বনহুর ঐ পথ ধরেই গাড়ি চালাচ্ছিলো। এই এতোটা পথ আসতে তার তেমন কোন অসুবিধা বা কষ্ট হয়নি, কারণ পথটা সম্পূর্ণ পাকা না হলেও বেশ মসৃণ এবং সমতল ছিলো।
একটা শাল বৃক্ষের তলায় গাড়ি রাখলো বনহুর। প্যান্টের পকেট থেকে রুমালখানা বের করে ললাটের ঘাম মুছে ফেললো সে। তারপর ড্রাইভ
আসন থেকে নেমে এলো নীচে।
ইতিমধ্যে নূরীও চোখ মেলে তাকাচ্ছে ধীরে ধীরে। বনহুর পিছন আসনে উঠে বসলো, নূরীর চুলে হাত বুলিয়ে ডাকলো–নূরী!
নূরী চোখ মেলে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। উঠে বসতে গেলো। বনহুর নূরীকে শুইয়ে দিয়ে বললো–আর একটু শুয়ে থাকো। নূরী চারদিকে তাকিয়ে অবাক হলো, এটাতো তার শয়নকক্ষ নয়! ঘন বন আর পাহাড় ছাড়া কিছুই দেখতে পেলো না।
নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো বনহুর নূরী, এটা তোমার কক্ষ নয়, এটা মোটরগাড়ি।
আমি কোথায়? নূরীর কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা শব্দ।
বনহুর আরও একটু ঝুকে পড়লো নূরীর মুখের উপর, বললো–তুমি এখন শহরের বাইরে।
উঠে বসলো নূরী এবার, পুনরায় চারদিকে তাকিয়ে বললো সে–এ আপনি আমায় কোথায় নিয়ে এসেছেন?
ভয় নেই, আমি তোমাকে ভাল জায়গায় নিয়ে যাবো।
না, আমি যাবো না আপনার সঙ্গে।
এতোদিন তো আমার সঙ্গেই আছো, কই কোনদিন তো আমার সঙ্গে কোথাও যেতে আপত্তি করোনি।
নূরী নিপ কিছু ভাবতে লাগলো।
বনহুর বললো-নূরী, যেখানে ছিলাম সেখানে আমাদের জন্য বিপদ দেখা দিয়েছিলো, ওখানে থাকা আর সম্ভব নয়, তাই…।
তাই আবার আপনি আমাকে পাহাড়ে জঙ্গলে নিয়ে এলেন। আমার কিন্তু ভয় করছে, আবার যদি ঐ যাদুকর শয়তানটা আমাকে ধরে নিয়ে যায়?
হাসলো বনহুর, কুঞ্চিত করে তাকালো–নূরী, সে, শয়তান আর বেঁচে নেই, যাদুকরকে আমি হত্যা করেছিলাম।
নূরী এতোদিনে যেন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো। বললো সে–সত্যি?
