মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই জ্যোছনা রায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিলো অন্যদিকে।
আতিয়ার চিকন হাসির সুর এখনও কানে লেগে আছে জ্যোছনা রায়ের। রেলিংয়ে ভর দিয়ে তাকিয়েছিলো সে সামনের ধূসর আকাশের দিকে। মনের আকাশেও তার কালো মেঘ জমাট বেঁধে উঠেছে। কত প্রশ্নই না আজ উঁকি দিয়ে যাচ্ছে তার হৃদয়ের কোণে। বিশ্বাস হয় না জ্যোছনা রায়ের, মিঃ চৌধুরী তাকে এতদিন ছলনা করে এসেছেন। মিথ্যা অভিনয় তিনি করেছেন, তার সঙ্গে…না না, বিশ্বাস হয় না তার এ কথা –এতদিনের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার সাথে। আজ সব তার মানসপটে স্পষ্ট ভেসে উঠছে।
কখন যে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে খেয়াল নেই জ্যোছনা রায়ের।
সে স্টুডিওর বিপরীত দিকে নির্জন রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। অন্য সবাই চলে গেছে, মিঃ আরফান উল্লাহ এবং নাহার চৌধুরী জ্যোছনা রায়ের খোঁজ করেছিলেন কিন্তু তাঁরাও জ্যোছনা রায় চলে গেছে মনে করে স্টুডিও ত্যাগ করেছিলেন।
কিন্তু বনহুর লক্ষ্য করেছিলো, জ্যোছনা রায় আজ স্টুডিও থেকে যায়নি। সে বাগানে আতিয়ার পাশে বসে থাকলেও দৃষ্টি ছিলো স্টুডিওর পথে। কে যায় বা আসে সেদিকে খেয়াল ছিলো তার।
জ্যোছনা রায় স্টুডিও থেকে বেরিয়ে যায়নি সে তা দেখেছে। মিঃ আরফান উল্লাহ যখন জ্যোছনা রায়ের খোঁজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-মিঃ চৌধুরী, মিস রায় কি চলে গেছে?
বনহুর জবাব দেবার পূর্বেই বেশ কড়া মেজাজে বলে উঠেছিলো আতিয়া-জ্যোছনা রায়ের খোজ উনি কি করে বলবেন? খুঁজে দেখোগে আব্বা। তোমাদের ছবির হিরোইন শেষে হারিয়ে না যায়!
বনহুরের মনে কথাটা যেন বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিলো। একটা ঘূণার ভাব তার অন্তরে খোঁচা দিতে শুরু করেছিলো, তবে কোনো কথাই আর বলেনি বন তখন।
আতিয়া যখন পুনরায় বলেছিলো-মিঃ চৌধুরী, অমন হয়ে পড়লেন কেন? বনহুর হেসে বলেছিলো-আতিয়া, ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার একটু দরকার আছে। ফিরতে বিলম্ব হবে। তুমি বরং আজ তোমার আব্বার সঙ্গে যাও। কিন্তু মনে রেখো, কাল সকালে তোমার জন্য চায়ের টেবিলে অপেক্ষা করবো।
বনহুরের মুখের কথাগুলো তার কানে মধু বর্ষণ করলো। অন্যদিন হলে আপত্তি করে বসতো-তা হবে না, চলুন আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তবে বাড়ি ফিরবো। কিন্তু আজ আতিয়া সে ব্যাপারে কোনো কথা বললো না।
একটু হেসে বললো-নিশ্চয়ই আসবো মিঃ চৌধুরী। তারপর পিতাকে লক্ষ্য করে বললো আতিয়া-আব্বা, ওনার আজ একটু কাজ আছে। চলো, আমরা যাই।
আরফান উল্লাহ কি যেন ভেবে বললেন-আমারও কিছু কাজ আছে। বাসায় ফিরতে দেরি হবে, তুমি বরং একাই যাও মা।
আতিয়া হাসিমুখে বললো-বেশ, আজ তোমরা না গেলে, আমিই চললাম।
ভ্যানিটি দুলিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়ালো আতিয়া।
আরফান উল্লাহ বনহুরের কাছ থেকে বিদায় নিলেন-স্টুডিওর অফিসে আমার কাজ আছে। চলি, গুড বাই!
