আপনারা হাঁটতে শুরু করেন, আমি গাড়ি ব্যাক করে নিয়ে যাচ্ছি।
বনহুর গাড়ির ড্রাইভ আসনে উঠে বসলো।
স্তব্ধ নিশ্বাসে লোক দুটি তাকিয়ে রইলো তাদের মূল্যবান সামগ্রী সহ গাড়িখানার দিকে।
বনহুর গাড়িখানা সাবধানে ব্যাক করে নিয়ে চললো। লোক দুজন ও নূরী চলতে লাগলো গাড়িখানাকে অনুসরণ করে।
অতি কৌশলে আঁকাবাঁকা উঁচু নীচু পাহাড়ে পথ দিয়ে বনহুর নিপুণতার সঙ্গে গাড়ি ব্যাক করে চালিয়ে চললো। হঠাৎ যদি একটু এদিক-ওদিক হয়ে যায় তাহলেই গাড়িখানা গড়িয়ে পড়ে যাবে হাজার ফিট নীচে, পাথরের উপরে।
অদ্ভুত সাহসী দস্যু বনহুর–এই দুর্গম পথে গাড়ি পিছন দিকে চালিয়ে নিতে এতোটুকু ঘাবড়ে গেলোনা বা বিচলিত হলোনা। নির্ভীক সৈনিকের মত সে স্থিরভাবে গাড়ি ড্রাইভ করে চললো।
পাহাড়ের গা ঘেষে সঙ্কীর্ণ পাথুরে পথ, তাও সমতল নয়, মাঝে মাঝে বেশ উঁচু নীচু। একবার হঠাৎ গাড়িখানা কাৎ হয়ে গিয়ে ছিলো আর কি, বনহুর অতি সাবধানে কোন রকমে সামলে নিলো। সমস্ত শরীর ঘেমে উঠেছে ওর। সুন্দর মুখমণ্ডল রাঙা হয়ে উঠেছে ভীষণ ভাবে। জীবনে বনহুর অনেক দুর্গম পথ অতিক্রম করেছে, কিন্তু আজকের মত এমন সঙ্কটময় পথ তার জীবনে এই যেন প্রথম।
প্রায় ঘন্টা কয়েক চলার পর তার নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছতে সক্ষম হলো।
গাড়িখানা রেখে নেমে দাঁড়ালো বনহুর, জায়গাটা আর একবার তাকিয়ে দেখে নিলো। এ স্থানে পাহাড়ের গা কিছুটা ঢালু তবে সম্পূর্ণ প্রশস্ত নয়। গাড়ি কোন রকমে ব্যাক করে ঘুরিয়ে নেওয়া যেতে পারে কিন্তু হঠাৎ যদি গড়িয়ে পড়ে তাহলে আর রক্ষা নাই।
বনহুর যখন ভাবছে–কিভাবে গাড়িখানা ব্যাক করে সামনের দিকে মুখ ফেরাবে, ঠিক তখন কতগুলো অসভ্য জংলী লোক হুম হুম করে এগিয়ে এলো পাহাড়ের গা বেয়ে ঝোপ-ঝাড়ের মধ্য থেকে।
বনহুর এই মুহূর্তে এমন কিছু আশা করে নেই। কিন্তু তাকে তখনই প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াতে হলে, বিলম্ব করার সময় ছিল না।
কতগুলো জংলী এক সঙ্গে ছুটে এলো তার দিকে। বনহুর রিভলভার উদ্যত করে গুলী ছুঁড়লো একজন জংলীর বুক লক্ষ্য করে।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটা আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো, তারপর গড়াতে গড়াতে এসে পড়লো বনহুরের পায়ের কাছে।
বনহুর আর একজনকে লক্ষ্য করবার পূর্বেই অসংখ্য সূতীক্ষ্ম ধার বর্শা এসে গেঁথে যেতে লাগলো তার চার পাশের মাটিতে।
আশ্চর্য কৌশলে নিজকে বাঁচিয়ে নিতে লাগলো বনহুর। ভাগ্যিস, তখনও ট্রাকের সেই লোকদ্বয় ও নূরী একটু দূরে একটা ঝোপের আড়ালে এসে পৌঁছেছিলো।
জংলী লোকগুলো তাদের কাউকেই দেখতে পায়নি। কাজেই সকলে একযোগে আক্রমণ করেছে বনহুরকে।
জংলীগণ আরও নিকটে এসে পড়েছে।
একখানা তীক্ষ্ম বর্শা সাঁ করে চলে গেলো বনহুরের কানের পাশ কেটে। আরও দুখানা এক সঙ্গে ছুটে এলো, বনহুর চট করে সরে দাঁড়ালো। বর্শা দুখানা গিয়ে বিদ্ধ হলো পিছনের ট্রাকের গায়ে।
বনহুর এবার দ্রুত হস্তে প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভার বের করে গুলী ছুড়তে শুরু করলো।
বনহুরের গুলীর আঘাতে এক একজন জংলী ভূতলশায়ী হতে লাগলো। কিন্তু আশ্চর্য, জংলীরা এতে এতটুকু বিচলিত হলো না, বরং আরও উন্মত্ত হয়ে আক্রমণ করলো বনহুরকে।
এতোগুলো হিংস্র জংলীর কবলে বনহুর একা, মরিয়া হয়ে সে লড়াই করে চললো।
রিভলভারের গুলী শেষ হতেই একখানা বর্শা তুলে নিলো বনহুর হাতে। কিছুক্ষণ পূর্বে তার বাম বাহুতে দুষ্ট ডাকু হাঙ্গেরুর ছোরা বিদ্ধ হওয়ায় যদিও বেশ কষ্ট পাচ্ছিলো, তবু সে এতটুকু দুর্বল হলো না।
বনহুর জংলীদের বর্শার আঘাত তার হস্তস্থিত বর্শা দিয়ে প্রতিরোধ করে চললো, এবং সঙ্গে সঙ্গে তার নিকটস্থ আক্রমণকারী জংলীদের ভূতলশায়ী করতে লাগলো। কেউ বা বনহুরের বর্শার আঘাতে ছিটকে পড়লো নীচে; কেউ বা আহত হলো, কেউ বা হলো নিহত।
বনহুরের অসীম শক্তির কাছে জংলীর দল কিছুক্ষণের মধ্যেই পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হলো। কতগুলো জংলী নিহত হলো, কতক আহত অবস্থায় ছুটে পালালো, এমন কি যারা অক্ষত অবস্থায় ছিলো তারা দৌড় দিল উদ্ধশ্বাসে, ফিরে তাকালো না আর।
এতগুলো জংলীর সঙ্গে বনহুর একা প্রাণপণে লড়াই করে অত্যন্ত হাঁপিয়ে পড়েছিলো। ট্রাকের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে হাতের পিঠে কপালের ঘাম মুছতে লাগলো।
ওদিকে লোক দুটি আর নূরী এতোক্ষণ একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ঠক্ ঠক করে কাঁপছিলো। এবার জংলীদের পালাতে দেখে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো তারা।
বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো। লোক দুজন বনহুরকে অনেক সহানুভূতিজনক কথা বলতে লাগলো। নূরী আজ স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন হলে ছুটে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়তো বনহুরের বুকে। আজকের এ বিপদ মুহূর্তে বনহুরকে ফিরে পেয়ে তার আনন্দের সীমা থাকতো না। কিন্তু নূরী নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো, একটি কথাও সে বললো না!
