মুখে আলো পড়তেই মিঃ চৌধুরী মানে দস্যু বনহুর উঠে দাঁড়ালো, রাগে অধর দংশন করছে সে।
দুজন লোক এগিয়ে গিয়ে অরুণ কুমারকে উঠিয়ে শরীরের ধুলো ঝেড়ে দিতে লাগলো। নাক দিয়ে তখন রক্ত গড়িয়ে পড়ছিলো তার। ক্রুদ্ধ হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলো অরুণ কুমার বনহুর আর জ্যোছনা রায়ের মুখের দিকে।
জ্যোছনা রায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মূর্তির মত।
বনহুরের মুখোভাবে কোনো পরিবর্তন নেই। সে গুটানো জামার আস্তিন খুলে নিচ্ছিলো।
এমন সময় অন্ধকার থেকে এগিয়ে এলেন আরফান উল্লাহ। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন-এসব কি কাণ্ড? তারপর জ্যোছনা রায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন-আপনি এখনও স্টুডিওতে ছিলেন মিস রায়? আমরা মনে করেছি চলে গেছেন।
অরুণ কুমার গায়ের ধুলো ঝাড়ছিলো। তার চোখেমুখে হিংস্র ক্রুদ্ধভাব ফুটে উঠেছে।
তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বনহুর ও জ্যোছনা রায়কে দেখে নিচ্ছিলো সে, দুচোখে যেন অগ্নিবাণ বর্ষিত হচ্ছে অরুণ কুমারের। অন্যান্য কারও মুখে কোনো কথা নেই। আরফান উল্লাহর আগমনে উপস্থিত সকলেই নিশ্চুপ হয়ে পড়েছিলো। কারণ, তার সামনে কে কোন কথা বলে অপরাধী হবে!
আরফান উল্লাহ গর্জন করে উঠলেন-মিঃ কুমার, আপনাকে বারণ করা।
সত্ত্বেও আপনি স্টুডিওতে কেন এসেছেন? .
জবাব দিতে আমি রাজী নই। কথা শেষ করে দ্রুত বেরিয়ে গেলো অরুণ কুমার।
জ্যোছনা রায় তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর জ্যোছনা রায়ের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। দৃষ্টি বিনিময় হতেই চোখ নামিয়ে নিলো জ্যোছনা রায়।
আরফান উল্লাহ বললেন-চলুন মিস রায়, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
জ্যোছনা রায় বললো-আমাকে পৌঁছে দিতে হবে না মিঃ উল্লাহ। আমি একাই বাসায় ফিরে যেতে পারবো। জ্যোহনা রায় আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে।
আরফান উল্লাহ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন-পথে না আবার কোনো বিপদ ঘটে! আসুন মিঃ চৌধুরী, ভাগ্যিস আপনি ছিলেন, নইলে পাজি অরুণ বাবু কি যে কাণ্ড করে বসতো!
পায়ে পায়ে এগিয়ে চললেন আরফান উল্লাহ ও বনহুর। স্টুডিওর দিকেই এগুচ্ছেন তারা।
এমন সময় নাহার চৌধুরী ব্যস্তসমস্তভাবে সামনে এসে দাঁড়ালেন-এই যে মিঃ চৌধুরী, কি একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটে গেলো!
বিশ্রী ঘটনা নয় মিঃ নাহার, অতি মনোরম…..কথাটা বললো বনহুর।
মিঃ আরফান বললেন-মিঃ নাহার চৌধুরী, আমাদের কাজ আর কতদিনে শেষ হতে পারে?
আমার মনে হয় এক সপ্তাহের মধ্যেই সুটিং শেষ হবে। বাকী কাজ শেষ হতে মাসখানেক লাগবে।
আরফান উল্লাহ বললেন, জ্যোছনা রায়ের শেষ শট কবে নাগাদ শেষ হচ্ছে?
মিস রায়ের আর একদিন সুটিং আছে মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে…তাহলেই ওর কাজ শেষ!
