মিঃ চৌধুরী, আপনার কথায় সাহস পাচ্ছি না, কিন্তু একটু থেমে বললো জ্যোছনা রায়-মিঃ চৌধুরী, ভালবাসা কোনোদিন জোর করে আদায় করা যায় না। অরুণ কুমারকে আমি কোনোদিন ভালবাসতে পারবো না।
তার অপরাধ?
অপরাধ তার কিছু নেই। একদিন বলেছি-মনের ওপর কারও হাত নেই।
নিহত ড্রাইভারকে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে আবার কুন্তিবাঈ ইউনিট শহর অভিমুখে রওয়ানা দিলো।
এবার জ্যোছনা রায়কে গাড়ির মাঝখানে বসিয়ে নেয়া হলো। নাহার চৌধুরীর দুশ্চিন্তার অন্ত নেই, জ্যোছনা রায় নিহত হলে শুধু চিত্রজগতেরই ক্ষতি হবে না, তিন লাখ টাকা ব্যয়ে কুন্তিবাঈ ছবিটাও সমুলে বিনষ্ট হবে। ছবির তিন ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে, এখন এক ভাগ কাজ বাকী।
পথে আর কোনো বিপদ হলো না সত্য, কিন্তু সকলের মুখোভাব মলিন বিষণ্ণ, কারও মুখে কোনো কথা নেই।
ব্যাপারটা যখন প্রযোজক আরফান উল্লাহর কানে গেলো তখন তিনি একেবারে যেন ভেঙ্গে পড়লেন। একে তার বহু সোনা মধুগঙ্গার বুকে সমাধিস্থ হয়েছে তারপর তার ছবির নায়িকার ওপর এই অদ্ভুত হামলা আরফান উল্লাহকে একেবারে ভাবিয়ে তুললো।
কে এমন ব্যক্তি তার পিছু লেগেছে যে তার সর্বান্তকরণে অমঙ্গল চায়। তাকে সর্বস্বান্ত করেই সে খুশি নয়, তাঁর ছবিটাকেও সমুলে নষ্ট করতে চায়?
কিন্তু অনেক ভেবেও কোনো সন্দিগ্ধজনের সন্ধান আরফান উল্লাহ পেলেন না।
মিস রায়, এ কথা আমিও জানি। কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে চেপে গেলো বনহুর।
জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে ড্রইংরুমে কথা হচ্ছিলো বনহুরের।
এমন সময় বাইরে মোটরের শব্দ হয়।
ইয়াসিন এসে জানায়-স্যার, আপামনি আইসেছেন।
বনহুর স্বকণ্ঠে বলে-আসতে বলল।
চলে যায় ইয়াসিন।
আতিয়ার আগমনের খবর শুনে জ্যোছনা রায় বেশ চঞ্চল হয়ে উঠলো মুহূর্তে তার মুখমণ্ডলে একটা উৎকণ্ঠার ভাব ফুটে উঠলো।
বনহুরের তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তা ধরা পড়ে গেলো, যদিও জ্যোছনা রায় বনহুরের কাছে নিজের উদ্বেগ গোপন করবার চেষ্টা করছিলো।
কিন্তু বেশিক্ষণ ভাববার সময় পেলো না বনহুর, কক্ষে প্রবেশ করলো আতিয়া।
বনহুর উঠে দাঁড়িয়ে আতিয়াকে সাদর সম্ভাষণ জানালো-হ্যালো মিস আতিয়া।
গুড ইভনিং মিঃ চৌধুরী–আতিয়ার কথা শেষ হয় না, জ্যোছনা রায়ের ওপর দৃষ্টি পড়তেই তার মুখোভাব কঠিন হয়ে উঠলো।
জ্যোছনা রায় জড়োসড়োভাবে দাঁড়িয়ে রইলো।
বনহুর একবার জ্যোছনা রায় ও আতিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, বললো-বসুন মিস আতিয়া।
আসন গ্রহণ করলো আতিয়া। তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে ক্রুদ্ধ ভাব।
জ্যোছনা রায় বললো এবার-চলি মিঃ চৌধুরী।
আতিয়াই জবাব দিলো জ্যোছনা রায়ের কথায়–যাবেন কেন, বসুন।
