আরফান উল্লাহর কণ্ঠ–সালাম।
আলখেল্লাধারী যেমন এসেছিলো তেমনি পাইপ বেয়ে তর তর করে নেমে গেলো নিচে।
বাড়ির পেছন অংশে পৌঁছতেই আলখেল্লাধারী শুনতে পেলো মোটর ষ্টার্টের শব্দ। বাড়ির দক্ষিণ অংশে কোনো গোপন জায়গা আছে, যেখানে গাড়ি রাখলে সামনে থেকে কেউ দেখতে পায় না।
আলখেল্লাধারী যখন তার শব্দবিহীন গাড়িখানা নিয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে পেছন দিকে আসছিলো, তখন বাড়ির সামনের গাড়ি বারান্দায় কোনো গাড়ি, ছিলো না।
আলখেল্লাধারী গাড়িতে বসে ষ্টার্ট দিলো।
মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেলো গাড়িখানা।
পরদিন।
রাত দুটো বাজবার কিছু বিলম্ব আছে।
আলখেল্লাধারী নিজের গাড়িখানা জোড়াপুরে অদূরে একটা ঝোপের আড়ালে রেখে নেমে দাঁড়ালো। অন্ধকারে রেডিয়াম হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, এখনো দুটো বাজতে পঁচিশ মিনিট বাকী।
শহর ছেড়ে প্রায় একশ মাইল দূরে এই জোড়াপুল। মধুগঙ্গার উপর দিয়ে ঝুলানো এই পুলখানা চলে গেছে গঞ্জপুরের দিকে। পুলটার ঠিক মাঝখানে একটা জোড়া রয়েছে, তাই এর নাম জোড়াপুল।
মধুগঙ্গা দিয়ে যখন বড় বড় নৌকা বা ষ্টিমার চলে তখন জোড়াপলের জোড়া খুলে যায়।
পুলের দুই মাথায় দুজন ট্রাফিক পুলিশ দণ্ডায়মান থাকে, তারাই পুলের জোড়া খুলে দেয়। পুলের দুপাশে দুটো হ্যাণ্ডেলের মত জিনিস রয়েছে, সেটা জোরে সামনে ঠেলে দিলে পুল স্বাভাবিক হয়ে যায়, আর পেছনে ঠেলে দিলে মাঝখান ফাঁক হয়ে যায়। তখন যে কোনো স্টিমার বা বড় বড় নৌকা পাল তুলে অনায়াসে এদিক থেকে সেদিক চলে যায়।
আলখেল্লাধারী এসে দাঁড়ালো পুসের সামনে যেখানে রয়েছে পুলের চাবিকাঠি।
ঠিক সেই মুহূর্তে মধুগঙ্গার ওপারে রাস্তায় দুটো লাইটের আলো তীরবেগে ছুটে আসছে জোড়াপুলের দিকে।
আলখেল্লাধারীর চোখ দুটোও জ্বলে উঠলো ঠিক ঐ দুটো লাইটের আলোর মতই।
স্পীডে এগিয়ে আসছে একটা ট্রাক।
এখানে হ্যাণ্ডেলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে আলখেল্লাধারী। আর মাত্র কয়েক মিনিট-তাহলেই তার দক্ষিণ হাতখানা নুয়ে পড়বে একপাশে।
আলখেল্লাধারীর দৃষ্টি ঐ সার্চলাইটের আলোর ওপর স্থির হয়ে আছে।
গাড়িখানা সবেগে উঠে পড়লো জোড়াপুলের উপর। তীরবেগে এগিয়ে আসছে। মাত্র কয়েক সেকেণ্ড, জোড়াপুলের মাঝখান ফাঁক হয়ে গেলো আচম্বিতে।
ঝপ করে একটা শব্দ হলো।
একটা ক্ষীণ আর্তনাদ বাতাসে ভেসে উঠে মিলিয়ে গেলো মুহূর্তে।
পরক্ষণেই একটা অট্টহাসিতে মুখর হয়ে উঠলো মধুগঙ্গার তীর। আলখেল্লাধারী এবার হাসি থামিয়ে গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
