বনহুর গাড়ি থেকে নেমে পিছন আসনের দরজা খুলে ধরলো–এসো নূরী।
নূরীকে নামিয়ে নিয়ে বনহুর পথের একধারে সরে দাঁড়ালো, শব্দটা অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে আসছে।
স্তব্ধ নিশ্বাসে বনহুর প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
গাড়ি ছেড়ে প্রায় পঞ্চাশ হাত দূরে একটা সমতল স্থানে নূরীসহ বনহুর দাঁড়িয়ে রইলো। জায়গাটা ঝোপ-ঝাড়ে আর আগাছায় ভরা, কাজেই পথ থেকে সহজে কেউ তাদের দেখতে পাবে না।
বনহুর আর নূরী হঠাৎ একটা প্রচণ্ড শব্দে চমকে উঠলো, সম্মুখে তাকিয়ে দেখলো—একটা মস্ত বড় ট্রাক সাঁ সাঁ করে ছুটে এসে প্রচণ্ড এক ধাক্কা মারলো পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের গাড়িখানায়। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা একটা খেলনা গাড়ির মত ছিটকে পড়লো একেবারে হাজার ফিট নীচে।
নূরী গাড়িখানার এ মর্মান্তিক অবস্থা দেখে শিউরে উঠলো, দুহাতে চোখ ঢেকে ফেললো সে।
বনহুর নূরীর কানে মুখ নিয়ে বললো–আর একটু হলেই আমাদের অবস্থা কি হতো বলতো? ঐ গাড়িখানার মত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতাম।
নূরী ভীত দৃষ্টি মেলে তাকালো হাজার ফিট নীচে গড়িয়ে পড়া চ্যাপটা গাড়িখানার দিকে।
বনহুর এবার বললো–খোদর কাছে হাজার শুকরিয়া নূরী, আমরা শোচনীয় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলাম।
বনহুর এবারে তাকিয়ে দেখলো–ট্রাকখানা তাদের গাড়িটায় ধাক্কা খেয়ে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে থেমে পড়েছে। বিস্ময়ে অবাক হয়ে দেখলো বনহুরট্রাক বোঝাই করা কি সব জিনিসপত্র রয়েছে। সে সব জিনিসের উপর বসে রয়েছে কয়েকজন বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ। লোকগুলোর দেহে অদ্ভুত ধরনের পোশাক। গায়ে বু রং এর প্যান্ট, শরীরে ঐ রং এরই সার্ট, মাথায় চোস্ত টুপি। টুপি দিয়ে সমস্ত মাথা আর মুখ টাকা, শুধু চোখগুলো জ্বল জ্বল করতে টুপির সম্মুখ ভাগের দুটো করে ফুটো দিয়ে।
ড্রাইভারের শরীরেও ঐ ধরনের ড্রেস। কিন্তু ড্রাইভ আসনের পাশে যে লোকটি বিশাল বপু নিয়ে বসেছিলো তার দেহের পোষাক সম্পূর্ণ আলাদা। গাঢ় সবুজ তার ড্রেস। মাথায় ক্যাপ ধরনের টুপি। চোখে গগলস। কানের এবং মুখের সংগে কোন যন্ত্র আঁটা রয়েছে বলে মনে হল বনহুরের!
