বনহুর পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলো জ্যোছনা রায়ের বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠস্বর-মা, আমি তাকে ভালোবেসে কোনো ভুল করিনি। তার বাইরের সৌন্দর্যের চেয়েও ভেতরটা আরও সুন্দর যার তুলনা হয় না। এতটুকু কুৎসিত ইংগিত নেই তাঁর মধ্যে–মা, আমি জানি না কেন ওরা আমাকে মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে মিশতে দিতে চায় না? কেন তারা আমাকে সন্দেহ করে–আজ আমাকে তার সঙ্গে এক গাড়িতে আসতে দিলো না, ডেকে নিয়ে গেলেন পরিচালক, কথা আছে নাকি আমার সঙ্গে। জানো মা, গিয়ে কি দেখলাম?
বিছানায় সোজা হয়ে বসলো জ্যোছনা রায়।
জ্যোছনার মা ব্যাকুলকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন-কি মা, কি দেখলি?
মা, সে অতি বিস্ময়কর দৃশ্য। নাহার চৌধুরীর সঙ্গে বিশ্রাম কক্ষে প্রবেশ করে স্তম্ভিত হলাম। মিস আতিয়া বসে আছে, দুচোখে যেন তার আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে।
প্রযোজক আরফান উল্লাহর মেয়ে আতিয়া?
হাঁ মা।
কেন রে, কেন সে অমনভাবে সেখানে বসেছিলো?
সে কথাই তোমাকে বলছি মা, শোনো। মিস আতিয়া আমাকে দেখে অধর দংশন করতে লাগলো। আমাকে সে যে সহ্য করতে পারে না, এটা আমি জানতাম। কি করেছি, কেন আমাকে ডেকে আনা হলো সে কথাই আমি ভাবছিলাম। আমি মিস আতিয়ার মুখে তাকাতেই সে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো। বললেন নাহার চৌধুরী-মিস জ্যোছনা রায়,আপনাকে কেন ডেকেছি শুনুন–মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ছবির সুটিং মুহূর্তে-তারপর নয়। ছবির কাজের বাইরে আপনাদের মেলামেশা সন্তোষজনক নয়। আমরা চাই না আপনি তাঁর সঙ্গে বাড়ি ফেরেন বা মেশেন–মা, বলো কি এমন অপরাধ করেছি যে, তাঁর সঙ্গে মিশতে পারবো না।
জ্যোছনা, আমি আগেই বলেছিলাম ওসব ভালো নয়, আজ বুঝতে পারছিস তো?
মা, আমি আর অভিনয় করবো না।
পাগলী মেয়ে, তা কি হয়।
কেন হবে না–সত্যি আমি আর অভিনয় করবো না।
এমন সময় পর্দা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করে বনহুর।
জ্যোছনার মা বলে ওঠেন–বাবা তুমি এসেছো?
আজকাল জ্যোছনার সঙ্গে প্রায়ই বনহুরকে এ বাড়িতে আসতে হতো, জ্যোছনার তা তাই তাকে তুমি বলেই সম্বোধন করতেন।
বনহুর একটা আসনে বসে পড়ে বললো-মিস রায় কখন এসেছেন?
এই তো কিছুক্ষণ হলো।
আমি জানতে এলাম উনি পৌঁছেছেন কিনা! চলি তাহলে?