বনহুর আর বিলম্ব না করে আরফান উল্লাহ এবং নাহার চৌধুরীর কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
বনহুর জানে, জ্যোছনা রায় আরফান উল্লাহর গাড়িতে এসেছিলো। কাজেই ফিরবার পথে ভাড়াটে গাড়ি ছাড়া তার উপায় নেই। শহর ছেড়ে স্টুডিও বেশ দূরে, কাজেই সব সময় সেখানে গাড়ি পাওয়া মুশকিল। স্টুডিও ছেড়ে বেশ খানিকটা পথ চলার পর তবেই গাড়ি মিলবে। বনহুর বুঝতে পারে, জ্যোছনা রায় এখনও গাড়ির স্ট্যান্ডে পৌঁছতে পারেনি।
বনহুর নিজে রাগ করে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এলো। স্পীডে চালিয়ে যেতে যেতে পথের দুপাশে লক্ষ্য করে দেখতে লাগলো। দুশ্চিন্তায় মনটা ভরে উঠলো বনহুরের। জ্যোছনা রায়ের এভাবে একা যাওয়া কি উচিত হয়েছে? জানে না সে–তার বিপদ এগিয়ে আসছে।
অরুণ বাবু তাকে পুনরায় আক্রমণ করেছে কিনা কে জানে!
বনহুর এসব চিন্তা করছিলো, আর পথের দুপাশে সতর্ক দৃষ্টি রেখে গাড়ি চালাচ্ছিলো।
অনেকটা পথ চলে গেলো বনহুর, কোথাও জ্যোছনা রায়ের সন্ধান পাওয়া গেলো না। আর কিছু দূরেই গাড়ির স্ট্যান্ড। এমন সময় হঠাৎ বনহুর দেখলো অদূরে একটা তরুণী এগিয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই জ্যোছনা রায় ছাড়া অন্য কেউ নয়। বনহুর গাড়ি নিয়ে তার পাশে গিয়ে ব্রেক কষে থামিয়ে ফেললো।
থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকালে জ্যোছনা রায়।
বনহুর ঝুঁকে বললো-আসুন মিস রায়।
দরকার হবে না, স্ট্যাণ্ডে এসে গেছি।
মিস রায়, আপনার এ সময় ভাড়াটে গাড়িতে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। আসুন।
জ্যোছনা রায় কেন যেন আজ অভিমান করতে পারলো না, বনহুরের পাশে উঠে বসলো।
গাড়ি পুনরায় ছুটতে শুরু করলো।
বেশ কিছুক্ষণ উভয়েই নিশ্চুপ রইলো!
প্রথম কথা বললো বনহুর-মিস রায়, রাগ করেছেন?
না।
মিথ্যা বললেন আপনি!
কোনো জবাব দিলো না জ্যোছনা রায়। মুখ ফিরিয়ে বসে রইলো চুপ করে।
বললো আবার বনহুর-আপনি বড় অবুঝ মিস রায়। আপনি অভিনয় করেন, কিন্তু অভিনয় বোঝেন না।
জ্যোছনা রায় তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। লাইট পোস্টের আলোতে উভয়েরই চোখাচোখি হলো। বনহুর। বললো-মিস রায়, একমাত্র আমার জন্য আজ আপনি বিপদগ্রস্ত। বলুন, তাই নয় কি?
জ্যোছনা রায় এবারও কোনো জবাব দিলো না।
বনহুর বলে চললো-সত্যি করে বলছি, আমি আতিয়ার সঙ্গে শুধু অভিনয় করে চলেছি। কিন্তু কেন জানেন? শুধু আপনার জন্য।
আমার জন্য!
হাঁ, শুধু আপনার জন্য। মিস রায়, সব কথা ঐ দিন বলবো যেদিন আমাদের ছবির কাজ শেষ হবে।
জ্যোছনা রায় নিশ্চুপ শুনে যাচ্ছিলো। একটু পূর্বেই মিঃ চৌধুরীর অন্তরের পরিচয় সে পেয়েছে। মিঃ চৌধুরীই তাকে রক্ষা করেছেন, নইলে কি যে হতো! কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো জ্যোছনা রায়ের মন!
