লোক দুটি উঠে তাড়াতাড়ি পালাতে পারলে যেন বেঁচে যায়। ভূতল শয্যা ত্যাগ করে প্রথম ব্যক্তি দিল ভোঁ দৌড়। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বনহুর পালাবার অবসর না দিয়ে পর পর তাকে ভূতলশায়ী করতে লাগলো।
ততক্ষণে অন্যান্য লোকগুলো দ্রুত এদিকে ছুটতে শুরু করছে-সকলের হস্তেই সুতীক্ষ্ণ ধার ছোরা। সূর্যের আলোতে ছোরাগুলো ঝকমক করে উঠছে। এক সঙ্গে যেন কতগুলো বিদ্যুৎ লহরী ছুটে আসছে এদিকে।
বনহুর দ্বিতীয় লোকটাকে শূন্যে তুলে ছুড়ে মারলো দূরে।
দলপতিসহ অন্যান্য লোকগুলো দ্রুত এগিয়ে আসছিলো। লোকটা ধপ করে এসে পড়লো তাদের সম্মুখে।
দলপতি মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালো। বনহুর কালবিলম্ব না করে রিভলবার উদ্যত করে ধরলো খবরদারএগুলোই মারব।
এক সঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে পড়লো। দলপতি তার মুখোসের মধ্যের চোখ দুটি দিয়ে তাকালো। বনহুরের আজ পর্যন্ত বহু দস্যুর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছে কিন্তু কারো চোখ এমন অগ্নিগোলকের মত তীব্র মনে হয় নি।
বনহুরের হস্তস্থিত রিভলভারের দিকে তাকিয়ে দলপতি গর্জে উঠলো–কে তুমি?
বনহুর পাল্টা প্রশ্ন করলো–তুমি কে?
হাঃ হা করে হেসে উঠলো দলপতি–আমাকে চেনোনা? আবার নিরন্তু পাহাড়ের কন্দরে কন্দরে প্রতিধ্বনিত হলো সেই হাসির শব্দ, বললো দলপতি–আমার নাম কে না জানে। ডাকু হাঙ্গেরুর নাম জানেনা! আমি সেই হাঙ্গেরু ডাকু।
বনহুর একটু হেসে বললো–ওঃ তা তোমার চেহারা দেখেই বুঝতে পেরেছি।
দলপতি গর্জে উঠলো–আমার গাড়ির চালককে তুমি হত্যা করলে কেন? কেন করেছি তার জবাব পাবে এই মুহূর্তে…….
বনহুরের কথা শেষ না হতেই দলপতির ছোরা এসে বিদ্ধ হল বনহুরের বাম বাজুতে।
ডাকু হাঙ্গেরুর ছোরা এতো দ্রুত গিয়ে বনহুরের শরীরে বিদ্ধ হয়েছিলো যে, বনহুর সরে দাঁড়াবার সুযোগ পায়নি।
আহত জন্তু যেমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে, তেমনি হাঙ্গেরুর ছোরার আঘাতে হিংস্র হয়ে উঠলো দস্যু বনহুর। রিভলভার উচু করে গুলী ছাড়লো হাঙ্গেরুর বুক লক্ষ্য করে।
হাঙ্গেরু বিকট একটা আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়লো ভূতলে, সঙ্গে সঙ্গে অবাক হলো বনহুর, হাঙ্গেরুর দলবল সব যে দিকে পারে অকস্মাৎ ছুটে পালাতে লাগলো।
দলপতির মর্মান্তিক অবস্থা তার অনুচরদের একেবারে হকচকিয়ে দিয়েছে। তারা ভাবতেও পারেনি তাদের দলপতির এ অবস্থা হতে পারে। যে দিকে পারলো ছুটে পালালো।
বনহুর এবার রিভলভার পকেটে রেখে দক্ষিণ হস্তে বাম বাজু থেকে সূতীক্ষ্ণ ধার ছোরা খানা এক টানে তুলে ফেললো। সঙ্গে সঙ্গে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো।
