বনহুর জ্যোছনা রায়কে তার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরে এলো নিজের বাসায়।
গোটা রাত ঘুমাতে পারলো না সে।
কত কথা আজ বনহুরের মনের আকাশে ভেসে উঠে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলো।
স্বদেশে ফিরবার জন্য মন তার আকুলি-বিকুলি করছে।
বহুদিন বাইরে কাটালো সে। নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছে সে। না জানি তার আস্তানার অবস্থা কি। রহমান তার অনুপস্থিতিতে কি করছে। তারা কেমন আছে। মায়ের কথা স্মরণ হতেই অশ্রুসজল হলো বনহুরের চোখ দুটো। মনিরা কেমন আছে, নিশ্চয়ই সে কেঁদে কেঁদে আকুল হয়ে পড়েছে। মনিরার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বনহুরের মন চঞ্চল হয়ে পড়লো।
এদিকে নূরীর চিকিৎসার আশু প্রয়োজন।
আস্তানায় ফিরে না গেলে কিছুই হচ্ছে না।
ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় নতুন এক পথে পা বাড়িয়েছিলো সে। দস্যু হয়ে চিত্রনায়করূপে.আত্নপ্রকাশ করেছে। ছবির কাজ শেষ, এবার তার ছুটি।
কিন্তু স্বদেশে ফিরে যাবার পূর্বে আর একটা কাজ তাকে করে যেতে হবে। জ্যোছনা রায়কে বুঝিয়ে দিতে হবে, সে স্বাভাবিক মানুষ নয়। বনহুরকে পাবে না কোনোদিন, কারণ সে দস্যু-মানুষ নামের কলঙ্ক।
০৬.
কয়েক দিন কেটে গেলো।
আজ কুন্তিবাঈ ছবির শেষ সুটিং চলছে।
নাহার চৌধুরী অত্যন্ত ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটাছুটি করছেন।..
ক্যামেরাম্যান অনন্ত বাবুর অবস্থাও তাই। আজ তিনি যেন বেশি করে। ঝুঁকে পড়েছেন কাজে। ইউনিটের প্রায় সবাই আজ এসেছেন স্টুডিওতে।
বনহুর আর জ্যোছনা রায়ের মধ্যে শেষ শট নেওয়া হবে। বনহুর আর জ্যোছনা রায় মেকআপ নিচ্ছে।
আজ ওদের দুজনকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। বিশেষ করে মিস জ্যোছনা রায়কে আজ মেকআপে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
সুটিং শুরু হলো।
সেটে বনহুর আর. জ্যোছনা রায়।
জ্যোছনা রায়ের মন থেকে সব অভিমান মুছে গিয়েছিলো।
একটা কৃতজ্ঞতার ছাপ গোটা অন্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলো তার।
বনহুরও আজ জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে অপূর্ব অভিনয় করলো। ছবির শেষ দৃশ্য নাহার চৌধুরীর মনে এনে দিলো অফুরন্ত আনন্দ ও পরিতৃপ্ত।
পরিচালক নাহার চৌধুরী বনহুর আর জ্যোছনা রায়কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালেন।
বনহুর অবাক হলো-আজ শেষ সুটিংয়ের দিন অথচ মিঃ আরফান উল্লাহ স্টুডিওতে নেই। মিস আতিয়া ছিলো, কিন্তু কিছুক্ষণ বসার পর সরে পড়েছে সে। বোধ হয় মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে জ্যোছনা রায়ের অভিনয় সহ্য করতে পারেনি।
সুটিং আজ থেকে শেষ, স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো জ্যোছনা রায়। স্টুডিওর বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করে একটা সোফায় গা এলিয়ে দিলো। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ মনটা তার বেশ স্বচ্ছ মনে হচ্ছে। মিঃ চৌধুরী সম্বন্ধে তার অন্তরে যে একটা দ্বন্দ্ব ছিলো সেটা মুছে গেছে তার মন থেকে।