হাঁ নূরী, সত্যি। বনহুর নূরীর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরলো। নির্নিমেষ নয়নে তাকালো সে নূরীর মুখের দিকে।
নূরীও তাকিয়ে ছিলো অপলক চোখে বনহুরের দিকে। বনহুর ব্যাকুল কণ্ঠে বললো–নূরী, আজও তুমি আমায় চিনতে পারলে না? গলার স্বর বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো তার।
নূরী অনেক বার একথা শুনেছে বনহুরের মুখে; অনেকদিন ভেবেছেস্মরণ করতে চেষ্টা করেছে; কিন্তু কিছুই তার মনে পড়েনি। আজও নূরী ভাবে–কিছুতেই স্মরণ হয়না কোন কথা।
বনহুর হতাশভাবে নেমে যায় পিছন আসন থেকে। ড্রাইভ আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দেয়। আবার ছুটতে শুরু করে বনহুরের গাড়িখানা।
অবিরাম এগিয়ে চলে সম্মুখের দিকে। পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা পথ। এবার সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে বনহুরকে; কারণ একটু এদিক ওদিক হলেই আর কি-হাজার ফিট নীচে গাড়িখানা পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে।
বনহুর নূরীকে সাবধানে চুপ করে বসে থাকতে বললো।
সত্যি, বনহুর যে পথে গাড়ি চালাচ্ছিলো সে পথ অতি দুর্গম, অতি ভয়ঙ্কর পথ। এই পথটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কেউ জানেনা। বনহুর লোকমুখে শুনেছিলো, এ পথটা নাকি চলে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে বহু দুরে–কোন এক নগরের বুকে গিয়ে মিশেছে। আর সে পথ বেয়ে বনহুর অজানা নগরের দিকে ছুটে চলেছে।
এ পথে তেমন কোন গাড়ি বা লোকজনের আনাগোনা ছিলোনা, কাজেই বনহুরের গাড়ি চালাতে অন্য কোন বাধা সৃষ্টি হচ্ছিলো না।
বেলা ক্রমেই বেড়ে উঠছিলো, বনহুর নিজে বেশ ক্ষুধা অনুভব করলো। নূরীর যে ক্ষুধা পেয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। গত রাতে তারা আহার করেছিলো আর আজ এতো বেলা হলো কোন কিছু মুখে পড়েনি।
এমন জায়গা,–পাহাড় আর পাথর ছাড়া কিছুই নেই কোনখানে। হঠাৎ দুএকটা বৃক্ষাদি নজরে পড়ে কিন্তু সেগুলো কোন ফলবৃক্ষ নয়। বনহুর নিজের জন্য চিন্তিত না হলেও নূরীর জন্য বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। কি করা যায়, একটু কিছু নূরীকে খাওয়াতে পারলে কতকটা নিশ্চিন্ত হতে পারতো সে।
বনহুরের গাড়ি এখন স্বাভাবিক গতিতে এগুচ্ছিলো। এখন পথটা আরও সঙ্কীর্ণ দুর্গম। অতি সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছিলো বনহুর।.
নূরী নিপ বসেছিলো পিছন আসনে। মুখে তার কোন কথা নেই। বনহুর মাঝে মাঝে নূরীর সঙ্গে দুএকটা কথাবার্তা বলে তাকে উৎসাহিত করছিলো। নূরী তার কথায় দুএকটা জবাব দিলেও তেমন কোন ভাব ছিলো
তার মধ্যে বনহুর যার মধ্যে কোন আনন্দ বা উৎসাহ খুঁজে পায় না। বনহুর ভাবছিলো, কোন রকমে একবার কান্দাই-এ নিজ আস্তানায় পৌঁছতে পারলে নূরীর চিকিৎসার সুযোগ আসবে। যাদুকর নূরীকে এমন কোন ঔষধ দ্বারা তার স্বাভাবিক জ্ঞান সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছিলো যার জন্য আজও নূরী তাকে চিনতে পারছে না বা পারেনি। যে নূরী তাকে এক মুহূর্ত
দেখলে ব্যস্ত হয়ে পড়তো, একটু কথা না বললে অভিমানে মুখ ভার করে থাকতো, আজ সে নূরী—
বনহুরের চিন্তাজালে বাধা পড়লো, একটা শব্দ ভেসে আসছে তার কানে। দূরে বহু দূরে কোন মোটর গাড়ির শব্দ হচ্ছে যেন।
বনহুর বেশ চিন্তিত হলো। গাড়ির শব্দটা সম্মুখ দিক থেকেই যেন আসছে।
পথটা এতো সঙ্কীর্ণ, যে পাশাপাশি দুখানা গাড়ি চলা কঠিন। কাজেই সম্মুখ দিকে কোন গাড়ি এসে পড়লে বিপদ অনিবার্য।
শব্দটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে আসছে, সম্মুখের গাড়িখানা যে অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে আসছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বনহুর নিজের গাড়ি থামিয়ে ফেললো, এবং নূরীকে বললো–শিঘ্ৰ নেমে পড়ো নূরী।