নূরী এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো, এবার এগিয়ে এলো। বনহুরের বাজু থেকে রক্ত ঝরতে দেখে দুহাতে চোখ ঢেকে ফেললো নূরী।
বনহুর বললো–ভয় পাবার কিছু নেই। তুমি আমাকে একটু সাহায্য করো নূরী। আমার রুমালখানা দিয়ে হাতটা শক্ত করে বেঁধে দাও।
নূরী বনহুরের নির্দেশ মত কাজ করলো।
বনহুর একবার ফিরে তাকালো ডাকু হাঙ্গেরুর মৃতদেহের দিকে। তারপর নূরীসহ এগিয়ে চললো অদূরস্থ ট্রাকখানার পাশে।
ট্রাকের উপরে হাত-পা-মুখ বাধা লোক দুটি তখনও ছটফট করছে। বনহুর নিজের ব্যথা ভুলে গেলো, ট্রাকের উপর উঠে গিয়ে লোক দুটির হাত পা আর মুখের বাধন মুক্ত করে দিলো।
লোক দুটি বনহুরের দয়ায় মুক্তি লাভ করে উঠে বসলো।
বনহুর ওদের দুজনাকে নীচে নামিয়ে দিয়ে ট্রাকের ছায়ায় বসিয়ে দিলো।
লোক দুজনার মধ্যে একজন বললো–আপনি কে? আমাদের জীবন দান করলেন।
বনহুর বললো–আমি একজন মানুষ।
দ্বিতীয় ব্যক্তি বললো–আপনি আমাদের রক্ষা না করলে আমরা মারা পড়েছিলাম আর কি। ঐ শয়তান ডাকাতের দল আমাদের সব লুটে নিয়ে, আমাদেরকেও বেঁধে আনছিলো। ওরা আমাদের আটক রেখে, আমাদের আত্মীয়-স্বজনের নিকট হতে আরও অর্থ সগ্রহ করতো।
বনহুর বললো এবার–সব খোদার দয়া, তার নিকটেই শুকরিয়া করুন।
লোক দুটির চেহারা দ্র এবং ব্যবসায়ী ধরনের। বনহুর বুঝতে পারলো, ট্রাকে যে মাল রয়েছে এদেরই। নিশ্চয়ই গতরাতে শয়তান ডাকু হাঙ্গেরু তার দলবল নিয়ে এদের উপরে হামলা চালিয়ে এ সব লুটে নিয়ে এসেছে।
লোক দুটির সঙ্গে আরও কয়েকটা কথাবার্তায় বনহুর বুঝতে পারলো, এখান থেকে শহর বহু দূরে। হেঁটে যাবার কোন উপায় নেই। এ পথে কোন যান-বাহন যাতায়াত করে না, এককালে লোক চলাচলের সুন্দর ব্যবস্থা থাকলেও আজ আর নেই, কারণ,এ পথটা দস্যু আর ডাকুতে ছেয়ে গেছে। কচিৎ কোন গাড়ি এদিকে আর চলে না।
কাজেই কোন যানবাহনের আশা নেই।
ট্রাকখানা কোনক্রমে ওদিকে ফেরাতে পারলেই উপস্থিত বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যেত, কিন্তু ফেরাববা কি করে সামান্য চওড়া জায়গা হলেও বনহুরের কাছে অসাধ্য ছিলো না।
এদিকে বনহুরের বাহু দিয়ে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। যন্ত্রণা যে না হচ্ছে তা নয়, কিন্তু এখন ব্যথায় মুষড়ে পড়লে চলবে না। নিজে বাঁচতে হবে আর এদেরকেও বাঁচাতে হবে।
বনহুর কিছু ভেবে নিলো, তারপর যে দিকে তারা এখন অগ্রসর হবে, মানে যে দিক থেকে ট্রাকখানা এসেছিলো সে দিকে এগুতে লাগলো।
হস্তপদ মুক্ত লোকদ্বয় ও নূরী দাঁড়িয়ে রইলো ট্রাকখানার পাশে।
বনহুর চলে গেলো, আর তার ফিরবার কথা নাই।
বেলা প্রায় গড়িয়ে আসছে, এমন সময় ফিরে এলো বনহুর। মুখভাব কিছুটা প্রসন্ন। প্যান্টের পকেট থেকে রুমালখানা বের করে মুখমন্ডল মুছে নিয়ে বললো, পেয়েছি, উপায় পেয়েছি, কিন্তু জীবন-মরণ সমস্যা।
