মনিরা বললো-সরকার চাচা, আমার মনে হয় সে যেই হোক, কোনো খারাপ মতলব নিয়ে আসেনি। কারণ, সে প্রচুর সময় পেয়েছিলো, নূরকে নিয়ে পালাতে পারতো। অবশ্য পালাবার পূর্বেই আমি তাকে যমালয়ে পাঠাতাম।
মনিরা নূরকে বুকে তুলে নিয়ে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো ওর গাল দুটো।
নূর কচি দুটি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো মার গলা।
সরকার সাহেব হাসতে লাগলেন।
এমন সময় মরিয়ম বেগম এলেন কক্ষে। যদিও তিনি পুত্রশোকে মুহ্যমান। তবু মনিরা ও নূরকে পেয়ে তার বুকে একটা অনাবিল আনন্দ ও শান্তিধারা বয়ে যায়। মরিয়ম বেগম খুশিভরা কণ্ঠে বললেন-মা-ছেলে খুব যে আনন্দ করা হচ্ছে!
এখানে নূরকে নিয়ে সরকার সাহেব, মরিয়ম বেগম এবং মনিরা যখন আনন্দে আত্মহারা, তখন কান্দাই বনের পথে দুজন অশ্বারোহী পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।
অশ্বারোহীদ্বয় একজন রহমান, দ্বিতীয়জন কায়েস।
কিছুক্ষণ পূর্বে চৌধুরীবাড়ির বাগানে গালপাট্টা বাঁধা যে ব্যক্তি নূরকে আদর করছিলো সে ব্যক্তি অন্য কেউ নয়-বনহুরের প্রধান অনুচর রহমান।
মাঝে মাঝে রহমান গোপনে মনিরার সন্ধান নিতে আসতো।
আজও কায়েসকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলো সে মনিরার সন্ধান নিতে।
একটা চাকরের নিকট মনিরার সুসংবাদ গ্রহণ করে যখন ফিরছিল রহমান তখন হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে গিয়েছিলো বাগানে খেলায়রত নূরের ওপর। কেমন যেন চমকে উঠেছিলো রহমান-এ যে তার সর্দারের হুবহু প্রতিচ্ছবি-সেই চোখ, সেই মুখ; সেই নাক–অবিকল দেখতে তারই মত। বিস্ময় জেগেছিলো রহমানের মনে, নিশ্চয়ই এটা তাদের সর্দারের সন্তান।
কায়েসকে ডেকে দেখিয়ে বলেছিলো রহমান-কায়েস, দেখতে পাচ্ছো?
কি?
ঐ দেখো বাগানের দিকে তাকিয়ে।
কায়েস তাকিয়ে থ বনে গেলো হঠাৎ আনন্দধ্বনি করতে যাচ্ছিলো কায়েস, রহমান ওর মুখে হাতচাপা দিয়ে বললো-চুপ।
কায়েস সামলে নিলো নিজেকে। তাই তো, এ যে একেবারে রাজপুত্র। আনন্দ বিগলিত কণ্ঠে বললো কায়েস-এ যে আমাদের সর্দারের ছেলের মত মনে হচ্ছে।
রহমান বললো-মনে হচ্ছে নয়, নিশ্চয়ই তার সন্তান।
কিন্তু তা কেমন করে হয়। একটু ভেবে বললো কায়েস।
রহমান গম্ভীর গলায় বললো-আমি বললাম এই শিশু আমাদের সর্দারের সন্তান না হয়েই পারে না।
রহমান আর বিলম্ব না করে বাগানের বেড়া টপকে প্রবেশ করে ছিলো ভেতরে। তারপর, শিশুটাকে আদর করবার সুযোগ করে নিয়েছিলো। সাবধানে।
রহমান বললো এবার কায়েসকে–কায়েস, আমি শপথ করে বলছি, এটাই সেই ছেলে-যাকে নূরী একদিন সন্তানের মত মানুষ করেছিলো–
কেমন করে বুঝলে রহমান?
যদিও বেশ বড় হয়েছে, কিন্তু চিনতে আমার ভুল হয়নি। কিন্তু আর একটা কথা, আমি খোকাকে নাম জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
কায়েস আগ্রহভরা কণ্ঠে বললো-তারপর?
