বনহুর জানতো, অরুণ বাবু জ্যোছনা রায়কে গভীরভাবে ভালবাসে, এবং সে জন্যই সে তার পিছনে লেগে রয়েছে ছায়ার মত। বনহুরের সঙ্গে জ্যোছনার মেলামেশা তার কাছে অসহ্যনীয়।
কিন্তু বনহুর শেষ পর্যন্ত সর্বান্তঃকরণে অনুভব করেছিলো, অরুণ বাবু জ্যোছনা রায়কে বার বার হত্যার হুমকি দেখালেও আসলে সে কোন দিন জ্যোছনা রায়কে হত্যা করতে পারতো না। কারণ, অরুণ বাবু তাকে। ভালবাসতো সত্যি করে। প্রেম-প্রীতি ভালবাসা দিয়েও যখন সে জ্যোছনা রায়ের কাছে এতোটুকু করুণা পায়নি, তখন সে ক্ষেপে উঠেছিলো চরম ভাবে। তখনই সে হত্যার হুমকি দেখাতেও কসুর করেনি জ্যোছনা রায়কে।
তারপর বনহুর আবিস্কার করেছিলো জ্যোছনা রায়ের আসল হত্যাকারীকে। শুধু আবিস্কার করেই সে ক্ষান্ত হয় নি, নিজ হস্তে জ্যোছনা রায়ের হত্যাকারীকে সমুচিত শাস্তি দিয়ে তবেই নিশ্চিন্ত হয়েছিলো।
পুলিশের হাতেও সঁপে দিতে পারতো বনহুর আরফান উল্লাহকে। কিন্তু তা সে করে নি। কারণ, হত্যাকারী কোটিপতি, লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করতে তার কিছুমাত্র কষ্ট হতো না। পুলিশের হাত থেকে অনায়াসে সে নিজেকে মুক্তি করে নিতো তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাজেই বনহুর স্বয়ং আরফান উল্লাহকে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত দিয়েছিলো।
আরফান উল্লাহই যে জ্যোছনা রায়ের হত্যাকারী, এটাও বনহুর প্রমাণ করে দিয়েছিলো পুলিশের কাছে টেপ রেকর্ডের মাধ্যমে। কাজেই কে আসল খুনী সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো।
আরফান উল্লাহকে হত্যার পূর্বে বুদ্ধিমান দস্যু বনহুর টেপ রেকর্ড রেখে কথোপকথন করেছিলো তার সঙ্গে এবং শেষ পর্যন্ত হত্যা করেছিলো তাকে, এমন কি নিজের পরিচয়টাও আরফান উল্লাহকে দিয়েছিলো স্বয়ং দস্যু বনহুর।
পুলিশ যখন আরফান উল্লাহর লাশের পাশে আবিষ্কার করলো টেপ রেকর্ড, এবং টেপ রেকর্ড থেকে জানতে পারলো জ্যোছনা রায়ের আসল হত্যাকারীকে, তখন পুলিশ মহল শুধু বিস্মিতই হলোনা, স্তব্ধও হলো।
খুনীকে গ্রেপ্তারের পূর্বেই সে নিহত হয়েছে, এবং তাকে হত্যা করেছে যে ব্যক্তি, সে অন্য কেহ নয়–স্বয়ং দস্যু বনহুর।
এদিকে পুলিশ মহলে যখন জ্যোছনা রায় ও আরফান উল্লাহর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় শুরু হলো, ঠিক তখন দস্যু বনহুর সংজ্ঞাহীন নূরীকে নিয়ে কান্দাই-এর পথে ছুটে চলেছে।
নূরীকে সংজ্ঞাহীন করেছে বনহুর, না হলে সে রাতের অন্ধকারে হঠাৎ এ ভাবে তার সঙ্গে রওয়ানা দিতে রাজি হতো না। একটা বিভ্রাট ঘটিয়ে বসতো হয়তো সে। সেই কারণেই বনহুর এই উপায় অবলম্বন করছে।
জ্যোছনা রায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে বনহুর যখন তার বাসায় ফিরে গিয়েছিলো তখন নূরী নিজের কক্ষের বিছানায় গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিলো।
