কুন্তিবাঈ ছবি করাকালীন বহু ছবিতে অভিনয় করতে জ্যোছনা রায়ের ডাক এসেছে, কিন্তু জ্যোছনা রায় নিরুপায়-কুন্তিবাঈ ছবি শেষ না হলে কোনো ছবিতে সে কাজ করতে পারবে না।
বহু ছবির হিরো গোপনে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেছে। অনেকে প্রকাশ্যে বলেছে জ্যোছনা রায় ছাড়া তার নাকি মুড আসে না।
জ্যোছনা রায়ের প্রতীক্ষায় অনেক প্রযোজক দিন গুণছেন, কুস্তিবাঈ শেষ হলে ছবির কাজ শুরু করবেন না।
জ্যোছনা রায়কে পেয়ে কে না ধন্য হবে বলুন? এবারও বললেন নাহার চৌধুরী।
হাসলো বনহুর।
কিন্তু জ্যোছনা রায় মিঃ চৌধুরী ছাড়া কারও গাড়িতেই ফিরতে চায় না। এটা যেন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বনহুর কোনো আপত্তি করতে পারে না।
সেদিন স্টুডিও থেকে বেরিয়ে বনহুর আর জ্যোছনা রায় পাশাপাশি গাড়ির। দিকে এগুচ্ছিলো।
উভয়ে উভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন কথা নিয়ে হাসাহাসি করছিলো।
পেছন থেকে ডাকলেন নাহার চৌধুরী-মিস রায়! থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালো জ্যোছনা রায় এবং বনহুর।
নাহার চৌধুরী এগিয়ে এলেন-আংগুলের ফাঁকে ধুমায়িত অর্ধ দগ্ধ সিগারেট।
জ্যোছনা রায় এবং বনহুরকে লক্ষ্য করে বললেন নাহার চৌধুরী–আপনাদের কাজ তো হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, আমাদের কাজ হয়ে গেছে। বললো জ্যোছনা রায়।
নাহার চৌধুরী হস্তস্থিত অর্ধগ্ধ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সিগারেটের টুকরাটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেললেন। তারপর বললেন-মিস রায়, আপনার সঙ্গে কথা আছে।
জ্যোছনা তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
নাহার চৌধুরী হেসে বললেন-আজ না হয় আমার সঙ্গেই যাবেন।
বনহুর বললো–মিস রায়, তাই যাবেন। তাছাড়া আজ একটু আমাকে অন্য পথে ফিরতে হচ্ছে।
জ্যোছনা রায়, কোনো কথা বললো না।
বনহুর জ্যোছনা রায় ও নাহার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে বললো–গুডবাই।
জ্যোছনা রায় অস্ফুট কণ্ঠে বললো–গুডবাই।
নাহার চৌধুরী বললেন-আসুন মিস রায়।
জ্যোছনা রায় নাহার চৌধুরীকে অনুসরণ করলো।
স্টুডিওর বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করলেন নাহার চৌধুরী।
পেছনে জ্যোছনা রায়।
বিশ্রামকক্ষে প্রবেশ করে চমকে উঠলো জ্যোছনা রায়, কক্ষে একটা সোফায় বসে আছে আতিয়া, দুচোখে তার আগুন ঠিকরে পড়ছে যেন।
জ্যোছনা রায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। তাকালো সে নাহার চৌধুরীর মুখের দিকে।
কথা বললেন নাহার চৌধুরী প্রথমে-মিস রায়, আপনি জানেন কুন্তিবাঈ ছবির নায়িকার চরিত্রে কাজ করছেন আপনি, আর নায়কের চরিত্রে কাজ করছেন মিঃ চৌধুরী।
বলুন! রাগতকণ্ঠে বললো জ্যোছনা রায়।
নাহার চৌধুরী এবার ভূমিকা ত্যাগ করে বললেন-ছবির নায়ক এবং নায়িকা সম্পর্ক আপনার আর মিঃ চৌধুরীর মধ্যে। বলুন সত্য কি না?
