রহমান নূরকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
মনিরা নূরকে টেনে নিলো নিজের কাছে। আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো সে, ঠিক সেই মুহূর্তে বেরিয়ে এলো আড়াল থেকে কায়েস–বৌরাণী, বৌরাণী–ও শয়তান নয়, রহমান–
মনিরা চমকে উঠলো, কোথায় যেন এই স্বর সে শুনেছে? কোথায় যেন দেখেছে ওকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো মনিরা কায়েসের দিকে।
কায়েস বললো-বৌরাণী, আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি-আমিই সে কায়েস–
মনিরা অস্ফুটধ্বনি করে উঠলো-কায়েস।
হাঁ, আমি কায়েস আর আপনার সামনে যে দণ্ডায়মান সে সর্দারের প্রধান অনুচর রহমান। কিন্তু বৌরাণী, এই শিশু কে? বলুন-বৌরাণী, এই কি আপনার সেই নূর?
কায়েস, সত্যিই ধরেছে, এটাই আমার সেই হারানো ধন নূর। মনিরা রহমানের দিকে তাকালো-আমাকে মাফ করো রহমান, আমি তোমাকে চিনতে না পেরে–
রহমান বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো-বৌরাণী!
নূর এবার বুঝতে পারলো-তার আম্মা লোকটার ওপর প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে বেশ স্বচ্ছ হয়ে এসেছে। নূর একবার আম্মা আর একবার রহমানের মুখে তাকাচ্ছে।
রহমান নূরকে টেনে নিলো আবার কোলের কাছে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো-বৌরাণী, আমরা সর্দারকে হারিয়ে একেবারে মূহ্যমান হয়ে পড়েছি। জানিনা তিনি জীবিত না মৃত—
মনিরা নিশ্চল পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
কায়েস আর রহমানের চোখও অশ্রু হল হল করছে।
মনিরা বললো এবার-জানি, তোমরাও আমারই মত ব্যথিত দুঃখিত তোমাদের সর্দারের জন্য। কিন্তু মনে রেখো রহমান, তোমাদের সর্দার মৃত নয় জীবিত আছে-আমার মন বলছে সে জীবিত আছে।
রহমান আর কায়েসের মুখমণ্ডল প্রসন্ন হয়ে উঠলো, বললো। রহমান-বৌরাণী, আপনার কথা যেন সত্য হয়।
আচ্ছা, আমরা তাহলে চলি বৌরাণী? বললো কায়েস।
মনিরা আঁচলে চোখের পানি মুছে বললো-বসবে না?
রহমান বললো আমরা আবার আসবো–নূরকে আদর করে বললো-সর্দারের অভাব আমরা ওকে দিয়েই পূরণ করবো বৌরাণী। আচ্ছা, আজ যাই আমরা?
এসো। বললো মনিরা।
রহমান আর কায়েস অদৃশ্য হলো বাগানের ওপাশে।
মনিরা নূরকে কোলে করে দাঁড়িয়ে রইলো ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে।
০৪.
সেদিনের পরে জ্যোছনা রায় বনহুরের গাড়িতে একটা দিনও বাড়ি ফেরেনি বা ইচ্ছা করে কোনো সময় তার সঙ্গে কথা বলেনি। বনহুর বুঝতে পেরেছে-জ্যোছনা রায় সেদিন তার ঐ কথার পর ভীষণ মুষড়ে পড়েছে। তার অন্তরে যে একটা ব্যথার জ্বালা তাকে অহরহ দগ্ধীভূত করছে, জ্যোছনা। রায়ের মুখোভাবে তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
বনহুর যতদূর সম্ভব জ্যোছনা রায়কে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতো। সুটিং ছাড়া জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে সে তেমন কোনো কথা বলতো না। বরং আতিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিলো।
এখন আতিয়া সুটিংয়ের পর নিজে বনহুরকে নিয়ে যায় প্রতিদিন। পৌঁছে দেয় তার বাসায়।
জ্যোছনা রায় চেয়ে দেখে, কোনো কিছু বলে না।
সুটিংয়ের অবসরেও আতিয়া জ্যোছনা রায়কে দেখিয়ে দেখিয়ে বনহুরের হাত ধরে স্টুডিওর বাগানে গিয়ে বসে, হাসে, গল্প করে, কখনও বা বাগান থেকে গোলাপ ছিঁড়ে গুঁজে দেয় তার কোটের কলারের ফাঁকে।
জ্যোছনা রায় স্টুডিওর রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখে। একটা ক্ষুব্ধ ভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তার মনে। সরে যায় তখন সে রেলিংয়ের পাশ থেকে।
হয়তো গিয়ে দাঁড়ায় ওদিকের নির্জন রেলিংটার ধারে। আজ কাল জ্যোছনা রায়ের কাছে নির্জনতাই যেন বেশি প্রিয়। ছবিতে কাজ না করলে নয় তাই সে আসে স্টুডিওতে। যতক্ষণ ছবির প্রয়োজন ততক্ষণই স্টুডিওতে থাকে। সুটিং শেষ হলেই আস্তে স্টুডিওর সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নীচে। গাড়িতে বসে ড্রাইভারকে বলে–চলো।
প্রযোজক কিংবা পরিচালক কারও গাড়িতেই সে যায় না, তাদের নিতান্ত অনুরোধেও জ্যোছনা রায় রাজী হয়নি তাদের গাড়িতে যেতে।
ইতিমধ্যে জ্যোছনা রায় স্টুডিওর বিশ্রামকক্ষে বসে আর এক দিন অরুণ কুমারের একখানা চিঠি পেয়েছিলো। চিঠিটা এইরূপঃ
জ্যোছনা,
তোমার অভাবে আজ আমি অন্ধকার দেখছি। এতটুকু দয়া-মায়া তুমি করলে না। কিন্তু মনে রেখো-হয় তুমি আমার হবে, নয় যমের ঘরে যাবে। হত্যা তোমাকে আমি করবোই। কেউ তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না।
অরুণ
এ চিঠি পাবার পরও জ্যোছনা রায় এতটুকু ঘাবড়ে যায়নি বা বিচলিত হয়নি।
পরিচালক নাহার চৌধুরী চিঠিখানা পুলিশে ডায়রী করে দিয়েছেন, তাঁদের ছবির নায়িকার জীবন হানি যাতে না হয় তার জন্য নাহার চৌধুরী এবং আরফান উল্লাহ পুলিশের সাহায্য কামনা করে অনুরোধ জানিয়েছেন।
হঠাৎ যদি কোনো একটা অঘটন ঘটে বসে তাহলে সম্পূর্ণ ছবি নষ্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। কাজেই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আরফান উল্লাহ এবং এ কারণেই তিনি নিজে জ্যোছনা রায়কে সাবধানে চলাফেরার জন্য বারবার বলে দিয়েছেন।
কিন্তু জ্যোছনা রায় কারও কথা কানে নেয় না, নিজের প্রতি আজকাল সে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েছে।
আজ সুটিং শেষে জ্যোছনা রায় যখন রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো, তখন তার দেহ মন শিথিল হয়ে এসেছে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নির্জন রেলিংটার ধারে এসে দাঁড়ালো সে।
একটু পূর্বে জ্যোছনা রায়ের সামনে দিয়ে আতিয়া মিঃ চৌধুরীকে ধরে নিয়ে গেলো বাগানের দিকে। কি যেন কথা নিয়ে হাসছিলো আতিয়া।
