আমি….আমিই জ্যোছনা রায়কে হত্যা করেছি। আমিই তাকে…হত্যা..ক..রে..ছি… আরফান উল্লাহর চোখেমুখে ফুটে উঠলে খুনীর সুস্পষ্ট ছাপ।
জমকালো মূর্তি পুনরায় চাপস্বরে গর্জে উঠলো-কি অপরাধ সে করেছিলো তোমার?
অপরাধ! অপরাধ…সে…থামলেন আরফান উল্লাহ।
জমকালো মূর্তি দাঁতে দাঁত পিষে বললো-একটা কথা মিথ্যা উচ্চারণ করলেই এই ছোরা তোমার বুকে বিদ্ধ হবে-ভুলে যেও না, তুমি যমদুতের সামনে কথা বলছে।
আরফান উল্লাহ ভয়ার্ত চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগলেন ছোরাখানার দিকে। একখানা মৃতুমলিন বিবর্ণ মুখ ভেসে উঠলো সেই মুহূর্তে তার চোখের সামনে। অসহায় করুণ দুটি নিষ্পাপ চোখ। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ভরা করুণ কণ্ঠস্বর….আপনি…আমাকে হত্যা করবেন…কি অপরাধ আমি করেছি…কোনো জবাব সে পায়নি, একখানা সুতীক্ষ্ণধার ছোরা সমূলে বিদ্ধ হয়েছিলো জ্যোছনা রায়ের বুকে। একটা তীব্র আর্তনাদ শুধু ক্ষণিকের জন্য ছড়িয়ে পড়েছিলো কক্ষে-দৃশ্যটা আরফান উল্লাহর চোখে ফুটে উঠলো। ভয়বিহ্বল দৃষ্টি মেলে তাকালেন তিনি জমকালো মূর্তির দিকে।
আরফান উল্লাহ এবার বললেন-অপরাধ সে কিছুই করেনি কিন্তু-কিন্তু…
কেন তুমি তাকে হত্যা করলে?
আমার কন্যা আতিয়ার সুখের জন্য….
বলো থামলে কেন?
মিঃ চৌধুরীকে আমার আতিয়া ভালবাসে কিন্তু মিঃ চৌধুরী ভালবাসে মিস জ্যোছনা রায়কে…তাই…তাই পথের কাঁটা আমি সরিয়ে ফেলেছি। তাই …হত্যা করেছি ওকে…
একটানে মুখের কালো আবরণ খুলে ফেললো জমকালো মূর্তি।
সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়ভরা অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলেন আরফান উল্লাহ মিঃ চৌধুরী…আপনি…
হাঁ, কিন্তু মিঃ চৌধুরী নয়, দস্যু বনহুর।
দস্যু বনহুর! আমার কুন্তিবাঈ ছবির নায়ক দস্যু বনহুর! এ্যাঃ এ্যাঃ…আপনি…আপনি-আমার আতিয়া তবে-তবে সে ভুল করেছে-কোনোদিন সে মিঃ চৌধুরীকে পাবে না?
শুধু আতিয়াই ভুল করেনি, ভুল করেছো তুমি-জ্যোছনা রায়কে হত্যা করে যে ভুল তুমি করেছো তার প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করো–
সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের হাতের ছোরা সমূলে বিদ্ধ হলো কুন্তিবাঈ ছবির প্রযোজক আরফান উল্লাহর বুকে। তীব্র একটা আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে গড়িয়ে পড়লেন তিনি খাটের নীচে। চীৎ হয়ে পড়ে রইলো আরফান উল্লাহ। তাজা লাল টকটকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো মেঝের মূল্যবান কার্পেটের ওপর।
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
প্যান্টের পকেট থেকে মূল্যবান ছোট টেপ রেকর্ডার বের করে টেবিলে রাখলো। এতক্ষণ বনহুরের পকেটে চালু ছিলো টেপরেকর্ডার। প্রথম থেকে আরফান উল্লাহর সঙ্গে বনহুরের যে কথাবার্তা হয়েছিলো সব রেকর্ড হয়ে গেছে। এবার সুইট টিপে টেপরেকর্ডটা বন্ধ করে দিলো বনহুর।
তারপর বালিশের তলা থেকে বের করে নিলো চাবির গোছা। এগুলো আলমারীটার দিকে যার মধ্যে সঞ্চিত রয়েছে আরফান উল্লাহর উপার্জিত লাখ লাখ টাকা।
০৭.
