সেকি উনি..
না না, উনি কিছু মনে করবেন না। আমার মা কিন্তু খুব ভাল-মা মা, দেখ কে এসেছেন!
প্রথমে কক্ষে প্রবেশ করলো জ্যোছনা রায়। বনহুর পেছনে। কক্ষে প্রবেশ করে সামনে তাকালো বনহুর, মধ্যবয়স্কা এক ন্দ্র মহিলা বৈদ্যুতিক ল্যাম্পের সামনে বসে বই পড়ছিলেন। জ্যোছনা রায়ের কণ্ঠস্বরে বইখানা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন। চোখে সোনার ফ্রেমে বাঁধানো পাওয়ার ওয়ালা চশমা। একটা চওড়া লালপেড়ে শাড়ি পরনে। কপালে সিঁদুরের টিপ, সিথিতেও সিদুরের রেখা। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন মহিলা-জ্যোছনা।
হাঁ মা, দেখ কাকে আজ ধরে এনেছি।
বনহুরের দিকে তাকিয়ে বললেন ভদ্রমহিলা-তোদের স্টুডিওর লোক বুঝি?
জ্যোছনা রায় বললো-উনি কুন্তিবাঈ ছবির হিরো।
বসুন, আপনার বিপরীতেই বুঝি জ্যোছনা কাজ করছে?
ভদ্রমহিলা চশমাটি ঠিক করে নিয়ে বললেন আবার-জ্যোছনার মুখে আপনার অনেক প্রশংসা শুনেছি। সত্যি বাবা, আজ আপনাকে দেখে অনেক খুশি হলাম।
বনহুর বুঝতে পারলো-জ্যোছনা রায় তার সম্বন্ধে আগেই মায়ের কাছে অনেক কিছু বলেছে। বনহুর কোনো জবাব না দিয়ে চুপ রইলো।
কিন্তু বনহুর এভাবে বেশিক্ষণ বসে থাকার মত শান্ত লোক নয়। উসখুস করতে লাগলো তার মন। কিন্তু উঠি বললেন তো ওঠা হবে না। এসেছে যখন কিছু কথাবার্তা বলতে হবে। কাজেই বনহুর বললো-আপনি আমাকে তুমি বলবেন।
হ্যাঁ ঠিক বলেছো বাবা, আপনি বলতে আমারও কেমন বাধছিলো। কিন্তু কথা দাও, এখন থেকে আসবে তুমি?
হঠাৎ পরিচয় হতেই ভদ্রমহিলা একেবারে নিজের করে নিলেন যেন।
এবার জ্যোছনা রায় হেসে বললো-দেখলেন তো মিঃ চৌধুরী, বলেছিলাম না আমার মা খুব ভাল। এবার থেকে মায়ের অনুরোধ ফেলতে পারবেন না নিশ্চয়ই।
বনহুর বললেন-পরিচয় যখন হলো, সুযোগ পেলেই আসবো।
না না, তা হবে না, ওসব সুযোগ টুযোগ বুঝি না। দেখো বাবা, একা একা থাকি, সময় কাটতে চায় না-জ্যোছনার সঙ্গে এলে অনেক খুশি হবো।
জ্যোছনা রায় উঠে দাঁড়ালো, সেও মায়ের পাশে আসনে বসে পড়েছিলো, বললো-যাই, একটু জলযোগের ব্যবস্থা করিগে।
বহু বাধা দিয়ে বললো-মোটেই না। উঠি আজ?
উঠি বললেই কি ওঠা হয় বাবা? এসেছো যখন তখন একটু যা হয় মুখে দিয়ে তবে যেতে হবে।
জ্যোছনা রায় ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে কক্ষ থেকে!
জ্যোছনা রায় বেরিয়ে যাবার পর ভদ্রমহিলা সোফায় আরও জেঁকে বললেন, বললেন বনহুরকে-দেখো বাবা, জ্যোছনা আমার ঘরের লক্ষ্ণী। ও যতক্ষণ বাইরে থাকে, মনে আমি এতটুকু শান্তি পাই না। কিন্তু কি করবো, বাধ্য হয়েছি ওকে বাইরে পাঠাতে। তুমি হয়তো মনে করবে অভিনয় করানো আমাদের পেশা আসলে তা নয়, জ্যোছনার সখ-ও অভিনয় করবে।
বেশ তো, এটা মন্দ কি?
