মিঃ উল্লাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং বেরিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে।
হাঁ, সেই দুটি চোখ।
ফিরে এলো বনহুর ড্রইংরুমে।
কয়েক মিনিট পর এলেন আরফান উল্লাহ-ও ঘরে তো কাউকে দেখলাম না মিঃ চৌধুরী?
আশ্চর্য! একটু পূর্বেই তো আমি ও ঘরে অরুণ বাবুকে বসিয়ে রেখে এসেছিলাম।
বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললেন আরফান উল্লা–অরুণ বাবু! একটু থেমে বললেন-আমারও ঐ রকম সন্দেহ হয়েছিলো।
কিন্তু এই হত্যার মূল কারণ আমি।
আপনি! বলেন কি মিঃ চৌধুরী।
যা সত্য তাই বলছি মিঃ উরাহ, আমিই জ্যোছনা রায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী!
আরফান উল্লাহ অবাক কণ্ঠে বললেন-আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনার কথা।
বুঝতে পারবেন, যেদিন হত্যাকারী আপনার সামনে উপস্থিত হবে।
অরুণ বাবুকে আমারও সন্দেহ হয়েছিলো প্রথম থেকে। কারণ সে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দিয়েছে।
বনহুর একটা শব্দ করলো-লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে?
হাঁ, পুলিশ তদন্তের পর লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তার বাড়িতে সংবাদ দেওয়া হয়েছে? মানে মিস জ্যোছনা রায়ের বাড়িতে তার হত্যার সংবাদ দিয়েছেন?
হাঁ, তার মা এসেছিলেন আহা, বেচারী একেবারে পাগলিনী হয়ে পড়েছেন।
বনহুর কোনো কথা বললো না।
আরফান উল্লাহ বলে চলেছেন-মিস জ্যোছনা রায়কে হারিয়ে আমি অত্যন্ত শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি। আমার ব্যবসারও ভীষণ ক্ষতি হলো ওকে হারিয়ে।
না হলে আপনি এত রাতে আসবেন কেন? যাক, যা ওর ভাগ্যে ছিলো হয়ে গেছে।
হাঁ সে কথা অবশ্য সত্যি। অমন হিরোইন আর পাবো কিনা সন্দেহ।
তা মিস আতিয়া…..
ঠাট্টা করছেন?
ঠাট্টা নয়, আপনার পরবর্তী ছবির হিরোইন হবে আতিয়া।
আর হিরো?
আমি, আমিই আতিয়ার বিপরীতে কাজ করবো। মিঃ উল্লাহ, সেই ছবি হবে অদ্ভুত-অপূর্ব! সে ছবি বক্স অফিস হিট করবে।
আনন্দের আতিশয্যে অস্ফুটধ্বনি করলেন আরফান উল্লাহ-মিঃ চৌধুরী।
যা গেছে তা নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই, আপনি আগামী ছবির জন্য প্রস্তুত হোন মিঃ উল্লাহ।
আমি আনন্দে আত্মসংযম হারিয়ে ফেলছি মিঃ চৌধুরী। পরবর্তী ছবিতে আপনি যত টাকা চাইবেন দেবো! যা চাবেন পাবেন।
ভ্রূকুঞ্চিত করে আরফান উল্লাহর মুখে তাকিয়ে রইলো বনহুর।
খুশিতে দুলে উঠছে আরফান উল্লাহর ভুঁড়িটা।
বনহুর বললো এবার-মিঃ উল্লাহ, রাত বেড়ে আসছে।
হাঁ, দুটোর বেশি হয়ে গেছে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন আরফান উল্লাহ।
বনহুর হাই তুলে উঠে দাঁড়ালো-মিস আতিয়াকে, সকালে আসতে বলবেন, কথা আছে তার সঙ্গে।
আস্থা, নিশ্চয়ই বলবো। খুশিতে আরফান উল্লাহর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো।
