বলেছি মৃত্যুভয়ে জ্যোছনা রায় ভীত নয়। মরতে হয় মরবো তবু আপনাকে আমি গ্রহণ করতে পারবো না। কথাগুলো বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে জ্যোছনা রায়।
বনহুর মুখে হাসি টেনে বললো-মিস রায়, কেন আপনি ওর প্রতি এত নারাজ?
এর কোনো জবাব দিতে পারবো না মিঃ চৌধুরী।
অরুণ বাবু বড়লোকের একমাত্র সন্তান-রূপ গুণ সব আছে তার। সুপুরুষ সে, অথচ জানি না কেন আপনি–
মিঃ চৌধুরী, আপনাকে আমি এর উত্তর দিতে রাজী নই। শুধু আজ নয়, সে আমার পেছনে বেশ কয়েক বছর ধরে ঘুরে ফিরছে।
আপনার প্রথমেই তাকে বলে দেওয়া উচিত ছিলো।
দিয়েছিলাম।
তবু?
হাঁ, তবুও সে সব সময় আমাকে বিরক্ত করতো।
বনহুর কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক সেই মুহূর্তে মেকআপ ম্যান ডাক দিলেন-আসুন মিঃ চৌধুরী, মিস জ্যোছনা রায়, আপনাদের এখন মেকআপ নিতে হবে।
বনহুর উঠে দাঁড়ালো-চলুন মিস রায়।
জ্যোছনা রায়ও উঠে পড়লো–চলুন।
ছবির কাজ শুরু হলো।
ক্যামেরাম্যান অনন্ত বাবু ক্যামেরার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
সেনাপতি জয় সিংহের ভূমিকায় ভিলেন বিশু সেন ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসছে। পাশে রাজা পরশ রায়ের ভূমিকায় দেব শর্মা।
পরিচালক নাহার চৌধুরী চীৎকার করে বললেন-ক্যামেরা। সঙ্গে সঙ্গে দেব শর্মা ও বিশু সেন ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো।
ক্যামেরা ঘোড়াসহ দেবশর্মা ও জয়সিংকে ধরে নিয়ে পেছনে সরতে লাগলো।
জয়সিংবেশি বিশু সেন এবার ঘোড়াসহ ক্যামরার সামনে এসে, দাঁড়িয়ে পড়লো। পাশে দেবশর্মা।
নাহার চৌধুরী এতক্ষণ স্ক্রিপট ধরে তাকিয়ে ছিলেন জয় সিং ও দেবশর্মার দিকে।
এবার উচ্চকণ্ঠে বললেন-কাট।
অনন্তবাবু ক্যামেরা থেকে সরে দাঁড়ালেন, বললেন-গুড শট হয়েছে।
পরবর্তী দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন নাহার চৌধুরী।
এবারের দৃশ্যে থাকবে হিরো মাসুদের ভূমিকার মিঃ চৌধুরীবেশি দস্যু বনহুর। রত্নাদেবীর ভূমিকায় জ্যোছনা রায়। রাজা পরশ রায়ের ভূমিকায় আহম্মদ আলী এবং সেনাপতি জয় সিংয়ের চরিত্রে বিশু সেন। সহনায়িকা নাসিমা বানু থাকবে জ্যোছন রায়ের সঙ্গে। নাসরিনের ভূমিকায় অভিনয় করছে নাসিমা বানু। মাসুদের পিতা মাহমুদের চরিত্রে থাকবেন আসগর হোসেন। অদুরে পাশাপাশি কয়েকটা তাবু পড়েছে।
তাবুর অদুরে একটা খাটিয়ার বসে রাজা পরশ রায় ও জয়সিং। একটা মোড়ার মত বসবার আসনে বসে মাহমুদ। তিনজনের মধ্যে আলাপ হচ্ছে।
ক্যামেরা তাদের ধরে নিয়ে এগুলো।
পরিচালক উচ্চকণ্ঠে বললেন-কাট।
এবার ক্যামেরা এলো তাবুর মুখে, জ্যোছনা রায় ও নাসিমা বানু বেরিয়ে এলো বাইরে। উভয়ে উভয়ের মুখে তাকিয়ে হাসছে। জয়সিং ইঙ্গিত করলো রাজা পরশ রায়কে।
রাজা পরশ রায় আর জয়সিং তাকিয়ে আছে ওদিকে।
পেছনে এসে দাঁড়ালো মাসুদ–কি দেখছেন?
