এর পূর্বে আরও কয়েকদিন আতিয়া এসে বনহুরকে জোর করে নিয়ে গেছে বাইরে। বনহুরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে টেনে নিয়ে যায়। নূরীর মনকে এ দৃশ্য কেমন যেন চঞ্চল করে তোলে, ভাবে কত কথা। কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে যায়। নূরী তখন শয্যায় শুয়ে থাকে চুপ করে।
ইয়াসিন অনেকদিন বলেছে, বেগম সাহেবা, আপনি অমন চুপ চাপ থাকেন কেন?
বাড়ির অন্যান্য চাকর বাকর প্রশ্ন না করলেও অবাক হয়েছে নূরীর নীরবতা লক্ষ্য করে।
কিন্তু কেউ জবাব পায়নি।
নূরী নির্বিকার পুতুলের মত গোটা দিন বসে থাকে নিজের শয়নকক্ষে। নূরীর দেখাশুনার জন্য যে মেয়েটাকে রাখা হয়েছিলো, সে সব সময় নূরীকে নাওয়া-খাওয়া করাতো-কোনো কোনো সময় বাগানে নিয়ে গিয়ে দস্যু বসতো, চুল আঁচড়ে দিতো, গল্প করতো, কিন্তু নূরী চিত্রাপিতের ন্যায় গল্প শুনতো বা যা বলতো সেই কাজ করতো।
আতিয়ার সঙ্গে বনহুরের কদিন মেলামেশা লক্ষ্য করে নুরীর মধ্যে একটু যেন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো। আর কেউ এটা লক্ষ্য না করলেও ধৰা পড়ে গেলো বনহুরের কাছে।
বনহুর যখন আতিয়ার সঙ্গে ড্রইংরুমের দিকে যাচ্ছিলো তখন মুরীর ওপর তার চোখ দুটো চলে গিয়েছিলো। একটা জিনিস বনহুর লক্ষ্য করেছিলো যা তার মনে এনেছিলো ক্ষীণ আশ্বাসবাণী। আতিয়ার সঙ্গে তাল মেলামেশাটা নূরীর কাছে সন্তোষজনক নয় বলে মনে হয়েছিলো। একটা হাসির রেখা। ফুটে উঠেছিলো তখন বনহুরের ঠোঁটের কোণে।
ড্রইংরুমে আতিয়ার পাশে এসে বসলো বনহুর-মিস আতিয়া এত রাতে হঠাৎ কি মনে করে?
যদি বলি আপনাকে দেখতে? কিন্তু….
না, কিন্তু নয়, কারণ এত রাতে আমি এমনিই আসিনি।
আপনি জানতেন আজ আমার সুটিং ছিলো। তবু জেনেশুনে কেন এত কষ্ট করে এসেছেন এবং আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
মিঃ চৌধুরী, আব্বার মুখে শুনেছিলাম সন্ধ্যার পরই আপনার কাজ শেষ হবার সম্ভাবনা আছে, কাজেই…
কিন্তু শেষ নাও তো হতে পারে, এটাও আপনার ভেবে দেখা উচিত ছিলো।
কি জানি মিঃ চৌধুরী, সব সময় আপনাকে মনে-আপনার পাশে থাকবার। বাসনা আমার মনকে অস্থির করে রাখে।
আতিয়ার প্রেম গদ গদ কণ্ঠস্বরে বনহুরের মন বিষিয়ে ওঠে। ভ্রুকুঞ্চিত করে তাকায় সে ওর মুখের দিকে।
বনহুর মনে মনে বিরক্তি বোধ করলেও আতিয়ার যাওয়া-আসা বেড়েই উঠলো দিনের পর দিন।
বনহুরকে নিবিড় করে পাবার জন্য আতিয়া যেন উম্মাদ হয়ে উঠলো। আরফান উল্লাহ কন্যাকে যোগাতে লাগলেন উৎসাহ আর প্রেরণা। মিঃ চৌধুরীকে চিরদিনের জন্য আবদ্ধ করার এই একমাত্র উপায়। যেমন করে হোক তাকে কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিতে পারলেই তিনি যেন নিশ্চিন্ত হন।
