০২.
বনহুরের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে জ্যোছনা রায়। জ্যোছনা রায়ের শরীরে আজও পূর্ব দিনের ড্রেস, সেই নববধূর পরিচ্ছদ। ললাটে চন্দনের টিপ, খোপায়, গলায়, হাতে ফুলের মালা। আজ ঘোমটায় মুখ ঢাকা নয় জ্যোছনা রায়ের। ঘোমটা আজ খসে পড়ে আছে কাঁধের ওপর।
বনহুরের শরীরেও বিবাহের ড্রেস।
গলায় ফুলের মালা, চোখে সুরমার রেখা, মুখে মিষ্টি হাসির ছোঁয়াচ।
অদূরে ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অনন্ত বাবু। সার্চ লাইটগুলো তৈরি রয়েছে পরিচালকের আদেশের অপেক্ষায়।
মাথার উপরে ঝুলছে শব্দ যন্ত্র।
সহকারী পরিচালকদ্বয় সেটের জিনিসগুলো ঠিক করে দিচ্ছিলো। মেহগনি খাটের উপর মালাগুলো লম্বা করে ঝুলছে। সেগুলো আর একটু নেড়েচেড়ে ঠিক জায়গায় সরিয়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালেন পরিচালক নাহার চৌধুরী।
স্ক্রিপ্ট খুলে আর একবার নায়ক-নায়িকাকে বুঝিয়ে দিলেন তাদের ভুমিকা।
এবার নাহার চৌধুরী দ্রুত সরে এলেন ক্যামেরার পাশে, অনন্ত বাবুর পাশ কেটে নিজে একবার দেখলেন তাকিয়ে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন-রেডি! লাইট!
সঙ্গে সঙ্গে অনন্ত বাবু ক্যামেরায় চোখ রাখলেন।
পুনরায় পরিচালকের উচ্চকণ্ঠ-ক্যামেরা, সাউণ্ড…
বনহুর এবার জ্যোছনা রায়ের মুখটা তুলে ধরলো-রত্না!
লজ্জাভরা দৃষ্টি তুলে তাকায় রত্নার ভূমিকায় জ্যোছনা রায় বনহুরের মুখে-বলো!
আমি মুসলমান, আর, তুমি ব্রাহ্মণ-কন্যা-এ বিয়েতে তুমি কি সুখী হবে রত্না? বললো মাসুদের ভূমিকায় বনহুর।
তোমাকে স্পর্শ করে আমি শপথ করছি, আমি…
জ্যোছনা রায়ের কথা শেষ হয় না, একটা সুতীক্ষ্ণধার ছোরা এসে গেঁথে যায় জ্যোছনা রায়ের কাছে…..।
পরিচালক নাহার চৌধুরী চীৎকার করে ওঠেন-কাট।
সঙ্গে সঙ্গে সার্চ লাইটের আলো নিভে যায়।
ক্যামেরা থেকে সরে দাঁড়ান অনন্ত বাবু।
পরিচালক আনন্দধ্বনি করে ওঠেন-গুড!
পরবর্তী শ্যুটের জন্য প্রস্তুত হন নাহার চৌধুরী।
বনহুর উঠে দাঁড়ায়, জ্যোছনা রায় বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে-সত্যি বড় নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম।
বনহুর জ্যোছনার কথায় বলে-বেশ করেছেন কিন্তু।
নাহার চৌধুরী এগিয়ে আসেন-আপনারা উভয়েই চমৎকার অভিনয় করেছেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে বনহুরের দৃষ্টি চলে যায় অদূরে ক্যামেরার ওপাশে শার্শীটার দিকে। কক্ষের উজ্জ্বল আলোতে দেখা যায়-দুটি চোখ শার্শীর ফাঁকে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠলো। পরক্ষণেই সরে গেলো চোখ দুটো।
বনহুর ওদিকে শার্শীটার দিকে তাকিয়ে ছিলো।
জ্যোছনা রায় তাকালো সেইদিকে-কি দেখছেন?