পুলিশ অফিস।
ইন্সপেক্টারের টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো ক্রিং ক্রিং করে। ফোনটা বেজেই চলেছে সশব্দে।
ভোর সাড়ে পাঁচটা।
দুজন পুলিশ পাহারারত। অফিস-ইনচার্জ ও, সি ধরলেন—হ্যালো-হ্যালো–
ওদিক থেকে ভেসে এলো দস্যু বনহুরের কণ্ঠস্বর-মিঃ আরফান উল্লাহ খুন হয়েছেন। এইমাত্র তাকে খুন করা হলো–
ওসির হাত থেকে রিসিভার খসে পড়তে যাচ্ছিলো, শক্ত করে ধরে বললেন তিনি-হ্যালো, আপনি কে কথা বলছেন? কোথা থেকে বলছেন?
ওদিক থেকে ভেসে এলো বনহুরের গলা-দস্যু বনহুর কথা বলছি। কুন্তিবাঈ ছবির প্রযোজক আরফান উল্লাহর বাড়ি থেকে।
দস্যু বনহুর!
মুহূর্ত বিলম্ব না করে চলে আসুন। পুলিশ ফোর্সসহ চলে আসুন…হ্যালো, দেরী করবেন না, চলে আসুন-ওদিকে রিসিভার রাখার শব্দ হলো।
ওসির হাত কাঁপছিলো, তাড়াতাড়ি রিসিভার রেখে একটু সুস্থ হয়ে নিলেন, পরক্ষণেই আবার রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে ইন্সপেক্টারকে ফোন করলেন-আরফান উল্লাহ খুন হয়েছেন। এক্ষুণি সেখানে যেতে হবে–
পুলিশ ভ্যান যখন আরফান উল্লাহর বাড়ির গেটে এসে থামলো তখনও আতিয়ার ঘুম ভাঙ্গেনি।
ওদিকে তখন দস্যু বনহুর নূরীসহ তার নতুন গাড়িখানা নিয়ে অজানা পথ ধরে স্পীডে এগিয়ে যাচ্ছে। রাত ভোর হবার পূর্বেই এ শহর ছেড়ে দূরে-বহুদূরে চলে যেতে হবে তাকে।
১.১৬ কান্দাই-এর পথে দস্যু বনহুর
ডবল স্পীডে গাড়িখানা ছুটে চলেছে। ড্রাইভ করছে স্বয়ং দস্যু বনহুর। গাড়ির পিছনের আসনে সংজ্ঞাহীন নুরী। মাঝে মাঝে বনহুর নূরীর দিকে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলো, আসনের নীচে গড়িয়ে পড়ে না যায়।
বনহুরের দৃষ্টি গাড়ির সম্মুখ পথে থাকলেও মনের মধ্যে নানা চিন্তার জাল ছড়িয়ে পড়ছিলো।…জ্যোছনা রায়কে হত্যার জন্য বনহুর হত্যা করলো আরফান উল্লাহকে। কারণ, আরফান উল্লাহই জ্যোছনা রায়ের হত্যাকারী। বনহুর যখন স্টুডিওতে প্রথম দিন পদার্পণ করেছিলো, সেই দিনই বিশ্রাম–কক্ষে জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে আলাপকালে দেখেছিলো দুটি চোখ। শার্শির ফাঁকে চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠে মিশে গিয়েছিলো তখনই। বনহুর জ্যোছনা রায়কে এ কথা না বলেই দ্রুত পদে গিয়েছিলো শার্শির পাশে। জানালার শার্শি খুলে লক্ষ্য করেছিলো বারান্দার চারপাশে কিন্তু কাউকেই নজরে পড়ে নি। বনহুরের সন্দেহ হয়েছিলো, জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে তার মেলামেশা কেউ যেন ফলো করছে। এবং সে লোকটি অরুণ বাবু ছাড়া অন্য কেহ নয়। সেদিনের পর থেকেই বনহুর অরুণ বাবুর উপর গোপনে নজর রেখেছিলো তীক্ষ্মভাবে।
