অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ জ্যোছনাকে বেশ গম্ভীর ভাবাপন্ন লাগছিলো, দুএকটা হুঁ না ছাড়া তেমন কোনো কথা আজ বলেনি জ্যোছনা রায়।
অন্য কেউ লক্ষ্য না করলেও বনহুর লক্ষ্য করেছিলো-হাস্যময়ী জ্যোছনা রায় আজ বেশ চুপচাপ।
এবার জিজ্ঞাসা করলো বনহুর-মিস রায়, এমন নিশ্চুপ রয়েছেন কেন?
জ্যোছনা রায় একটু হেসে বললো-না,কিছু না।
জ্যোছনা রায় মুখে কিছু না বললেও মনের গহনে তার ঝড় বইছিলো। কারণ রওয়ানা দেবার পূর্বমুহূর্তে একটি ঘটনা ঘটে গেছে। বিদায়ের কিছু পূর্বে জ্যোছনা রায় যখন তার বিশ্রামকক্ষে ড্রেস পরিবর্তন করছিলো ঠিক সে মুহূর্তে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিলো অরুণ কুমার।
দুচোখে তার অসহায় দৃষ্টি।
জ্যোছনা রায় অরুণ কুমারকে দেখে আচম্বিতে চমকে ওঠে। দুচোখে রাগ–ক্রোধ ঝরে পড়ে, বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলেছিলো জ্যোছনা রায়-এখানে–আপনি কার হুকুমে এসেছেন?
অরুণ কুমার বলেছিলো-জ্যোছনা, আমি কারও হুকুমে এখানে আসিনি, মনের আকর্ষণে ছুটে এসেছি। আমি তোমাকে ভালবাসি।
এ কথা আরো অনেকবার আপনার মুখে আমি শুনেছি।
আজও বলছি জ্যোছনা আমার প্রতি সদয় হও!
না, যা হবার নয় তা কোনোদিন হবে না। জ্যোছনা! অস্ফুট শব্দ করে উঠেছিলো অরুণ কুমার। তারপর দাঁতে দাঁত পিষে বলেছিলো-যদি তোমাকে কোনোদিন না পাই তবে জানো কি হবে তোমার পরিণতি?
জানতে চাই না-যান, যান আপনি।
জ্যোছনা, মনে রেখো আমার হাত থেকে তোমার পরিত্রাণ নেই। যেখানেই যাবে তুমি, সেখানেই আমার দৃষ্টি তোমাকে অনুসরণ করবে-হয় তোমাকে পাবো, নয় তোমাকে এ দুনিয়া থেকে চিরবিদায় দেবো।
জ্যোছনা সে ভয়ে ভীত নয়।
তাই নাকি?
হাঁ, মরতে হয় মরবো, কিন্তু তবু আপনাকে—
জ্যোছনার মুখ চেপে ধরেছিলো অরুণ কুমার, কথা শেষ করতে পারেনি। সে মুহূর্তে বাইরে ভেসে উঠেছিলো নাহার চৌধুরীর কণ্ঠস্বর-হালো মিস রায়, আপনার হলো?
সঙ্গে সঙ্গে অরুণ বাবু অদৃশ্য হলেছিলো ড্রেসিং টেবিলের আড়ালে।
নাহার চৌধুরীর কণ্ঠস্বর পুনরায় ভেসে এসেছিলো বাইরে থেকে আসতে পারি?
শুষ্ক কণ্ঠে বলেছিলো জ্যোছনা রায়–আসুন।
হয়েছে আপনার?
হয়েছে।
চলুন।
নাহার চৌধুরীকে অনুসরণ করেছিলো জ্যোছনা রায়।
এখন বনহুরের পাশে বসে সে কথাই ভাবছিলো জ্যোছনা রায়। মনের মধ্যে তার ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছিলো। বারবার মনে পড়ছিলো অরুণ কুমারের কথাগুলো-যেখানেই যাবে তুমি সেখানেই আমার দৃষ্টি তোমাকে অনুসরণ করবে। হয় তোমাকে পাবো, নয় তোমাকে এ দুনিয়া থেকে বিদায় দেবো।–জ্যোছনা রায়ের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়ে।
পরিচালকের কণ্ঠস্বর-ঐ সামনে ফাঁকা জায়গাটায় গাড়ি রাখো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই জ্যোছনা রায়দের গাড়ি একটা বনানী ঘেরা ফাঁক, জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়লো।
পাশাপাশি তিনখানা গাড়ি এসে দাঁড়ালো। দুখানা জিপ আর একটা ট্রাক।
কুন্তিবাঈ ইউনিট নেমে পড়লো জায়গাটায়। বনহুর জ্যোছনা রায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো আবার বেশ জায়গাটা, না?