একসঙ্গে কন্যার জামাতা লাভ এবং নিজের ছবির হিরো সংগ্রহ! কিন্তু বনহুর নির্বোধ নয়। প্রথম দিন আরফান উল্লাহর সঙ্গে পরিচিত হয়েই সে বুঝতে পেরেছিলো তার মনোভাব সুবিধার নয়। লোকটার উদ্দেশ্যমূলক কথাবার্তা তার মনে জাগিয়েছিলো সন্দেহের দোলা।
বনহুর সতর্ক হয়ে গিয়েছিলো নিজের ব্যাপারে।
ইচ্ছা করলেই বনহুর আরফান উল্লাহ এবং নাহার চৌধুরীর নাগপাশ থেকে যে কোন মুহূর্তে মুক্ত হয়ে উধাও হতে পারতো। বনহুরকে আটকায় এমন কেউ নেই এ দুনিয়ায়, কিন্তু সে আপন ইচ্ছাতেই রয়ে গেছে, তা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে নয়। ছবিতে.লক্ষ টাকা চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আরফান উল্লাহ। শুধু অর্থের জন্যও নয়, পেছনে আর একটা ব্যাপার রয়েছে। বনহুর গোপনে সন্ধান নিয়ে জানতে পেরেছে প্রযোজক আরফান উল্লাহ একজন অসৎ ব্যবসায়ী।
বনহুর ছবির কাজ শেষ করে টাকা নেবে এবং সেই সঙ্গে আরফান উল্লাহর অসৎ ব্যবসার অবসান ঘটাবে।
গভীর রাত।
একটা গাড়ি এসে থামে আরফান উল্লাহর বাড়ির পেছনভাগে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো একজন জমকালো আলখেল্লাধারী। সমস্ত শরীর কালো আলখেল্লায় ঢাকা। মুখে কালো মুখোশ। শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জুলছিলো আলখেল্লার ভেতরে।
আলখেল্লাধারী অতি কৌশলে পেছন প্রাচীর টপকে প্রবেশ করলো অন্তঃপুরে। একবার প্যান্টের পকেটে হাত রেখে রিভলবারের অস্তিত্ব অনুভব করে নিলো।
সোজা এসে দাঁড়ালো আলখেল্লাধারী দোতলার পেছনের দিকে। অতি নিপুণতার সঙ্গে পাইপ বেয়ে উঠতে লাগলো উপরে।
যে কক্ষটার পাইপ বেয়ে আলখেল্লাধারী উপরে উঠলো সেই কক্ষের মধ্যে তখন আরফান উল্লাহ ও আর একজন লোক বসে অতি নিম্নস্বরে আলোচনা হচ্ছিলো।
আলখেল্লাধারী পাইপ বেয়ে একেবারে জানালার শার্শির পাশে এসে পৌঁছলো।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষ হতে ভেসে এলো আরফান উল্লাহর চাপা কণ্ঠ-আহমদ, আবার তোমাকে বলে দিচ্ছি-রাত একটায় গঞ্জপুর থেকে রওয়ানা দেবে, জোড়াপুলের উপর পৌঁছতে যেন রাত দুটো হয়। কারণ, তখন ট্রাফিক পুলিশ জোড়াপুলের মুখ থেকে সরে পড়বে। তারপর নিশ্চিন্তে পৌঁছে যাবে আমার গুদামে। সেখানে পৌঁছলে আর কোনো ভয় থাকবে না। সাবধান! কেউ যেন টের না পায়-ট্রাকের চিনির বস্তার মধ্যে সোনা আছে।
নাহি বাবু সাব, টের না পাবে। হামি লোক বহুৎ হুঁশিয়ার আছি! চিনির বস্তায় সোনা আছে-কেউ টের না পাবে।
আলখেল্লাধারীর চোখ দুটে জ্বলে উঠলো।
কক্ষে এবার শোনা গেলো-হামি এবার চলি?
যাও আহমদ, মনে রেখো-তুমি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের মধ্যে একজন।
হাসির শব্দ-হামাকে তা বলতে হবে না। সালাম বাবু সাব।