চমকে একসঙ্গে ফিরে তাকালো রাজা পরশ রায় আর জয়সিং।
জ্যোছনা রায় আর নাসিমা বানুর মুখ থেকে ক্যামেরা এসে পড়লো রাজা পরশ রায় আর রাজা জয় সিংয়ের ওপর।
পরিচালক বললেন-কাট।
শটের পর শট গ্রহণ চললো।
সন্ধ্যা অবধি একটানা সুটিং চলার পর শেষ হলো পরিচালক নাহার চৌধুরীর কাজ।
কুন্তিবাঈ ইউনিট ফিরে চলার জন্য সবাই গাড়িতে উঠে বসলো।
এবারও সামনের গাড়িতে ড্রাইভ আসনের পাশে বসলো বনহুর আর। জ্যোছনা রায়।
পেছনের আসনে পরিচালক নাহার চৌধুরী, বিশু সেন ও আহম্মদ আলী।
ড্রাইভার গাড়িতে ষ্টার্ট দিতে যাবে ঠিক সে মুহূর্তে একটা সুতীক্ষ্ণধার ছোরা এসে বিধে গেলো খচ করে জ্যোছনা রায়ের কাঁধের পাশ ঘেষে ড্রাইভারের পিঠে।
একটা তীব্র আর্তনাদ করে ড্রাইভার উবু হয়ে পড়ে গেলো গাড়ির হ্যাণ্ডেলের ওপর।
মুহূর্তে এতবড় একটা অঘটন ঘটে গেলো।
পেছনে আসনের দরজা খুলে ব্যস্তভাবে নেমে পড়লেন নাহার চৌধুরী ও তাহার সহকর্মিগণ।
বনহুর ততক্ষণে ছোরাখানা ড্রাইভারের পিঠ থেকে তুলে নিয়েছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে।
কি ভয়ঙ্কর কাণ্ড।
কোন দিক থেকে ছোরাটা এলো–কেন ছোরা মারা হয়েছে, কে মেরেছে–হই হই পড়ে গেলো গোটা ইউনিটে।
কিন্তু কেউ এর সঠিক জবাব খুঁজে পেলো না।
তবে এটা স্পষ্ট বুঝা গেলো-যেখান থেকেই ছোরাটা এসে থাকুক বা যেই মেরে থাকুক জ্যোছনা রায়কে উদ্দেশ্য করেই ছোরাটা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো। ছোরাটা তার দেহে না লেগে গেঁথে গিয়েছে ড্রাইভারের পিঠে।
জ্যোছনা রায়কে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই যে ছোরাখানা নিক্ষেপ করা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যেদিক থেকে ছোরাখানা এসেছিলো সেদিকে অনেক সন্ধান করা হলো কিন্তু কারও খোজ পাওয়া গেলো না।
হঠাৎ এই দুর্ঘটনার জন্য গোটা ইউনিট চিন্তিত এবং ব্যথিত হয়ে পড়লো। নাহার চৌধুরী একেবারে বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। এত বড় একটা ঘটনা কম কথা নয়।
সেদিনের পর থেকে জ্যোছনা রায় ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো। জীবনের মায়া কার না আছে। জ্যোছনা রায়ের সম্পূর্ণ সন্দেহ ছোরা নিক্ষেপকারী অন্য কেউ নয়-অরুণ বাবু।
কথাটা এক সময় বললো জ্যোছনা রায় বনহুরকে-মিঃ চৌধুরী, আপনি যাই বলুন, আমাকে লক্ষ্য করে ছোরা নিক্ষেপ করেছিলো অরুণ বাবু।
হেসে বললো বনহুর-সেই যে ছোরা নিক্ষেপ করেছিলো তার প্রমাণ কি?
সুটিংয়ে যাবার পূর্বে সে আমাকে মৃত্যুভয়ে ভীত করতে চেষ্টা করেছিলো।
বনহুর বললো আবার-সত্যি যদি অরুণ বাবু আপনাকে ভালবেসে থাকে মিস রায়, তাহলে সে আপনাকে যতই মৃত্যুভয় দেখাক আসলে আপনাকে হত্যা করতে পারবে না।