হাঁ।
মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে ছবির কাজ ছাড়া আপনার মেলামেশা অত্যন্ত অসন্তোষজনক। আমরা চাই না আপনি তাঁর সঙ্গে বাড়ি ফেরেন বা মেশেন।
জ্যোছনা রায় ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলো-আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি কারও কথা শুনতে রাজী নই। জ্যোছনা রায় কথাটা শেষ করে দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
নাহার চৌধুরী তাকালেন আতিয়ার মুখের দিকে।
আতিয়া কুদ্ধ নাগিনীর মত ফোঁস ফোঁস করছে।
হেসে বললেন নাহার চৌধুরী-দেখুন মিস আতিয়া, ছবি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিস জ্যোছনা রায়কে কঠিনভাবে কিছু না বলাই ভাল। তা ছাড়া আজ তাকে কথাটা অমনভাবে বলা উচিত হয়নি, যদিও আমিই বলেছি–
কি উচিত কি অনুচিত আমি জানি মিঃ নাহার। কথাটা বলে বেরিয়ে গেলো আতিয়া।
নাহার চৌধুরী হাসলেন আপন মনে।
বাসায় ফিরে জ্যোছনা রায় নিজের ঘরে গিয়ে শয্যায় শুয়ে পড়লো। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে।
তার মা মেয়েকে কাঁদতে দেখে ব্যস্ত, উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। একমাত্র কন্যাই তাঁদের সম্বল, আশা-ভরসা সব। সংসারে এমন অভাব নেই যার জন্য জ্যোছনা রায়কে চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে হচ্ছে। অভিনয় জ্যোছনার পেশা নয়-নেশা।
যদিও পিতামাতার ইচ্ছা ছিলো না তবু কন্যার জিদেই বাধ্য হয়ে তারা কন্যাকে মত দিয়েছিলেন অভিনয়ে।
জ্যোছনা অল্পদিনেই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
কন্যার কৃতিত্বে জননীর মন ভরে উঠেছে। একটা উজ্জ্বল আশার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন তাকে মোহগ্রস্ত করে তুলেছে। তিনি সব সময় ওর মঙ্গল কামনা করেন।
কন্যাকে স্টুডিও থেকে বিষণ্ণ মুখে ফিরে বিছানায় লুটিয়ে পড়তে দেখে মায়ের প্রাণ আশঙ্কিত হলো, ব্যাকুলভাবে ছুটে এলেন তিনি কন্যার পাশে। পিঠে হাত রেখে ডাকলেন-জ্যোছনা, মা-কি হয়েছে তোর?
মায়ের স্নেহভরা কথায় জ্যোছনার মন আরও আকুলভাবে কেদে উঠলো। অনেকক্ষণ মায়ের কোলে মাথা রেখে কাঁদলো জ্যোছনা রায়।
মা নীরব রইলেন কিছুক্ষণ, ভাবলেন কেঁদে মেয়ে কিছুটা শান্ত হয়েনিক। এবার জিজ্ঞাসা করলেন-মা, কি হয়েছে তোর?
জ্যোছনা রায় মুখ তুলে তাকালো মায়ের দিকে-মা, তুমি জানো আমি মিঃ চৌধুরীকে ভালবাসি। তিনি সত্যিই একজন মহৎ ব্যক্তি—
মায়ের কোলে মাথা রেখে যখন জ্যোছনা রায় কথাগুলো বলছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুর দরজার বাইরে এসে থমকে দাঁড়ালো। তার কানে ভেসে এলো জ্যোছনা রায়ের কথাগুলো। বনহুর স্টুডিওতে লক্ষ্য করেছিলোজ্যোছনা রায়কে পরিচালক নাহার চৌধুরী ডেকে নিয়ে যাবার সময় তার মুখোভাব খুব প্রসন্ন ছিলো না, হঠাৎ জ্যোছনাকে এভাবে ডেকে নিয়ে যাবার কারণ কি থাকতে পারে–বনহুরকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিলো ব্যাপারটা। তাই সে জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে এসেছে দেখা করতে–কেন তাকে নাহার চৌধুরী ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তা জানতে। যদিও এটা স্বাভাবিক ব্যাপার তবুও বনহুরের মনে হঠাৎ আজ কেন যেন একটা আশঙ্কা বারবার উঁকি দিচ্ছিলো বাসায় ফিরে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলো না বনহুর। কাজেই চলে এসেছে জ্যোছনার নিকট সব জানতে।