না না, একটু বসো বাবা। বললেন জ্যোছনার মা। একটু থেমে পুনরায় বললেন-জানো, জ্যোছনা আর ছবিতে কাজ করতে রাজী নয়।
হাসলো বনহুর-মুখে রাজী নয় বলা সহজ, আসলে অতো সহজ নয়, কারণ উনি চুক্তিবদ্ধ বিশেষ করে কুন্তিবাঈ ছবি ওঁকে শেষ করতেই হবে, তারপর ইচ্ছা করলে অভিনয় থেকে সরে আসতে পারেন।
তাই ভালো হবে। তাই ভালো হবে বাবা।
এবার বললো জ্যোছনা রায়-কিন্তু তাদের কথা অনুযায়ী কাজ করতে রাজী নই আমি।
শান্তকণ্ঠে বললো বনহুর-এই তো সামান্য আর কিছুদিন। কৃত্তিবাঈ ছবির সুটিং শেষ হতে আর মাসখানেক লাগতে পারে–
হাঁ, এরপর আমি আর কোনো ছবিতে কাজ করবো না।
বেশ, তাই হবে। জ্যোছনা রায়ের কথায় বললো বনহুর।
জ্যোছনার মা উঠে দাঁড়ালেন-বসো বাবা, তোমাদের জন্য একটু জলখাবার নিয়ে আসি।
না থাক। বললো বনহুর।
কিন্তু ততক্ষণ বেরিয়ে গেছেন জ্যোছনার মা।
জ্যোছনা রায় তাকিয়ে ছিলো বনহুরের দিকে। তার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই বললো সে-মিঃ চৌধুরী, জানেন আমাকে আজ পরিচালক কেন তখন ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন? ছবির কাজের বাইরে আপনার সঙ্গে–
মিস রায়, আমি সব শুনেছি; আপনি যখন মায়ের কাছে বলছিলেন তখন দরজার বাইরে আমি দাঁড়িয়েছিলাম।
মিঃ চৌধুরী।
হাঁ মিস রায়, আপানি নাভাস হবেন না।
কিন্তু–থামলো জ্যোছনা।
বলুন?
কিন্তু আমার নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি কারও কথা শুনতে রাজী নই। ছবির কাজের বাইরে আমার ইচ্ছামত যা খুশি তাই করবো বা করতে পারি।
আচ্ছা, আমি পরিচালক নাহার চৌধুরীকে বলবো আপনার কথাটা।
তাকে নয়, আরফান উল্লাহকে বলবেন দয়া করে। একটু থেমে বললো জ্যোছনা রায়–জানি না, আতিয়া কেন আমাকে বারবার এমনভাবে অপমান করছে।
কুন্তিবাঈ ছবির পর সব শেষ হয়ে যাবে মিস রায়। কারণ, আতিয়ার যত আক্রোশ আমার ওপর।
আপনার ওপর!
হাঁ, আমার ওপর, আর তারই জের চলছে আপনার ওপর বুঝলেন?
জ্যোছনা রায় সরে এলো বনহুরের পাশে–মিঃ চৌধুরী, আমার মনে হয় মিস আতিয়া আপনাকে–
ভালবাসে এই তো বলতে চাইছেন?
হাঁ মিঃ চৌধুরী, নাহলে সে কিছুতেই আপনার পাশে আমাকে সহ্য করতে পারছে না কেন?–আপনি ঠিকই বলেছেন মিস রায়।
তবে কি–তবে কি আপনি–আপনি–
সঙ্গে সঙ্গে জ্যোছনা রায় দুহাতে মাথাটা টিপে ধরলো। তারপর স্থিরদৃষ্টি মেলে তাকালো বনহুরের সুন্দর দীপ্ত মুখমণ্ডলে।
বনহুরও তাকিয়ে আছে।
জ্যোছনা রায়ের শরীর যেন টলছে-পড়ে যাবে এই মুহূর্তে।
বনহুর এগিয়ে এসে ওকে ধরে ফেললো।
জ্যোছনা রায় বনহুরের কাধে মাথা রাখলো, কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বের হলো না।
বনহুর পুনরায় বললো-মিস রায়? আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?
হাঁ, আমাকে শুইয়ে দিন।
বনহুর জ্যোছনা রায়কে শয্যায় শুইয়ে দিয়ে বললো-মিস রায়, আপনি ঘুমান, আমি চললাম।
জ্যোছনা কোনো জবাব দিলো না। বনহুর লঘু পদক্ষেপে কক্ষ ত্যাগ করলো।
পরমুহূর্ত কক্ষে প্রবেশ করলেন জ্যোছনার মা, হাতে তার জল খাবারের ট্রে। অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন-সে কই জ্যোছনা?
চলে গেছে।
চলে গেছে! বলিস কি, আমি জলখাবার আনতে গেলাম।
