বনহুর যেন কিছু বুঝতে পারলো না এমনি থ বনে যায়।
আরফান উল্লাহর মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠেছে। গা ঘেমে দরদর করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
বনহুর ফ্যানের স্পীড বাড়িয়ে দিলো।
আরফান উল্লাহ বললেন কি করবো বলুন, কি করবো?
বলুন কি ঘটনা ঘটেছে? না বললে বুঝবো কি করে?
মিঃ চৌধুরী, আপনাকে আমি বিশ্বাস করি—
হাঁ বলুন?
আমার দুলাখ টাকার সোনা কাল মধুগঙ্গার বুকে নিমজ্জিত হয়েছে।
দুলাখ টাকার সোনা। বনহুর যেন আকাশ থেকে পড়লো।
হ্যাঁ হ্যাঁ, মিঃ চৌধুরী শুনুন–কাল রাতে গঞ্জপুর থেকে এক ট্রাক। বোঝাই চিনি আসছিলো–
চিনি।
হ্যাঁ, সে চিনির বস্তার ভেতরে ছিলো আমার দুলাখ টাকার সো–না–কথাটা তার বুক চিরে বেরিয়ে এলো যেন।
বনহুর বললো–কি করে জানলেন সেগুলো মধুগঙ্গায় নিমজ্জিত হয়েছে?
ড্রাইভার–মিঃ চৌধুরী, কোনো রকমে সাঁতার কেটে ড্রাইভার প্রাণে বেঁচে ফিরে এসেছে।
বনহুর ভ্রূকুঞ্চিত করে কি যেন চিন্তা করলো, তারপর বললো ড্রাইভার প্রাণে বেঁচে ফিরে এসেছে।
হাঁ, তার মুখেই সংবাদ পেলাম মিঃ চৌধুরী। এখন কি করি বলুন? কি করে আমার সোনাগুলো উদ্ধার করি?
বনহুর এবার শান্তকণ্ঠে বললো-ভয় নেই মিঃ উল্লাহ। মধুগঙ্গার পানিতে আপনার চিনির বস্তা দিয়ে সরবৎ তৈরি হলেও বস্তার মধ্যে সোনার দলা গলে যাবে না।
কিন্তু দিনের আলোতে কি করে এগুলো উদ্ধার করা যাবে? আমার মাথা গুলিয়ে গেছে, আমি কিছুই ভেবে পাচ্ছি না–
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলো গত রাতের আহম্মদ। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-মিঃ উল্লাহ সাহেব, বহুত খারাপ বাত আছে!, আরফান উল্লাহ ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠলো-কি খবর বলল, বলো আহম্মদ? ঐ খবরের পর আর কি খারাপ থাকতে পারে বলো?
হামাকে আপনি মধুগঙ্গার ধারে পাঠাইয়া এখানে আসিলেন। কিন্তু আমি যাইয়া দেখিলাম-বহুত পুলিশ মধুগঙ্গার জোড়াপুলে ভীড় জমিয়া গিয়াছে।
পুলিশ!
হাঁ, পুলিশ। আরও দেখিলাম উহারা পানিতে নামিবার জন্য তৈরি হইতেছে।
আহম্মদের জামার আঙিন চেপে ধরলেন আরফান উল্লাহ, আকল কণ্ঠে বললেন-পুলিশ কি করে টের পেলো? আহম্মদ, পুলিশ কি করে টের পেলো?
বনহুর দুচোখ কপালে তুলে বললো-সর্বনাশ তো তখন হয়নি, হলো এখন। পুলিশ যখন সন্ধান পেয়েছে তখন আর কোনো–
উপায় নেই! কথাটা টেনে টেনে হতাশার সুরে বললেন আরফান উল্লাহ।
আরফান উল্লাহকে তখন এমন দেখাচ্ছিলো যেন তার দেহে প্রাণ নেই।
বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললেন আরফান উল্লাহ মিঃ চৌধুরী, আমি কাউকে বিশ্বাস করি না, শুধু আপনার ওপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস–
বলুন কি প্রয়োজন?