বনহুর আরফান উল্লাহকে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলো।
বাড়ি ফিরে আরফান উল্লাহ নিশ্চিন্ত মনে শয্যা গ্রহণ করলেন। রাজপ্রাসাদের মত মস্ত বাড়ির দ্বিতল একটা কক্ষে, দুগ্ধফেননিত বিছানায় গা ঢেলে দিলেন আরফান উল্লাহ। রাত তখন চারটে বাজতে কয়েক মিনিট বাকী। শিয়রে আলমারী। লক্ষ লক্ষ টাকা, প্রতিদিন আলমারীতে এসে জমা হচ্ছে। অর্থলোভী আরফান উল্লাহ দুলাখ টাকা মূল্যের সোনা মধুগঙ্গার বুকে, হারিয়ে উম্মাদ হয়ে উঠলেন-আরও অর্থ চাই তার, আর চাই মিঃ চৌধুরীকে-এমন সুপুরুষ যুবককে তার প্রডাকশনের প্রতিটি ছবির নায়ক রূপে পেলে অর্থের কোনো অভাব হবে না। হিরো পাওয়া খুব মুশকিল নয়, অর্থ হলে সব হয়। শুধু ছবির হিরোর জন্য আরফান উল্লাহ ব্যস্ত নন-তার একমাত্র আদরিণী কন্যার জামাতারূপেও মিঃ চৌধুরী অপূর্ব!
মিঃ চৌধুরী অনেকখানি নমনীয় হয়ে এসেছে। আতিয়াকে এবার সে। বিয়ে করতে রাজী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
পাশের কামরায় আতিয়া তখন বিছানায় ঘোৎ ঘোৎ করে নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন গুড় গুড় করে আষাঢ়ে মেঘ ডাকছে।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছেন আরফান উল্লাহ। বালিশের তলায় আলমারীর চাবির গোছা একবার হাত দিয়ে দেখে নিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন। তারপর নিশ্চিন্তে চোখ দুটো বন্ধ করলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন জানালার শার্শী খুলে গেলো। সারা শরীরে জমকালো পোশাক পরিহিত, মুখে মুখোশ, দক্ষিণ হাতে সুতীক্ষ্ণধার ছোরা, কক্ষে প্রবেশ করলো এক ব্যক্তি।
একটা শব্দ হতেই আরফান উল্লাহ বিছানায় দ্রুত উঠে বসলেন, ফিরে তাকাতেই বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো তার মুখমণ্ডল।
ততক্ষণে জমকালো পোশাক পরিহিত মূর্তি ছোরা উদ্যত করে আরফান, উল্লাহর সামনে এসে দাঁড়ালো।
ভীত কম্পিত কণ্ঠে বললেন আরফান উল্লাহ-কে তুমি?
গভীর চাপা কণ্ঠস্বর জমকালো মৃর্তির-যমদুত!
ঢোক গিলে বললেন আরফান উল্লাহ-কি চাও তুমি?
জানতে চাই জ্যোছনা রায়কে কেন তুমি হত্যা করেছে?
আমি-আমি জ্যোছনা রায়কে হত্যা করিনি!
মিথ্যা কথা বলতে চেষ্ট করোনা।
কে তুমি?
একটু পরেই আমার পরিচয় পাবে। তার পূর্বে জবাব দাও-জ্যোছনা রায়কে কেন তুমি হত্যা করেছো?
আমি তাকে হত্যা করিনি।
তুমি তাকে হত্যা করোনি?….বাম হাতে আরফান উল্লাহর টুটি টিপে ধরলো জমকালো মূর্তি, তার হাতের ছোরাখানা ডিমলাইটের আলোতে ঝক্ঝক করে উঠলো।
আরফান উল্লাহর চোখ দুটো ছানাবড়ার মত হয়ে উঠেছে। মুখটা হা হয়ে গেছে, গোঁ গোঁ শব্দ করে বললেন-আমাকে প্রাণে মেরো না। আমাকে প্রাণে মেরো না, বলছি….বলছি….
জমকালো মূর্তি সোজা হয়ে দাঁড়ালো, বাম হাত আরফান উল্লাহর গলা থেকে সরিয়ে বললো-বলো?
