কেন গেলো মা? তুমি জানো না–মিঃ চৌধুরীর মনও পাল্টে গেছে। আমি বড় হতভাগি–দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো জ্যোছনা রায়।
জ্যোছনার মা হতবাক স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, কন্যার বুকের ব্যথা মায়ের অন্তরেও আঘাত করলো।
০৩.
বনহুরের অন্তর্ধানের পর আস্তানায় একটা বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে সত্য, কিন্তু তাই বলে এতগুলো অনুচর একেবারে চুপচাপ বসে থাকতে পারে না।
সর্দারের অনুপস্থিতিতে রহমান তার অনুচরগণকে পরিচালনা করছে বটে কিন্তু বনহুরের অভাব তারা সব সময় অনুভব করছে। বিশেষ করে অশ্ব তাজ একেবারে জীর্ণশিৰ্ণ হয়ে পড়েছে। বনহুর নিজে ওকে ছোলা, ঘাস খাওয়াতে, গা নেড়ে আদর করতো। তাজ সবচেয়ে বেশি প্রিয় দস্যু বনহুরের।
আজ কতদিন মনিবের স্পর্শ পায়নি তাজ, সে একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছে।
রহমানের মনের অবস্থাও তাই; কতকটা তাজের মতোই। কিন্তু, তাজ পশু আর রহমান মানুষ। মনকে শক্ত করে নিয়েছে রহমান, ভেঙ্গে পড়লে তার চলবে না। সর্দারের এত পরিশ্রমে গড়া আস্তানা নষ্ট হতে দেবে না সে।
রহমান শুধু আস্তানাই ঠিক রাখেনি, মাঝে মাঝে শহরে গিয়ে সর্দার গৃহিণীর সন্ধানও জেনে আসে।
একদিন মনিরা দোতলার রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ তার নজর চলে গেলো সামনের বাগানে। বাগানে খেলা করছিলো নূর। অদূরে একটা পাথরাসনে বসে নূরকে খেলা দিচ্ছিলেন বৃদ্ধা সরকার সাহেব।
একটা বল নিয়ে ছুটাছুটি করছিলো নূর। বৃদ্ধ সরকার সাহেব হাসছিলেন।
হঠাৎ মনিরা লক্ষ্য করলো-বাগানের মধ্যে হাস্নাহেনা ঝোপের আড়ালে গালপাট্টা বাঁধা একটা লোক উঁকিঝুকি মারছে। লোকটার বলিষ্ঠ চেহারা, দীর্ঘ দেহ।
সন্দেহ হলো মনিরার।
কে এই লোক, কি এর উদ্দেশ্য, কেনই বা অমনভাবে উকিঝুঁকি মারছে? উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই মহৎ নয় কিন্তু কি উদ্দেশ্য ওর? নূরকে চুরি করতে এসেছে নিশ্চয়ই–মনিরা দ্রত কক্ষে প্রবেশ করে বন্দুকটা বের করে গুলি ভরে নিলো। তারপর ফিরে এসে দাঁড়ালো পূর্বের সেই স্থানে যেখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নূর এবং সরকার সাহেবকে।
কিন্তু সরকার সাহেব কই, একটু পূর্বেই সরকার সাহেবকে যে স্থানে বসে থাকতে দেখেছিলো মনিরা সেখানে তিনি নেই।
অবশ্য সরকার সাহেব ঠিক সেই দণ্ডে কোনো একটা কাজে বাগানের গেটে গিয়েছেন, এক্ষুণি ফিরে আসবেন তিনি।
মনিরা চমকে উঠলো, নূর কোথায়, কিন্তু পরক্ষণেই বিষ্ময়ে স্তম্ভিত হলো, গালপাট্টা বাঁধা লোকটা নূরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে নূরকে আদর করছে।
রুদ্ধ নিঃশ্বাসে মনিরা বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