ভোরে ঘুম ভাঙতেই পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ, হোসাইন দেখলেন তার নামে একখানা জরুরী চিঠি এসেছে। মুখহাত না ধুয়েই খুলে ফেললেন চিঠিখানা। মাত্র দুটো লাইন লেখা আছে
ইন্সপেক্টার, গত রাত দুটোয় জোড়াপুলের মাঝখানে মধু গঙ্গায় একটি ট্রাক নিমজ্জিত হয়েছে। ট্রাকে চিনির বস্তার মধ্যে বহু সোনা আছে। বিলম্ব না করে উদ্ধার করুন।
–অজ্ঞাত
ইন্সপেক্টার মিঃ হোসাইন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার হাতে চিঠিখানা তখনও ধরা। মধুগঙ্গায় ট্রাক নিমজ্জ্বিত, চিনির বস্তায় সোনা–কয়েকবার পড়লেন মিঃ হোসাইন চিঠিখানা।
হাতমুখ ধোয়া বা নাস্তা খাওয়া কোনোটাই তাঁর হলো না, তখনই তিনি চিঠিখানাসহ ছুটলেন পুলিশ অফিসে।
সহকারী মকসুদ মিয়াকে তখনই আদেশ দিলেন কয়েকজন পুলিশ নিয়ে মধুগঙ্গায় জোড়াপুলের নিকটে যেতে। অল্পক্ষণ পর তিনি আসছেন বলে জানালেন।
হঠাৎ মধুগঙ্গায় জোড়াপুলের নিকটে কি প্রয়োজন ভেবে পান না মকসুদ মিয়া।
মিঃ হোসাইন আরও বলে দিলেন-তিনি পৌঁছবার পূর্বে কেউ যেন মধুগঙ্গায় না নামে।, মকসুদ মিয়া কোনো প্রশ্ন করতে পারলেন না, তিনি কয়েকজন পুলিশ নিয়ে রওয়ানা হলেন মধুগঙ্গার দিকে।
সহকারী মকসুদ মিয়া বিদায় হতেই মিঃ হোসাইন চিঠিখানা নিয়ে পুলিশ সুপারের নিকটে হাজির হলেন।
চিঠিখানা তাঁর হাতে দিয়ে বললেন-স্যার, চিঠির কথা সত্য মিথ্যা জানি না, তবু আমি আমার সহকারী মকসুদ মিয়াকে কয়েকজন পুলিশসহ মধুগঙ্গার তীরে পাঠিয়েছি। এবার কি করা যায় বলুন?
পুলিশ সুপার বেশ কিছুক্ষণ চিঠিখানার দিকে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবলেন, তারপর বললেন-যতদূর বিশ্বাস চিঠির লেখা সত্য বলেই মনে হচ্ছে।
তাহলে আমি ডুবুরী নিয়ে জায়গাটা পরীক্ষা করে দেখবো?
নিশ্চয়ই দেখতে হবে।
পুলিশ সুপারের সঙ্গে যখন পুলিশ ইসপেক্টার মিঃ হোসাইন নিমজ্জিত ট্রাক, সোনা চিঠি নিয়ে আলাপ আলোচনা করছিলেন, তখন বনহুর নিজের ড্রাইরুমে বসে চা পান করছিলো।
এমন সময় পাগলের মত এলোমেলো বেশে কক্ষে প্রবেশ করলেন মিঃ আরফান উল্লাহ-মিঃ চৌধুরী, সর্বনাশ হয়েছে, আমার সর্বনাশ হয়েছে–মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন তিনি।
বনহুর শশব্যস্তে ওঠে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো-হঠাৎ কি হলো, আপনার মিঃ উল্লাহ?
মিঃ চৌধুরী, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
সর্বনাশ হয়ে গেছে! আতিয়ার কোনো অমঙ্গল ঘটেনি তো? বনহুর চোখেমুখে আশংকাভাব টেনে কথাটা বললো।
আরফান উল্লাহ বললেন-না, না, আতিয়ার কোনো অমঙ্গল ঘটেনি মিঃ চৌধুরী।
তবে কি হলো?
দুলাখ টাকা, দুলাখ টাকা আমার চলে গেছে মিঃ চৌধুরী ও হো হো হো আকুলভাবে কেদে উঠলেন.আরফান উল্লাহ।
