ছবির কাজ আজ থেকে সমাধা হলো, এবার নিশ্চিন্ত হলো বনহুর। শুধু স্টুডিও থেকেই বিদায় নিচ্ছে না, বিদায় নিচ্ছে চলচ্চিত্র থেকে। অভিনয় শুধু সে ক্যামেরার সামনেই করেনি, অভিনয় করেছে প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে। আপন মনেই হাসলো বনহুর…দস্যু বনহুর হয়েছে চিত্রনায়ক।
দ্রুত প্রবেশ করলো সে জ্যোছনা রায়ের বিশ্রামকক্ষে। সঙ্গে সঙ্গে অকুটধ্বনি করে থমকে দাঁড়ালো-উঃ!
বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখলো বনহুর-সোফায় অর্ধশায়িত অবস্থায় বসে আছে মিস জ্যোছনা রায়। বুকে একটা সুতীক্ষ্ণধার ছোরা সমূলে বিদ্ধ হয়ে আছে। লাল টকটকে তাজা রক্তে ভেসে যাচ্ছে বক্ষবসন। কিছুটা রক্ত গড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে কার্পেটের ওপর। চোখ দুটো ভোলা, তাকিয়ে আছে যেন সামনের দিকে।
বনহুর মুহূর্তে স্থির হয়ে দাঁড়ালো।
চোখ দুটো তার ঝাপসা হয়ে এলো খানিকের জন্য। প্রাণহীন জ্যোছনা রায়ের কপালে হাত রাখলো-মিস রায়, আপনার কাজ শেষ হয়েছে। ধীরে ধীরে দক্ষিণ হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে দিলো ওর।
ঠিক সেই মুহূর্তে দুটো চোখ শার্শির ফাঁকে ভেসে উঠে সরে গেলো।
বনহুরের দৃষ্টি বিনিময় হলো শার্শীর চোখ দুটির সাথে। এমন সময়ে বাইরে পদশব্দ শোনা গেলো!
বনহুর ক্ষিপ্ত পদক্ষেপে পেছনে খোলা জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলেন নাহার চৌধুরী-মিস রায়, চলুন মিঃ উল্লাহ আপনাকে ডাকছেন-কথা শেষ করেই আর্তচীৎকার করে উঠলেন তিনি-খুন, খুন, খুন….
চারদিক থেকে ছুটে এলো লোকজন। অল্পক্ষণের মধ্যেই আরফান উল্লাহ, ক্যামেরাম্যান অনন্ত বাবু এবং ইউনিটের সবাই জ্যোছনা রায়ের বিশ্রামকক্ষে এসে জড়ো হলেন। সকলেরই চোখেমুখে ভীত উৎকণ্ঠা ভাব। সবাই স্তম্ভিত হতবাক। জ্যোছনা রায় কেন খুন হলো, কে তাকে খুন করলো, কি করে খুন হলো-কিন্তু কে জবাব দেবে এই হত্যা রহস্যের? যে তাকে খুন করেছে সেই জানে আর জানে মৃত জ্যোছনা রায়।
.
আপন কক্ষে পায়চারী করছে বনহুর। মুখমণ্ডল গম্ভীর। ললাটে গভীর চিন্তারেখা ফুটে উঠেছে। মাঝে মাঝে অধর দংশন করছে সে। মিস জ্যোছনা রায়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন সে।
কে এই নির্মম হত্যাকারী যে একটা নিষ্পাপ ফুলের মতো জীবন চিরতরে বিনষ্ট করে দিলো? কার ঐ চোখ দুটো যা সর্বক্ষণ জ্যোছনা রায়কে অনুসরণ করতো? ঐ চোখ দুটি যার সেই যে জ্যোছনা রায়ের হত্যাকারী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কার ঐ চোখ দুটো….বনহুর পায়চারী। করছে আর মনোযাগ দিয়ে স্মরণ করছে, কার ঐ চোখ দুটো?
পুরুষের না নারীর!