বনহুর স্বাভাবিক হয়-কিছু না।
জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে বনহুরের আরো কয়েকটা শট নিলেন নাহার চৌধুরী। এবার ছুটি হলো জ্যোছনা রায়ের। নাহার চৌধুরী বললেন-মিস রায়, আপনি যেতে পারেন। আমাদের স্টুডিওর গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে।
হঠাৎ কেন যেন বনহুরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো মিস রায়, আপনি আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, এই শটটার পর আমি আপনাকে পৌঁছে দেবো। কারণ, আজ আর আমার কোনো কাজ নেই।
ধন্যবাদ মিঃ চৌধুরী। জ্যোছনা রায়ের কণ্ঠে একরাশ আনন্দ।
বনহুরের কাজ শেষ হতে বেশি বিলম্ব হলো না।
বনহুর আর জ্যোছনা রায় গাড়িতে এসে বললো।
এমন সময় হঠৎ বনহুর দেখতে পেলো-স্টুডিওর ছাদে একটা থামের আড়ালে সরে গেলো অরুণ কুমার সেন।
বনহুর গাড়িতে স্টার্ট দিলো কিন্তু মনটা তার কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলো। মনে পড়লো কিছু দিন আগের এক সকালের কথা। অরুণ কুমার এসেছিলো বনহুরের কাছে। কি উদ্দেশ্যে এসেছে বনহুর তা জানতো। তাই সে বলেছিলো; ভয় নেই অরুণ বাবু, আমি আপনার পথে কাঁটা হবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
বনহুর সে কথাই ভাবছিলো।
জ্যোছনা রায় বনহুরকে গম্ভীর মুখে গাড়ি চালাতে দেখে হেসে বললো-হঠাৎ আপনাকে বড় ভাবাপন্ন লাগছে মিঃ চৌধুরী?
জ্যোছনা রায়ের কথায় বনহুরের সম্বিৎ ফিরে আসে।
বললো বনহুর-মিস রায়, একটা কথা আপনাকে বলবো?
বলুন?
আপনি নিশ্চয়ই জানেন, অরুণ কুমার সেন আপনাকে গভীরভাবে ভালবাসেন!
মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো জ্যোছনা রায়ের মুখমণ্ডল। কিন্তু পরমুহূর্তেই মুখোভাব স্বাভাবিক করে বললো সে-এ কথা তিনি আমাকে অনেকবার বলেছেন। কিন্তু আমি তাকে ভালবাসতে পারিনি। মিঃ চৌধুরী, তিনি জানেন না, মনের ওপর কারও জোর চলে না।
বনহুর স্তব্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছিলো জ্যোছনা রায়ের কথাগুলো।
বলে চলেছে জ্যোছনা রায়-অরুণ বাবু এমনও বলেছেন, তিনি আমার জন্য সব করতে পারেন, এমন কি নিজের জীবন পর্যন্ত দিতেও নাকি কুণ্ঠিত নন।
এত জেনেও আপনি তাকে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন মিস রায়?
আপনিও অবুঝের মতো কথা বললেন মিঃ চৌধুরী, কারণ অরুণ বাবুকে আমি শত চেষ্টা করেও ভালবাসতে পারিনি, পারবোও না।
কিন্তু ওর মনের দিকটা তো আপনার ভেবে দেখা উচিত।
তা হয় না মিঃ চৌধুরী।
কেন হয় না?
তা আপনাকে বোঝাতে পারবো না। এই যে আমার বাড়ি এসে গেছে। আসুন না আজ আমাদের ওখানে?
আজ নয়, আর একদিন আসবো।
অমন অনেকদিন বলেছেন, এসেছেন কোনোদিন। আসুন মিঃ চৌধুরী, এখানে আমার মা আর আমি থাকি। আপনার সঙ্গে পরিচিত হলে মা অনেক খুশি হবেন।
অগত্যা বনহুরকে নামতে হলো। জ্যোছনা রায়কে অনুসরণ করলো বনহুর। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো। ওরা দুজন। জ্যোছনা রায় বললো-আসুন, বসবার ঘরে নয়, একেবারে মায়ের ঘরে।