এক সেকেণ্ড–তাহলেই লোকটার বুকে গিয়ে বিদ্ধ হবে মনিরার বন্দুকের গুলী, কিন্তু ছুড়তে পারছে না-কারণ লোকটার কোলে তখন নূর।
মনিরার নিঃশ্বাস দ্রুত বইছে। লোকটা নিশ্চয়ই নুরকে চুরি করতে এসেছে। কিন্তু আজ মনিরা কিছুতেই শয়তানটাকে ক্ষমা করবে না।
লোকটা নূরকে তখনও আদর করছে। মাঝে মাঝে সচকিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকাচ্ছে এদিক ওদিক।
মনিরা অধর দংশন করছে। শয়তানটা তার নুরকে নিয়ে পালাবে এবার মনে হচ্ছে। কিন্তু কি আশ্চর্য! লোকটা নূরকে আদর করে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। এবার লোকটা চলে গেলো ঝোপটার আড়ালে। বারকয়েক লুকিয়ে ঝুকে দেখলো নূরকে, তারপর চলে গেলো সেখান থেকে বাগানের বেড়া টপকে ওপারে।
মনিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। বন্দুকসহ হাতখানা নামিয়ে নিলো নীচে।
সরকার সাহেব ততক্ষণে এসে পড়েছেন নুরের পাশে। মনিরা ফিরে এলো নিজের কক্ষে, ভাবতে লাগলো–কে এই লোকটা? কি উদ্দেশ্যে সে এখানে এসেছিলো? নূরকে অমন করে আদর করলোই বা কেন?
মনিরা ভাবছে, কিন্তু ভেবে ভেবে কোনো জবাব খুঁজে পেলো না।
এমন সময় নূর বল হাতে ছুটে এলো মনিরার পাশে। সরকার সাহেব পেছনে পেছনে এসে দাঁড়ালেন সেখানে।
মনিরা তখনও সেই চিন্তা করছিলো। নূর আর সরকার সাহেবকে দেখে বললো সে-আপনারা এসেছেন!
সরকার সাহেব বললেন-নূরের খেলা শেষ হয়েছে মা মণি!
নূর জড়িয়ে ধরলো মনিরাকে–আম্মা, জানো একটা লোক আমাকে আদর করলো–
মনিরা বললো এবার সরকার সাহেবকে লক্ষ্য করে-সরকার চাচা, আপনি নূরকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলেন?
কেন মা?
আপনি যখন বাগান থেকে সরে গিয়েছিলেন তখন একটা গাল-পাট্টা বাঁধা লোক নূরকে কোলে নিয়ে আদর করছিলো–
তারপর? তারপর মা?
তারপর আমি তো মনে করলাম নিশ্চয়ই কোনো দুষ্ট লোক নূরকে চুরি করতে এসেছে। কারণ, আমি রেলিংয়ের ধারে তখন দাঁড়িয়েছিলাম। লোকটার সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে আমি ছুটে এসে বন্দুকটা বের করে গিয়ে দাঁড়ালাম, যদি নূরকে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করে তাহলে শেষ করে দেব। কিন্তু আশ্চর্য, লোকটা নূরকে আদর করে পুনরায় নামিয়ে দিলো কোল থেকে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলাম।
সরকার সাহেব অবাক হয়ে শুনলেন, অস্ফুট কন্ঠে বললেন–কই, আমি তো কিছু জানিনা মা?
আপনি তখন সরে গিয়েছিলেন ওপাশে।
ওঃ আমাকে একজন লোক ডেকে জিজ্ঞেস করছিলো-এটাই কি চৌধুরীবাড়ি? আমি তার প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলাম কিন্তু তা তো সামান্য কয়েক মিনিট?
হাঁ সরকার চাচা, ঐ সময়ের মধ্যেই গালপাট্টা বাঁধা লোকটা এসেছিলো সেখানে।
সত্যি আমি আশ্চর্য হচ্ছি। নিশ্চয়ই সে কোনো কুমতলব নিয়ে এসেছিলো। কথাগুলো বললেন সরকার সাহেব।