বনহুর কিছু পূর্বে আরফান উল্লাহকে হত্যা করলেও ঠিক পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক ছিলো, এতোটুকু পরিবর্তন আসেনি তার মধ্যে। কারণ, বনহুরের নরহত্যা নেশা না হলেও এটা তার অভ্যাসগত ব্যাপার, কাজেই বিচলিত হবার কিছুই ছিলো না বনহুরের।
নূরীর কক্ষে প্রবেশ করে সোজা গিয়ে দাঁড়ালো নূরীর শয্যার পাশে। এই রাতেই তাকে এ শহর ত্যাগ করতে হবে। কাজ শেষ হয়েছে, এবার ফিরতে হবে কান্দাই-এ। যেখানে তার প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছে স্নেহময়ী জননী আর প্রেয়সী স্ত্রী মনিরা। কিন্তু নূরী আজ স্বাভাবিক জ্ঞানবতী নেই, তাকে পাগল বললেও ভুল হয় না। যাদুকরের কোন বিষময় ঔষধে আজ সে জ্ঞানশূন্য।
এই গভীর রাতে নূরী কিছুতেই তার সঙ্গে পালাতে রাজি হবে না সহজে। হয়তো একটা হট্টগোল বাধিয়ে বসতে পারে। তাই বনহুর নূরীকে অজ্ঞান করে তুলে নিলো হাতের উপরে।
সমস্ত বাড়িখানা ঝিমিয়ে পড়েছিলো, এমন কি বাড়ির চাকর বাকররাও ঘুমিয়ে ছিলো আরামে।
বনহুর নূরীর সংজ্ঞাহীন দেহটা হাতের উপর তুলে নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো বাইরে।
অদূরে পাইন গাছের আড়ালে দণ্ডায়মান নতুন গাড়িখানার পাশে এসে একবার সচকিতভাবে তাকিয়ে দেখে নিলো বাড়ির খানার দিকে। আজ এক বছরের কত স্মৃতি জড়ানো রয়েছে ঐ বাড়িখানায়। ক্ষণিকের জন্য একবার বনহুরের মনে ভেসে উঠেছিলো আতিয়ার মুখখানা।
গাড়ির পিছন আসনে নূরীকে শুইয়ে দিয়ে ড্রাইভ আসনে এসে বসলো বনহুর। তারপর গাড়িতে স্টার্ট দিলো। বনহুর একবার পকেটে হাত দিয়ে রিভলভারখানার অস্তিত্ব অনুভব করে নিতে ভুললো না।
জনহীন রাজপথ বেয়ে বনহুর উল্কাবেগে গাড়ি চালিয়ে চললো। রাত ভোর হবার পূর্বেই তাকে শহরের বাইরে গিয়ে পৌঁছতে হবে।
০২.
পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে।
বনহুরের গাড়ি এখন শহর ছেড়ে একটা পাহাড়ের পাশ কেটে এগুচ্ছে। এতো স্পীডে গাড়ি চালিয়ে এসেছে বনহুর যে, মাত্র কয়েক ঘন্টায় শহর ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছে।
বনহুরের ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। চুলগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে ললাটের চারপাশে।
এখনও নূরীর সংজ্ঞা ফিরে আসে নি। ছিন্ন লতার ন্যায় পিছন আসনে লুটিয়ে আছে নূরী। এক গুচ্ছ রজনী গন্ধার মতই সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে।
বনহুর একটি নির্জন স্থানে গাড়ি রাখলো। দক্ষিণ পাশে উঁচু পাহাড়। ঝোপ-ঝাপ আর আগাছায় ভরা জায়গাটা। মাঝে মাঝে বৃহৎ বৃহৎ কৃক্ষ কালের প্রহরীর মত মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে। কোন কোন স্থানে বন আর গভীর জঙ্গল। এসবের পাশ কেটেই এগিয়ে গেছে একটা প্রশস্ত পথ সম্মুখের দিকে।