পুলিশ যখন জানতে পেরেছে তখন করবার আর কিছু নেই, কিন্তু কথাটা যেন বাইরে প্রকাশ না পায়, মানে সোনাগুলো যে আমার—
জানতে পারবে না মিঃ উল্লাহ। সোনাগুলোই শুধু হারিয়েছেন, আপনি বেঁচে গেছেন।
আরফান উল্লাহ বনহুরের দক্ষিণ হাতখানা চেপে ধরলেন– একথা শুধু আপনি জানলেন মিঃ চৌধুরী।
হাঁ, ভয় নেই কোন।
আরফান উল্লাহ যখন বনহুরের ওখান থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন, তখন মনে হলো তার দেহে প্রাণ নেই, কোনো রকমে দেহকে টেনে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন।
পরদিন পত্রিকায় বড় বড় অক্ষরে প্রকাশ পেলো গত দিনের সোনা উদ্ধারের খবরটা?
পুলিশ কর্তৃক মধুগঙ্গা থেকে প্রচুর সোনা উদ্ধার ও নম্বরবিহীন একটি নিমজ্জিত ট্রাক ও কয়েকখানা বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে।
শহরে একটা ভীষণ চাঞ্চল্য দেখা দিলো। একি অদ্ভুত ঘটনা। ট্রাকই বা। এলো কোথা হতে আর সোনাই বা এলো কি করে, কিন্তু এর জবাব কেউ দিতে পারলো না।
আরফান উল্লাহ বেশ কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছিলেন। দুলাখ টাকা তার পানিতে ভেসে গেছে, কম কথা নয়। পুলিশের হাতে চলে যাওয়া মানে পানিতে ভেসে যাওয়ার মতই।
আরফান উল্লাহ ঝিমিয়ে পড়লেও একেবারে ভেঙে পড়লেন না। ভেঙে পড়লে তার চলবে কেন? মেরুদণ্ড সোজা করে আবার তিনি পা বাড়ালেন সামনের দিকে।
বিদেশিদের সঙ্গে বছরে তার বেশ কয়েক লাখ টাকার গোপন কারবার চলতো। তাছাড়া অন্যান্য অনেক চোরা কারবার ছিলো আরফান উল্লাহর, কাজেই আরফান উল্লাহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেন।
এতগুলো টাকা বিনষ্ট হওয়ায় আরফান উল্লাহ ঝিমিয়ে পড়লেও তার অনুচর ও কর্মচারীরা নীরব ছিলো না। তারা ঠিকভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো।
কুন্তিবাঈ ছবির সুটিং কয়েকদিন বিশেষ কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, আবার শুরু হলো।
সেদিন আউটডোর সুটিংয়ের জন্য একটা গ্রামাঞ্চলে যেতে হলো। কুন্তিবাঈ ছবির ইউনিটকে।
আজকের সুটিংয়ে খুব বেশি লোকজনের দরকার হবে না।
পরিচালক নাহার চৌধুরী, ছবির নায়ক মিঃ চৌধুরী, নায়িকা জ্যোছনা রায় এবং সহনায়ক বিশু সেন ও অন্যান্য লোক নিয়ে রওয়ানা দিলেন শহর ছেড়ে দশ মাইল দূরে একটি গ্রামের উদ্দেশ্যে।
দুখানা ট্যাক্সি আর একটা ট্রাক নিয়ে রওয়ানা দিলেন নাহার চৌধুরী। সামনের ট্যাক্সিতে পরিচালক স্বয়ং এবং নায়ক-নায়িকা ও সহনায়ক। মাঝখানে ইউনিটের বিভিন্ন লোক এবং খাবার জিনিসপত্র। পেছনের ট্রাকে ক্যামেরা এবং অন্য আসবাবপত্র–ছবির জন্য প্রয়োজন। শহর ছেড়ে গাড়িগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। ড্রাইভারের আসনের পাশে বনহুর আর জ্যোছনা রায় বসেছে। পেছন আসনে নাহার চৌধুরী ও সহনায়ক বিশু সেন।