কথাটা স্বাভাবিক হলেও আতিয়ার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক শোনালো। কেমন যেন বেসুরো লাগলো বনহুরের কাছে।
জ্যোছনা রায় বসে পড়লো।
আতিয়া বললো আবার মিস জ্যোছনা, আপনার কাজ স্টুডিওতে, এখানে নয়। আমি শুনেছি, আপনি নাকি প্রায়ই এখানে আসেন, কিন্তু কেন, জানতে পারি কি? তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকালো আতিয়া জ্যোছনা রায়ের মুখের দিকে।
জ্যোছনা রায় শিক্ষিতা আধুনিকা তরুণী। আতিয়ার পিতার অর্থের বিনিময়ে কাজ করলেও সে কাউকে ভয় করে না। ভয় করে সে আত্মমর্যাদার হানি হওয়াকে।
আতিয়ার কথায় জ্যোছনা রায়ের মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠলো, অধর দংশন করতে লাগলো সে।
বনহুর কোনো কথা না বলে উভয়ের মুখোভাব লক্ষ্য করছিলো।
আতিয়ার প্রশ্নের জবাবে বললো জ্যোছনা রায়-মিস আতিয়া আপনি ভুল করছেন। আপনাদের ছবিতে কাজ করি বলেই স্টুডিওর বাইরে যাওয়া আমার মানা নেই।
বোমার মতই ফেটে পড়ে আতিয়া-এত সাহস আপনার মিস জ্যোছনা। জানেন আমি যা খুশি তাই করতে পারি?
যা খুশি তাই করতে পারলেও আমার জীবনপথে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন না-এটাও আমি জানি।
মিস জ্যোছনা, এত বড় কথা আমার মুখের ওপর বলতে সাহস হলো আপনার!
আপনার আপত্তিজনক কথাগুলোই আমাকে বলতে সাহসী ও বাধ্য করেছে।
মিস জ্যোছনা, মনে রাখবেন এটা আমার বাড়ি–
এবার যেন জ্যোছনা রায়ের চেহারা কেমন বিমর্ষ দেখালো। নিজের অলক্ষ্যে দৃষ্টি চলে গেলো বনহুরের মুখের দিকে।
আতিয়া বললো-এর পর আর কোনোদিন যেন এ বাড়িতে আপনাকে না দেখি।
আতিয়ার কথা শেষ হয় না, বনহুর ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো–মিস আতিয়া, এ বাড়ি এখন আমার! এ বাড়িতে কাউকে আসতে নিষেধ করলে তা আমিই করবো, আপনি নন।
আতিয়া ভীষণ ক্রোধভরে উঠে দাঁড়ালো–মিঃ চৌধুরী, আপনি-আপনি এত বড় কথা–
হাঁ, আমাকে যখন আপনি এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন তখন মিস রায়কেও দিতে পারবেন, তার পূর্বে নয়।
আতিয়ার কুৎসিত মুখমণ্ডল আরও কুৎসিত হয়ে উঠলো। যেন একটা মাটির পাতিলের তলা। একবার বনহুর আর একবার জ্যোছনা রায়ের মুখে তাকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলো সে কক্ষ থেকে।
হঠাৎ যেন প্রচণ্ড একটা দমকা হাওয়ায় কক্ষের বাতিগুলো দপ্ করে নিভে গেলো মুহূর্তে।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো বনহুর আর জ্যোছনা রায়।
জ্যোছনা রায়ই প্রথমে কথা বললো-মিঃ চৌধুরী, আমার জন্য কেন আপনি নিজের অমঙ্গল ডেকে আনলেন।
হঠাৎ অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো বনহুর-হাঃ হাঃ হাঃ–হাঃ হাঃ হাঃ–হাঃ হাঃ হাঃ–
হাসি যেন থামতে চায় না বনহুরের।
জ্যোছনা রায় হতবাক স্তম্ভিত হয়ে পড়লো, তাকিয়ে রইলো সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মত। এমন হাসি সে কোনোদিন শোনেনি।