খোকা বললো, আমার নাম নূর। কিন্তু নূরীর শিশুটার নাম ছিল মনি।
কায়েস চমকে উঠলো—কি বললে রহমান, খোকা তার নাম বললো নূর?
হাঁ, ঐ নাম সে বলেছে।
কায়েসের মুখে হাসি ফুটে উঠলো-বললো নূর–সে নূর–ঠিক ধরেছো। রহমান, এটাই আমাদের সর্দারের সন্তান নূর-বৌরাণীর ছেলে।
মনিরা ও নূরের কাহিনী সব বললো কায়েস রহমানের কাছে। তারপর থেকেই রহমান প্রায়ই যেতে শুরু করলো শহরে। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে আসতো নূরকে। কোনোদিন ফলমূল, কোনোদিন সোনার আংটি, কোনোদিন সোনার মালা পরিয়ে দিয়ে আসতো তার গলায়।
মনিরার বিস্ময় চরমে উঠলো, কে এই লোক-যে তার সন্তানকে এভাবে এসব দিতে শুরু করেছে। মনে মনে ভাবলো মনিরা নিশ্চয়ই কোনো অভিসন্ধি নিয়ে এসব দিচ্ছে লোকটা।
একদিন মনিরা সরকার সাহেব বা নকীবের সঙ্গে নূরকে বাইরে না পাঠিয়ে সে নিজে এলো বাগানে নূরের সঙ্গে। নূরকে খেলতে দিয়ে চুপ করে সরে গেলো মনিরা আড়ালে।
নূর বল নিয়ে খেলা করছে আপন মনে। কিন্তু লোকটা এলো না।
একদিন দুদিন তিনদিন কেটে গেলো–লোকটার সাক্ষাৎ নেই। মনিরা অনেক সুযোগ দিয়েছে, নূরকে একা রেখে সরে থেকেছে আড়ালে।
সেদিনও মনিরা এলো নূরকে নিয়ে বাগানে। প্রতিদিনের মত আজও মনিরা নূরকে খেলায় মাতিয়ে দিয়ে সরে পড়লো। একটা পাইন ঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে দেখতে লাগলো।
প্রায় ঘন্টাখানেক কেটে গেলো, মনিরা ভাউলো–লোকটা আজও আসবেনা। পাইন ঝাড়ের আড়াল থেকে যেমনি বের হতে যাবে, অমনি একটা খস খস শব্দ কানে এলো মনিরার। সচকিতভাবে সরে দাঁড়ালো মনিরা, পাইন ঝাড়ের আড়ালে তাকিয়ে দেখলো-হাঁ, সেই লোকটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে লোকটা।
অদূরে নূর বল নিয়ে ছুটাছুটি করছে।
মনিরা রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রতীক্ষা করতে লাগলো, আজ সে হাতে নাতে ধরে ফেলবে। কে ঐ লোকটা যে দিনের পর দিন তার নূরকে এভাবে আকর্ষিত করছে?
লোকটা নূরের পাশে গিয়ে আস্তে শিস দিলো।
নূর অমনি ফিরে তাকালো তার দিকে, সঙ্গে সঙ্গে বল ছেড়ে ছুটে এলো লোকটার পাশে।
লোকটা দুহাত প্রসারিত করে ওকে তুলে নিলো কোলে।
মনিরা শুনতে পেলো নূরের কণ্ঠস্বর-সিপাহী, আজ আমার জন্য কি এনেছো?
মনিরা স্তব্ধ হয়ে শুনছে ওর কথাবার্তা।
ফিস ফিস করে বললো লোকটা-কি নেবে তুমি বলো?
নূরের কণ্ঠ–আমি–আর কিছু নেবো না।
কেন?
আম্মা বকবেন।
এই দেখো কি এনেছি তোমার জন্য–
সঙ্গে সঙ্গে মনিরা বেরিয়ে এলো পাইন ঝাড়ের আড়াল থেকে। নূর এবং লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে কঠিন কণ্ঠে বললো সে-কে তুমি? শয়তান কোথাকার–