বনহুর অস্ফুটকণ্ঠে বললো-গুড বাই।
সন্ধ্যার ঝাপসা অন্ধকারে চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে জ্যোছনা রায়। বনহুরের সাথে বিগত দিনের স্মৃতি মন্থন করে চলেছে সে।
০৫.
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার কখন যে জমাট বেঁধে উঠেছে খেয়াল নেই জ্যোছনা রায়ের।
হঠাৎ চমকে উঠলো জ্যোছনা রায়, কে যেন পাশে এসে দাঁড়ালো বলে মনে হলো তার। বললো জ্যোছনা রায়-কে?
অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর-আমি।
আপনি এখানে কেন?
জ্যোছনা, এখনও তমার দিব্যচক্ষু খুললো না?
অরুণ বাবু, আমি আপনার কোন কথা শুনতে রাজি নই।
কবেই বা তুমি আমার কথা শুনেছো বা শুনতে রাজী হয়েছে?
জ্যোছনা রায় কুদ্ধকণ্ঠে বললো-আমাকে কোনো কথা বলে লাভ হবে না অরুণ বাবু।
চাপাস্বরে হেসে উঠলো অরুণ কুমার, তারপর হাসি থামিয়ে বললো-জ্যোছনা, ভুল করে আলেয়ার আলোর পেছনে ধাওয়া করো না। মিঃ চৌধুরী তোমাকে চায় না, আর তুমি তার জন্য পাগল। হাঃ হাঃ হাঃ, অদ্ভুত মেয়ে তুমি!
জ্যোছনা রায় অন্ধকারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো অরুণ কুমারের দিকে, তারপর দ্রুত চলে যাচ্ছিলো, অরুণ কুমার খপ্ করে ধরে ফেললো জ্যোছনা রায়ের হাত-জ্যোছনা, আজ তোমাকে ছাড়ছি না।
ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন বলছি।
কিছুতেই ছাড়বো না।
আমি চীৎকার করবো।
স্টুডিও বন্ধ হয়ে গেছে, কেউ নেই এদিকে।
ছেড়ে দিন, নইলে ভাল হবে না বলছি।
ভাল আর কবে হলো, জানি হবেও না কোনোদিন। জ্যোছনা রায়কে জোর করে টেনে নিয়ে চললো অরুণ কুমার স্টুডিওর গেটের দিকে।
জ্যোছনা রায় চীৎকার করে উঠলো-বাঁচাও, বাঁচাও…..। ঠিক সেই মুহূর্তে কে একজন অন্ধকারে দ্রুত এসে চেপে ধরলো অরুণ কুমারের গলা। সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড একটা ঘুষি এসে পড়লো তার নাকের ওপর।
অরুণ কুমার টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলো মাটিতে।
জ্যোছনা রায় দাঁড়িয়ে রইলো থ মেরে।
আক্রমণকারী পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়লো অরুণ কুমারের ওপর। চললো ভীষণ ধস্তাধস্তি।
ইতিমধ্যে জ্যোছনা রায়ের আর্তচীৎকারে টুডিওতে যে দুতিনজন তখনও কর্মরত ছিলো, তারা ছুটে এলো ব্যস্তভাবে।
যে স্থানে এই ঘটনা ঘটেছিলো সেই স্থানটি ছিলো সম্পূর্ণ অন্ধকার। কয়েকজন টর্চলাইট নিয়ে ছুটে এলো সেখানে। আলো জ্বলতেই চক্ষুস্থির সকলের। দেখলো সবাই, অরুণ কুমারের বুকে বসে তার টুটি টিপে ধরেছে মিঃ চৌধুরী।