প্রত্যেকটা লোকের বেল্টের সঙ্গে হোরা ঝুলছে, দেখতে পেল বনহুর। কিছুক্ষণ তাকিয়ে বুঝতে পারলো, লোকগুলো স্বাভাবিক নাগরিক বা জনগণ নয়। এরা কোন দস্যুদল নিঃসন্দেহে। শহর বা অন্য কোথাও ডাকাতি করে ফিরে চলেছে আস্তানায়।
বনহুর নূরীকে চুপ থাকতে বলে ঝোপের আড়াল থেকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ট্রাকের আরোহীদের কার্যকলাপ দেখতে লাগলো।
লোকগুলো ততক্ষণে ট্রাক ছেড়ে পথের উপর নেমে পড়ছে।
ড্রাইভ আসন ত্যাগ করে মোটা লোকটাও নেমে পড়েছে। লোকটা ঐ দলের নেতা বা দলপতি হবে।
ওরা সবাই ঝুকে পড়ে তাচে চূর্ণ-বিচূর্ণ গাড়িখানা দেখছে। নিজেদের মধ্যে কোন কথাবার্তাও চলছে বলে মনে হলো।
বনহুর নূরীকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে ঝোপ-ঝাড়ের আড়াল দিয়ে এগুলো, এবার আরও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। বনহুর দেখলো, দুজন লোককে ওরা দড়ি দিয়ে মজবুত করে বেঁধে রেখেছে ট্রাকে মালপত্রের সঙ্গে।
প্রখর সূর্যের তাপে লোক দুটি কালো হয়ে উঠেছে। মুখ ও হাত পা বাধা থাকায় তারা নড়তে পারছে না বা চিষ্কার করে কাঁদতে পারছে না। মাঝে মাঝে পাকাল মাছের মত শরীরটা কুঁকড়ে নিচ্ছে।
সর্দার বা দলপতি গলায় ঝোলানো যন্ত্রটা মুখে লাগিয়ে কি যেন বললো, তারপর আবার চেপে বসলো গাড়িতে।
সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য লোকগুলি সবাই গাড়িতে চেপে বসলো। ড্রাইভার গাড়িতে স্টার্ট দেবার আয়োজন করছে, এমন সময় বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে রিভলভারখানা বের করে গুলী চুড়লো ডাইভারটির বুক লক্ষ্য করে।
একটা তীব্র আর্তনাদ ভেসে এলো বনহুর আর নূরীর কানে। ট্রাক-চালক মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে গাড়ির হ্যান্ডেলের উপর। মুহূর্তে ট্রাক থেকে নেমে পড়লো দলপতি।
তৎক্ষণাৎ অন্যান্য অনুচরগণ ট্রাক থেকে লাফিয়ে নীচে পথের উপর নেমে দাঁড়ালো। সকলের চোখে-মুখে বিস্ময় মনোভাব,–এই নির্জন স্থানে গুলী এলো কোথা থেকে।
দলপতির ইংগিতে সুতীক্ষ্ম ধার ছোরা হাতে খুলে নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো।
নূরী এ দৃশ্য লক্ষ্য করে ছুটে এসে বনহুরের বুকের মধ্যে মুখ লুকালো। বনহুর নূরীকে অভয় দিয়ে বললো–ভয় নেই, ওরা তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
নূরী থর থর করে কাঁপছে।
মুহূর্তের জন্য বনহুরের মনে পড়লো, নূরী এত সহজে ভীত হবার মেয়ে ছিল না, সেও দস্যু দুহিতা……আর আজ এতো সামান্যে নূরী হরিণ শিওর মতই দুর্বলমনা হয়ে পড়েছে। বনহুর নূরীকে সান্ত্বনা দিয়ে পুনরায় বললোনূরী, তুমি আমার পাশে থাকতে কোন ভয় নেই।
হঠাৎ বনহুর দেখলো, দুজন অদ্ভুত ড্রেস পরা লোক তাদের ঝোপটার দিকে এগিয়ে আসছে। বুঝতে পারলো, ওরা আন্দাজ করে নিয়েছে—গুলীটা এদিক থেকেই গিয়েছিলো।
কিন্তু আর কিছু ভাববার সময় নাই-বনহুর প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো।
লোক দুটি এগিয়ে আসতেই বনহুর নূরীকে এক পাশে সরিয়ে ঝাপিয়ে। পড়লো একজনের ঘাড়ে। প্রচণ্ড এক ঘুষিতে লোকটিকে ধরাশায়ী করে পুনরায় আক্রমণ করলো দ্বিতীয় জনকে।
বনহুরের বলিষ্ঠ হস্তের মুঠ্যাঘাতে লোকদুটি কেমন হতভম্ব হয়ে পড়েছিলো। তাদের হাতের ছোরা ছিটকে পড়েছিলো দূরে।