কিন্তু আমার ভাল লাগে না? শুধু ওর আর ওর বাবার ইচ্ছায়….
জ্যোছনা রায় এসে পড়ায় চুপ হলেন ভদ্রমহিলা।
বনহুরও কোনো কথা তুললো না এর পরে।
জলযোগের পর বনহুর বিদায় গ্রহণ করলো। জ্যোছনা রায়ের জননীর ব্যবহারে খুশি হলো বনহুর।
বিদায়কালে ভদ্রমহিলা বনহুরকে বারবার অনুরোধ জানালেন আবার আসতে।
বনহুর গাড়িতে চেপে বসলো, হঠাৎ পাশে হাতের কাছে একটা ভাজকরা কাগজ দেখতে পেলো সে।
বনহুর কাগজখানা পকেটে রেখে গাড়িতে স্টার্ট দিলো।
জ্যোছনা রায় বনহুরকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এসেছিলো। বনহুর তার অলক্ষ্যেই কাগজখানা সরিয়ে ফেলেছিলো।
বাড়ি ফিরে সর্ব প্রথম বনহুর আলোর কাছে গিয়ে সেই ভাজকরা কাগজখানা মেলে ধরলো। মাত্র কয়েক লাইন লেখা
এত করে বলা সত্ত্বেও আপনি পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ালেন না। এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়ংঙ্কর। পুনরায় সাবধান করে দিচ্ছি।
.
হঠাৎ অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো বনহুর। হাসি থামিয়ে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠলো সে, আতিয়া দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে, মুখে বিকৃত হাসি। হাতে একটা বেতের তৈরি ভ্যানিটি ব্যাগ। মূল্যবান শাড়ি এবং অলঙ্কারে সজ্জিত।
বনহুর তাকাতেই বললো আতিয়া-হ্যালো মিঃ চৌধুরী।
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো-আপনি কখন এলেন।
কখন থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি মিঃ চৌধুরী। কথা বলতে বলতে আতিয়া বনহুরের গা ঘেঁসে দাঁড়ালো।
বুঝতে পারলো বনহুর, আতিয়া এ বাড়িরই কোনো কক্ষে ছিলো এতক্ষণ।
বনহুর সংকুচিতভাবে একটু সরে দাঁড়ালো। নূরী যদি দেখে ফেলে কি যে মনে করবে!
আতিয়া বললো-আব্বা, আমাকে স্টুডিও থেকে ফোন করেছিলেন, আপনি নাকি বেশ কিছুক্ষণ হলো স্টুডিও থেকে বেরিয়েছেন।
মিঃ উল্লাহ স্টুডিওতে ছিলেন নাকি? কই, তার সঙ্গে তো আমার সাক্ষাৎ হয়নি? বনহুর অন্যমনস্কভাবে কি যেন ভাবতে লাগলো।
আতিয়া বললো-আপনার বোন এখানে আছেন-কই তার সঙ্গে তো আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন না?
চোখ তুললো বনহুর-বোন। হাঁ আছে, কিন্তু তার শরীরটা তেমন ভাল নয়, কাজেই…।
ও, উনি বুঝি অসুস্থ?
ঠিক অসুস্থ না, তবে মাথায় একটু-মানে—
মাথায় গণ্ডগোল আছে বুঝি আপনার বোনের?
হাঁ, একটা দুর্ঘটনায় তার মাথায় কিছুটা গণ্ডগোলের সৃষ্টি হয়েছে। চলুন ড্রইংরুমে গিয়ে বসি?
বনহুর এতক্ষণ আতিয়াকে এ ঘরে বসার জন্য অনুরোধ জানায়নি।
আতিয়া বললো-চলুন।
বনহুর যখন আতিয়ার সঙ্গে বেরিয়ে গেলো তখন নূরী দরজার আড়াল থেকে লক্ষ্য করছিলো।
নূরীর মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠলো, নতমুখে কি যেন ভাবতে লাগলো সে।
