হাসি থামিয়ে বললো বনহুর-অমঙ্গল। আমাকে এ বাড়ি ছাড়তে হবে, এইতো? মিস রায়, আপনি মনে রাখবেন-যতক্ষণ কুন্তিবাঈ ছবি শেষ না হবে ততদিন শুধু আমাকেই নয়, এ বাড়ি থেকে আপনাকেও তাড়াতে সক্ষম। হবে না আতিয়া।
আপনি জানেন না মিঃ চৌধুরী আতিয়া কত ভয়ঙ্কর মেয়ে! ভয়ঙ্কর তার চেহারা, কিন্তু মনটা সত্যি ভয়ঙ্কর নয়। আজকের ঘটনার পরও আপনি ওর সম্বন্ধে এমন উক্তি করতে পারলেন মিঃ চৌধুরী,
মিস আতিয়ার আসল রূপ আমি দেখেছি মিস রায়, মুখে বললেও সত্যি সে হৃদয়হীনা নয়।
জ্যোছনা রায় গম্ভীর হলো।
বনহুর বললো-চলুন কোথাও বেড়াতে যাওয়া যাক।
মন ভাল নেই, আজ থাক।
মন ভাল নেই বলেই তো যাবো। উঠুন মিস রায়।
জ্যোছনা রায় এবার আর কোনো আপত্তি করতে পারলো না।
বনহুর সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে কক্ষের বাইরে বেরুলো।
জ্যোছনা রায় অনুসরণ করলো তাকে।
আরফান উল্লাহ বিশ্রামকক্ষে বসে কি যেন একটা হিসাব নিকাশ করছিলেন। মনের অবস্থা খুব ভাল নয়। এ মাসে তার সবদিকে প্রচুর লোকসান গেছে।
আজও একটা গোপন ব্যবসার হিসেব দেখছিলেন আরফান উল্লাহ।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলো আতিয়া। চোখেমুখে তার ক্রুদ্ধভাব ফটে উঠেছে।
কন্যার পদশব্দে চোখ তুলে তাকালেন আরফান উল্লাহ, বললেন–আতিয়া, খবর কি মা?
আব্বা, তুমি আমার সম্মান চাও, না অর্থ চাও?
একি কথা একি কথা বলছো মা?
সত্যি কথা!
কি হয়েছে বলো? বললেন আরফান উল্লাহ।
রাগত কণ্ঠে বললো আতিয়া–মিঃ চৌধুরী আমাকে অপমান করেছেন।
মিঃ চৌধুরী তোমাকে অপমান করেছেন, বলো কি!
হাঁ, কিন্তু আসলে তার কোনো দোষ নেই।
মানে? ভ্রূকুঞ্চিত করে তাকালেন আরফান উল্লাহ কন্যার মুখের দিকে।
আতিয়া পিতার পাশের সোফায় ধপ করে বসে পড়ে বললো-জ্যোছনা রায়ের কারণেই মিঃ চৌধুরী আমাকে অপমান করলেন।
একটা অদ্ভুত হাসির রেখা ফুটে উঠলো আরফান উল্লাহর মুখে, বললেন-মিস রায়?
হাঁ, আব্বা, আমি আরও লক্ষ্য করেছি-সুটিংয়ের পর প্রায়ই সে মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে বাইরে যায়, এটা কিন্তু ভারী অন্যায়। আব্বা তুমি বলেছো মিঃ চৌধুরীকে তুমি–ভাবী জামাতা–
হাঁ, তাকেই আমি জামাতা করবো, এটা ঠিক। শুধু জামাতা নয়, মিঃ চৌধুরীকে আমার ছবির কাজের জন্য চিরদিনের জন্য আটকে রাখবো, এও ঠিক–
আর যদি মিস জ্যোছনা রায়–
হেঃ হেঃ হেঃ জ্যোছনা রায়! জ্যোছনা রায় আমার কাজে বাদ সাধবে। লক্ষ জ্যোছনা রায় এলেও আমার কাজে বা আমার ইচ্ছায় বাধা দিতে পারবে না। মিঃ চৌধুরীকে আমি জামাতা করবোই।
কিন্তু আব্বা—
না, রাগ বা অভিমান নয়। মিঃ চৌধুরী যাতে ক্ষুন্ন না হয়, তাই করবে আতিয়া।
আমি সেখান থেকে রাগ করে চলে এসেছি।
তাতে কি আছে, আবার যাবে।
এতে আমার সম্মানে বাধবে না?