মিঃ চৌধুরী লোককে দেখান তিনি আতিয়াকে ভালবাসেন কিন্তু সে কথা তাঁর মনের কথা নয়। আতিয়াকে মিঃ চৌধুরী কখনও ভালবাসতে পারেন না। ধন, সম্পদ, অর্থই সবচেয়ে বড় কথা নয়। অন্তর বলে একটা জিনিস আছে, যা কোনদিন ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে পুর্ণ হয় না। তাছাড়া মিঃ চৌধুরীকে সে। এতদিন বেশ ভালো করেই জেনেছে, অর্থের লালসা তার নেই। নিজেই তিনি একটা ঐশ্বর্যের সম্ভার।
মিস জ্যোছনা রায়ের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্তিময় হয়ে ওঠে। বিশ্রামকক্ষে আসার পূর্বে মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে তার কয়েক মিনিট কথা হয়েছে। নির্জন রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো মিঃ চৌধুরী ও জ্যোছনা রায়।
আজ থেকে কাজ শেষ মিস রায়। বলেছিলো বনহুর।
হাঁ, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। জবাব দিয়েছিলো জ্যোছনা রায়। কিছু সময় নিশ্চুপ থেকে বলেছিলো বনহুর-যা বলার আজ বলবো মিস রায়। কারণ আবার কখন কোথায় দেখা হবে কে জানে!
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেছিলো জ্যোছনা রায়-কেন?
বলে চলে বনহুর-আতিয়াকে আমি ভালবেসেছিলাম শুধু আপনাকে রক্ষা। করার জন্য। কারণ আমি সবাইকে দেখাতে চেয়েছি-আমি আতিয়ার প্রেমে আত্মহারা, জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে আমার অভিনয়ের সম্বন্ধ ছাড়া কোনো সম্পর্ক নেই। মিস রায়, আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না, মিস আতিয়ার। সঙ্গে আমার যে ঘনিষ্ঠতা দেখেছেন তা শুধু অভিনয় ছাড়া কিছু নয়…. .
মিঃ চৌধুরী।
হাঁ, আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন। মিস আতিয়াকে আমি কোনো দিন ভালবাসিনি-ভালবাসতে পারিনি।
অনাবিল একটা আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিলো জ্যোছনা রায়ের হৃদয় আকাশে। গভীর আবেগে হারিয়ে ফেললো সে নিজের সত্তা, বনহুরের বুকে মাথা রেখে বললো-মিঃ চৌধুরী, আমাদের অভিনয় তো সত্য?
বনহুরের দৃষ্টি সেই মুহূর্তে চলে গেলো স্টুডিওর ওদিকে একটা শার্শীর ফাঁকে….একজোড়া চোখ দ্রুত সরে গেলো শার্শীর ফাঁক থেকে।
বনহুর চট করে জ্যোছনা রায়কে সরিয়ে দিতে পারলো না, মোহগ্রস্তের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো…..
জ্যোছনা রায় বিশ্রামকক্ষে বসে তখনকার কথাগুলোই স্মরণ করলো। আজ তার মনের সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে গেছে, স্বচ্ছ নির্মল হয়েছে তার হৃদয়। মিঃ চৌধুরী মিস আতিয়াকে ভালবাসেননি, বাসতে পারেন নি….
বনহুর স্টুডিওর অন্যান্য কাজ শেষ করে গাড়ির দিকে এগুতেই মনে পড়লো জ্যোছনা রায়ের কথা। কথা দিয়েছিলো, তাকে নিয়ে তবে বাসায় ফিরবে।
বনহুর মিঃ আরফান উল্লাহ, পরিচালক নাহার চৌধুরী ক্যামেরাম্যান অনন্ত বাবু এবং অন্যান্য সকলের কাছে বিদায় নিয়ে পা বাড়ালো জ্যোছনা রায়ের বিশ্রামকক্ষের দিকে।
