আতিয়া স্বয়ং ড্রাইভ করছে। পাশের আসনে বনহুর।
গাড়ি জন মুখর রাজপথ বেয়ে চলেছে।
আতিয়া বললো-কোথায় যাবেন বললেন না যে?
যে কাজ ছিলো এখন গিয়ে আর হবে না, কোথায় যাই ভাবছি।
বড় দুঃখের বিষয় মিঃ চৌধুরী, আপনার কাজটা আমাদের জন্যই হলো না।
আতিয়ার থ্যাবড়া মুখে চিকন সুর বড় বেখাপ্পা লাগছিলো। বনহুর ভেতরে ভেতরে রাগলেও মুখে হাসি টেনে বললো-না না, তেমন জরুরী। কাজ নয়, তা এখন কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো? বাসায় ফিরে যাওয়া যাক, কেমন?
আতিয়া বলে উঠলো-মিঃ চৌধুরী, আপনি এরই মধ্যে ফিরতে চান? কিন্তু কেন?
ভাল লাগছে না।
প্লিজ মিঃ চৌধুরী, চলুন পার্কে যাই।
বনহুর ভীষণ অস্বস্তি বোধ করছিলো, কিন্তু মুখোভাবে তা প্রকাশ না করে ভ্রু কুঁচকে বললো-পার্কে? কিংবা লেকের ধারে?
না!
চলুন না, প্লিজ…
বনহুর গাড়ির মধ্যে যেন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো, বললো সেচলুন যেখানে আপনার মন চায়।
থ্যাঙ্ক ইউ মিঃ চৌধুরী, থ্যাঙ্ক ইউ, নির্জন লেকের ধারেই ভাল লাগবে এখন।
বনহুর কোনো কথা বলে না, নিশ্চুপ বসে থাকে স্থবিরের মত। লেকের ধারে গাড়ি রেখে নেমে পড়লো আতিয়া-আসুন মিঃ চৌধুরী।
আতিয়া বনহুরের হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে বললো-চলুন।
বনহুর সুবোধ বালকের মত গাড়ি থেকে নেমে পড়লো।
আতিয়ার হাতের মুঠায় বনহুরের বলিষ্ঠ হাতখানা ঘেমে উঠলো যেন, একটা মাংসপিণ্ডের মধ্যে তার হাতখানা যেন বসে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
লেকের ধারে এসে দাঁড়ালো আতিয়া-পাশে বনহুর। বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো আতিয়া-কেমন লাগছে আপনার?
আতিয়ার প্রশ্নে বনহুরের সারা শরীর জ্বালা করে উঠলো, দাঁতে দাঁত পিষলো, কিন্তু মুখে হাসি টেনে বললো-স্বপ্নময়, অপূর্ব।
সত্যি মিঃ চৌধুরী, এটা আপনার মনের কথা?
মনের নয়, অন্তরের।
বনহুরের কথায় আতিয়ার চোখ দুটো চক চক করে উঠলো। প্রেমে ঢল ঢল হয়ে পড়লো আতিয়া। বনহুরের হাত ধরে বললো-ঠাট্টা করছেন না তো?..
ছিঃ ঠাট্টা করবো আপনার সঙ্গে, কি যে বলেন!
দেখুন মিঃ চৌধুরী, সবাই আমার উপরের চেহারাটা দেখে ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত করে-কেউ আমার মনের সন্ধান জানে না বা নেয় না। আসুন ওদিকে গিয়ে বসি…..বললো আতিয়া।
বনহুর স্বপ্নগ্রস্তের মত অনুসরণ করলো তাকে। লেকের ধারে একটা নিজন স্থান বেছে নিয়ে বসলো আতিয়া। বনহুরকে হাত ধরে বসিয়ে দেয় নিজের পাশে।
আবেগভরা কণ্ঠে বললো আতিয়া–মিঃ চৌধুরী, ওরা জানে না আমারও হৃদয় আছে, প্রেম-ভালবাসা, স্নেহ-মায়া-মমতা সব আছে…তবু..আমাকে কেউ ভালবাসতে পারে না। কথা বলতে বলতে কণ্ঠ ধরে আসে আতিয়ার!