ঢং ঢং করে দেয়াল ঘড়িটা রাত বারোটা ঘোষণা করলো।
বনহুর থমকে দাঁড়ালো। পাশের কামরায় ঘুমিয়ে আছে নূরী। ইয়াসিন ছাড়া চাকর বাকর সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
ড্রয়ার খুলে রিভলবার বের করে আনলো বনহুর, প্যান্টের পকেটে রেখে, চাবির গোছা তুলে নিলো হাতে-আলমারী খুলতে যাবে, এমন সময় বাইরে মোটর থামার শব্দ হলো।
বনহুর তাড়াতাড়ি আলমারীর চাবি বন্ধ করে শয্যায় এসে শুয়ে একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলো।
এমন সময় ইয়াসিন এসে দরজার বাইরে থেকে বললো-সাহেব, মালিক আইছেন।
বনহুর ধড়মড় করে উঠে বসলো–বলো গিয়ে আসছি।
চলে যায় ইয়াসিন।
বনহুর দ্রুত শরীরের পোশাক পাল্টে নাইট ড্রেস পরে নেয়। তারপর চুলগুলো আংগুল দিয়ে এলোমেলো করে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখোভাব স্বাভাবিক করে নেবার চেষ্টা করে। আরফান উল্লাহ যেন বুঝতে না পারেন জ্যোছনা রায়ের হত্যাকাণ্ডের কথা সে জানে।
স্লিপিং গাউনটা পরে নিয়ে বেল্টের ফিতা বাঁধতে বাঁধতে কক্ষ থেকে। বেরিয়ে আসে বনহুর। সে যেন হত্যাকাণ্ডের কিছুই জানে না, এমন স্বাভাবিক ভাব মুখে ফুটিয়ে তোলে।
হলঘরে প্রবেশ করতেই বনহুর দেখতে পেলো হলঘরের মেঝেতে উৎকণ্ঠিত এবং ব্যস্তভাবে পায়চারী করছেন আরফান উল্লাহ। মুখোভাব গম্ভীর থমথমে, আষাঢ়ের আকাশের মতোই অন্ধকার।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো-হ্যালো মিঃ উল্লাহ, আপনি!
আরফান উল্লাহ ফিরে তাকালেন বনহুরের মুখে, ঢোক গিলে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন-মিঃ চৌধুরী, বড় দুঃসংবাদ!
দুঃসংবাদ! বনহুর চোখে মুখে বিস্ময় টেনে বললো।
হাঁ, মিস জ্যোছনা রায় নিহত হয়েছেন।
কি বললেন, মিস রায় নিহত হয়েছেন!
হাঁ। তার কাজ হয়ে গেছে-কথাটা বলে বনহুর আরফান উল্লাহর মুখে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
আরফান উল্লাহ বনহুরের কথায় যেন একটু চমকে উঠলেন!
বনহুর বললো-বসুন মিঃ উল্লাহ।
আরফান উল্লাহ বসে পড়লেন একটা সোফায় ধপ করে।
বনহুরের ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠলো, বললো যে একটা উজ্জ্বল তারকা খসে পড়লো চিরতরে।
হাঁ মিঃ চৌধুরী, আপনি সত্য কথা বলেছেন। জ্যোছনা রায় একটা দীপ্ত প্রতিভা ছিল।
কে সেই দীপশিখা নিভিয়ে দিলো বলতে পারেন?
আমি-আমি কেমন করে বলবো মিঃ চৌধুরী?
সে কথা সত্য, আপনি কি করে বলবেন মিস রায়ের হত্যাকারী কে। কিন্তু আমি জানি কে তাকে হত্যা করেছে।
আপনি-আপনি জানেন? জানেন কে জ্যোছনা রায়কে হত্যা করেছে?
জানি। কারণ আমি জানতাম, মিস রায় নিহত হবে।
জানতেন!
হাঁ, জানতাম মিঃ উল্লাহ। আপনি ঐ কক্ষের শার্শীর ফাঁকে দেখুন, হত্যাকারী ঐ কক্ষে আছে। বনহুর পাশের কক্ষে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো।