স্বার্থের জন্য সম্মানবোধ বিসর্জন দিতে হবে মা! তুমি গিয়ে মিঃ চৌধুরীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে।
তা আমি পারবো না আব্বা।
পারতে হবে মা, পারতে হবে।
তুমি আমার সঙ্গে যাবে আব্বা?
বেশ, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।
সেদিন সুটিং শেষ করে বনহুর আর জ্যোছনা রায় স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে। ঐ দুর্ঘটনার পর জ্যোছনা রায়ের মা বাসন্তী দেবী পরিচালক নাহার চৌধুরীকে ডেকে বলেছিলেন-দেখুন, আমাদের একমাত্র কন্যার কোনো কিছু যেন না হয়।
আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন নাহার চৌধুরী-আপনারা নিশ্চিন্ত থাকবেন, জ্যোছনা রায়ের দায়িত্বভার আমি গ্রহণ করছি। ছবি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি নিজে তার প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবো। আমার কোনো অসুবিধা থাকলে প্রযোজক মিঃ আরফান উল্লাহ নিজে পৌঁছে দেবেন।
কিন্তু জ্যোছনা রায় তার পৌঁছানোর দায়িত্বটা স্বেচ্ছায় তুলে দিয়েছিলো মিঃ চৌধুরীর ওপর। অনুরোধ করে বলেছিলো সে–মিঃ চৌধুরী, আমাদের বাসার পথ হয়েই আপনাকে ফিরতে হয়। আমাকে একটু পৌঁছে দিয়ে যাবেন রোজ। একথাও বলেছিলো জ্যোছনা রায়-কারও কাজ আগে হয়ে গেলে আমরা উভয়ে উভয়ের জন্য অপেক্ষা করবো, কেমন?
বনহুর হেসে জবাব দিয়েছিলো-আচ্ছা; কিন্তু যেদিন আমার কাজ একেবারেই থাকবে না সেদিন?
জ্যোছনা রায় চিন্তিতভাবে বলেছিলো-সেদিন অগত্যা বেছে নেবো একজনকে। নাহার চৌধুরী কিংবা মিঃ আরফান উল্লাহর গাড়িতে ফিরবো।
এমন সময় নাহার চৌধুরী এসেছিলেন সেখানে। পকেট থেকে কপালের ঘাম মুছে রুমালখানা পকেটে রাখতে রাখতে বলেছিলেন-আমরা দুজনে অগত্যা, কেমন?
একসঙ্গে চমকে উঠছিলো বনহুর আর জ্যোছনা।
জ্যোছনা রায়ের কথাগুলো তাহলে শুনে ফেলেছেন নাহার চৌধুরী।
জ্যোছনা রায় লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেলো যেন। নাহার চৌধুরী হেসে বললেন-তবু যে আমাদের গাড়িতে যেতে চাইলেন এটাও আমাদের কম সৌভাগ্য নয় মিস রায়।
সে কথাও অবশ্য মিথ্যা নয়। তখন চলচ্চিত্র জগতে নায়িকা হিসেবে জ্যোছনা রায় সর্বশ্রেষ্ঠ। জ্যোছনা রায়ের বিপরীতে কাজ করার জন্য সবগুলো নায়ক অতি আগ্রহান্বিত!
কিছুদিন আগে একসঙ্গে বেশ কয়েকখানা ছবিতে জ্যোছনা রায়কে কাজ করতে হয়েছে। বিভিন্ন ছবির হিরো ছিলো বিভিন্ন জন। অনেকগুলো নায়কের বিপরীতে নায়িকার চরিত্রে কাজ করেছে সে।
কিন্তু ইদানীং জ্যোছনা রায় কুন্তিবাঈ ছবি ছাড়া কোনো ছবিতে অভিনয় করছে না। তার কারণ, আরফান উল্লাহ্ তার ছবির নায়িকাকে অন্য ছবিতে কাজ করতে দিতে রাজী নন, অবশ্য এজন্য আরফান উল্লাহ জ্যোছনা রায়কে মোটা টাকা দিয়েছিলেন।