বনহুরের মনে একটা আঘাত করে। চোখ তুলে তাকায় বনহুর আতিয়ার মুখের দিকে।
আতিয়ার মুখটা বেদনায় আরও বিকৃত দেখাচ্ছে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ওর ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু।
আতিয়া রুমাল দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছে ফেললো, তারপর বললো আবার অনেকেই আমার ঐশ্বর্যের লোভে আমাকে বিয়ে করতে এসেছে কিন্তু আমাকে দেখেই তারা পালিয়ে গেছে। আমি কি ক্ষতি করেছি তাদের, কেন তারা এভাবে চলে যায়…দুহাতে মুখ ঢেকে আবার উচ্ছসিতভাবে কেঁদে ওঠে আতিয়া।
বনহুরের বুকের মধ্যে তখন প্রচণ্ড ঝড় বইছে।
বৈচিত্রময় জীবন বনহুরের। এ বয়সে সে অনেক অবস্থায় পড়েছে। কিন্তু আজকের মত অবস্থা বুঝি তার জীবনে কোনোদিন আসেনি! কি বলবে, কি কি বলে সান্ত্বনা দেবে বনহুর ওকে, ভেবে পায় না।
কান্নার আবেগে আতিয়ার দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
বনহুর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো আতিয়ার দিকে। একটু প্রেমভালবাসা স্নেহ বই তো নয়–ক্ষতি কি, জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে তাকে ছবির জন্য অভিনয় করতে হচ্ছে, আর একটি প্রাণের জন্য সে পারবে না একটু স্বার্থ ত্যাগ করতে? ছবির জন্য তাকে অভিনয় করতে হচ্ছে আর এখানে করতে হবে একটা অবলা নারীকে সান্ত্বনা দেবার জন্য…বনহুর মনস্থির করে নেয়।
বনহুর হাত রাখলো আতিয়ার পিঠে-কাঁদবেন না।
মুহূর্তে আতিয়ার কান্না থেমে গেলো, একটা আনন্দময় মধুর হাসি ফুটে উঠলো তার চোখেমুখে, গদগদ কণ্ঠে বললো-মিঃ চৌধুরী, আপনি কত ভাল!
বনহুর এবার রুমাল দিয়ে আতিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো-মিস আতিয়া, আপনার মনের ব্যথা কেউ না বুঝলেও আমি বুঝতে পেরেছি।
আতিয়া বনহুরের হাতখানা নিবিড়ভাবে টেনে নেয়, গালে-ঠোঁটে ঠেকিয়ে আবেগভরা কণ্ঠে বলে-মিঃ চৌধুরী।
বনহুর নিজের হাতখানা আতিয়ার হাতের মধ্যে ছেড়ে দেয়, ইচ্ছে করেই টেনে নেয় না সে।
দস্যু হলেও বনহুরের হৃদয়ে ছিলো অপরিসীম দয়া। লক্ষ লক্ষ টাকা বনহুর ডাকাতি করে, আবার তেমনি বিলিয়ে দেয় দীন-দুঃখীদের মধ্যে অকাতরে। নরপিশাচ শয়তানদের যেমন সে শত্ৰু, তেমনি অসহায় বিপদগ্রস্তদের সহায়ও। এ দুনিয়ায় এমন কোনো কাজ নেই যা সে পারে না বা করেনি। শুধু একটু ভালবাসা কি আতিয়াকে দিতে পারবে না সে।
আতিয়া এখন অনেকখানি শান্ত স্থির হয়ে এসেছে।
বনহুর বললো এবার চলুন ফেরা যাক।
আতিয়া বললো-আর একটু বসবেন না?
আজ আর নয়।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর।
এবার বনহুর স্বয়ং ড্রাইভ করে চললো।
আতিয়া বসে রইলো বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠভাবে।
বনহুরের দৃষ্টি গাড়ির সম্মুখভাগে, আতিয়া তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে।