ছোট্ট একটা শব্দ করলো জ্যোছনা রায় হ্যাঁ।
অন্যদিন হলে হাসি-খুশি আনন্দে চঞ্চল হরিণীর মত এতক্ষণ ছুটাছুটি শুরু করে দিতো জ্যোছনা রায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল খুব প্রিয় স্থান জ্যোছনা রায়ের।
বনহুরের সঙ্গে এগুতে লাগলো জ্যোছনা রায়।
পরিচালক স্বয়ং তার অন্যান্য সহকারীকে নিয়ে স্থান নির্বাচনে আত্মনিয়োগ করলেন।
অন্যান্য সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বনহুর ঘুরেফিরে জায়গাটা দেখছিলো।
হঠাৎ নজর চলে গেলো পাশে-কই, জ্যোছনা রায় নেই তো! গেলো কোথায়? চারদিকে দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলো। দেখলো বনহুর অদূরে একটি গাছের নীচে ঘাসের উপর বসে আছে জ্যোছনা রায়।
আরে আপনি এখানে! বনহুর গিয়ে দাঁড়ালো জ্যোছনা রায়ের পাশে।
জ্যোছনা রায় বললো-এখানে একটু ঠাণ্ডা মিঃ চৌধুরী, তাই বসলাম।
হাঁ, জায়গাটা বেশ আরামদায়ক।
সত্যি যেখানে জ্যোছনা রায় বসে পড়েছিলো, সে জায়গাটা একটা বকুল ফুলের গাছতলা। ফুলে ফুলে গাছটা যেন নুয়ে এসেছে একেবারে।
ফুরফুরে হাওয়ায় বকুলের মিষ্টি গন্ধ জায়গাটাকে যেন স্বর্গিয় করে তুলেছিলো।
বনহুর বিলম্ব না করে বসে পড়লো জ্যোছনা রায়ের পাশে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়ে বললো-সত্যি করে বলুন তো আজ আপনার কি হয়েছে?
বললাম তো কিছু হয়নি।
মিথ্যে কথা। আর একবার চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো বনহুর-আসার পূর্বে অরুণ বাবুর সঙ্গে আপনার কি কথা হয়েছিলো মিস রায়?
চমকে উঠলো জ্যোছনা রায়-আপনি কি করে জানলেন।
আমি সব জানি মিস রায়।
আশ্চর্য! আপনি তখন—
যদিও গাড়িতে ছিলাম তবুও—
মিঃ চৌধুরী।
মিস রায় অরুণ বাবু আপনাকে এমন কোনো কথা শুনিয়েছিলো যে অত্যন্ত অপ্রীতিকর।
হাঁ, আপনার অনুমান মিথ্যা নয় মিঃ চৌধুরী। একটু চিন্তা করে বললো জোছনা রায়-অরুণ বাবু আমাকে ভয় দেখিয়ে বলেছিলো-যেখানেই যাবে। তুমি সেখানেই আমার দৃষ্টি তোমাকে অনুসরণ করবে।
কথাটা শোনামাত্র বনহুরের মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠে একটা চিন্তারেখা, গম্ভীর কণ্ঠে বললো সে।
জোছনা রায় বললো আবার–মিঃ চৌধুরী, অরুণ বাবু আরও বললো-তোমাকে যদি না পাই, মনে রেখো-এ দুনিয়াতে তোমাকে বাঁচতে দেবো না।
বনহুর স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো-মিস রায়, এসব জানার পর আপনি কি জবাব দিয়েছিলেন?
