আতিয়াই কথা বললো প্রথম-বসুন। বন থ মেরে গিয়েছিলো, বসবে না দাঁড়িয়ে থাকবে, না আর একবার অন্তপুরে প্রবেশ করে নিজেকে স্বচ্ছ করে আসবে, ভেবে পাচ্ছিলো না।
এমন সময় শুনলো আতিয়ার চিকন বাশির মত সুর-বসুন।
বনহুরের এই বুঝি প্রথম কোনো নারীর সামনে হকচকিয়ে যাওয়া। আসন গ্রহণ করলো বনহুর। কি বলবে বা কি বলে কথা শুরু করবে ভেবে পেলো না। নিজের অজ্ঞাতেই বার কয়েক দৃষ্টি তার চলে গেলো মিস আতিয়ার মুখের দিকে।
সর্বনাশ! এমন মেয়েও জন্মে পৃথিবীতে। বনহুর হাঁপিয়ে উঠছিলো।
আরফান উল্লাহই কথা বললেন-মিঃ চৌধুরী, আপনি বুঝি বাইরে বেরুচ্ছিলেন?
হাঁ, মানে একটু কাজ আছেবাইরে কিনা…বনহুর অবশ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে মিঃ আরফান উল্লাহ ও তাঁর কন্যা মিস আতিয়ার হাত থেকে রেহাই পেতে চেষ্টা করলো।
কিন্তু হলো বিপরীত, আতিয়া আনন্দধ্বনি করে উঠলো-কোথায় যাবেন, চলুন না আমি পৌঁছে দিয়ে আসি।
হাঁ ঠিক বলেছো মা, আর তার যখন বাইরে কাজ আছে তখন তাঁকে আটকে রাখা ঠিক হয় না। তুমি যাও তাঁকে তার গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দিয়ে এসোগে। আর একদিন এসে বসা যাবে।
বনহুর মনে মনে প্রমাদ গুণলো, সবে পরিচয় তাতেই এত-সর্বনাশ হয়েছে এবার! এতদিন পরিচয় না ঘটে ভালই ছিলো।
বনহুর বললো-একটু চা-নাস্তা……
আরফান উল্লাহ বললেন-তা আতিয়া তো কোনোদিন আসেনি। বুঝতেই পারছি, আপনি ছাড়বার পাত্র নন, বেশ, বলুন আনতে।
বনহুর ডাকলো-ইয়াসিন?
নিকটে কোথাও ছিলো ইয়াসিন। ছুটে এসে হাত জুড়ে দাঁড়ালো-সাহেব, আমাকে ডাকতেছেন।
হাঁ, চা-নাস্তা নিয়ে এসো।
ইয়াসিন চলে যাচ্ছিলো, আরফান উল্লাহ বললেন-দেখেশুনে ধীরে সুস্থে চা-নাস্তা তৈরি করে আনবি।
ইয়াসিন মাথা দুলিয়ে বললো-জ্বী আচ্ছা। চলে গেলো সে। আরফান উল্লাহ বললেন-জানেন, আতিয়া যেমন তেমন জিনিস খেতে পারে না। ছিমছাম আর পরিস্কার জিনিস ওর পছন্দ।
হাঁ, তা তাঁকে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি মিঃ উল্লাহ।
কি আর বলবো মিঃ চৌধুরী, এই একটি মাত্র মেয়েই আমার সম্বল-ওর জন্যই সবকিছু।
তা আমি জানি। বললো বনহুর।
জানেন আপনি? হাঁ, আর জানবেনই না বা কেন? সবাই জানে আতিয়া ছাড়া আমার সবকিছু অন্ধকার।
এক মেয়ে যখন তখন তো হবেই।
দেখুন মিঃ চৌধুরী, আতিয়ার সুখের জন্য কি না করেছি।
আমি সব অবগত আছি মিঃ উল্লাহ।
বনহুর কথা যতই সংক্ষিপ্ত করে আনতে চায় ততই আরফান উল্লাহ চান কথা বাড়িয়ে লম্বা করে আনতে ছোটবেলায় মা মরা মেয়ে, কত কষ্ট করেই না মানুষ করেছি! আতিয়া আমার ছেলে-মেয়ে উভয়ই। মেয়েটা আমার লক্ষী-যেমন আদর্শবতী, তেমনি জ্ঞানবতী, রুচিশিলা, দেখছেন না এ বাড়িটা আমার আতিয়ার রুচিমতেই তৈরি করা হয়েছে।
পিতার প্রশংসায় আতিয়া খুশিতে ডগমগ। মুখখাভাবে একটা অহেতুক লজ্জাবোধ ফুটে ওঠে। মাঝে মাঝে শাড়ির আঁচলখানা দাঁতে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছিলো, আসলে সত্যিই ছিড়বার জন্য নয়-লজ্জায়।
বনহুর চোখ তুলে তাকাতেই আতিয়ার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো, ক্ষুদে পিটপিটে আঁখি দুটিতে যেন ঝরে পড়ছে অফুরন্ত প্রেম নিবেদন।
অসহ্য, অসহ্য-বনহুরের দমন বিষিয়ে উঠলো কিছুক্ষণের মধ্যে।
ইয়াসিন আজ যেন একেবারে কুঁড়ে বনে গেছে, চা-নাস্তা আনতে এত বিলম্ব করছে কেন। বনহুর উঠে দাঁড়ালো-দেখি ইয়াসিন এমন দেরী করছে কেন?
আরফান উল্লাহ বলে ওঠেন-আসতে দিন, এত তাড়া কিসের?
আমার একটু শিঘ্র যেতে হবে কি না……
তা আতিয়া আপনাকে পৌঁছে দেবে, মা আতিয়া নিজেই ড্রাইভ জানে..
না, না, তাকে কষ্ট করতে হবে না, আমার ড্রাইভার আছে।
আতিয়া হেসে বললো-এতে আমার কোন কষ্ট হবে না মিঃ চৌধুরী।
হাঁ, বরং আতিয়া এসব কাজে আনন্দ পায়।
বনহুর স্বাভাবিক মানুষ নয়, তার কঠিন মন, কঠিন হৃদয়, অল্পে সে কোনোদিন কাবু হয় না, আজ বনহুর নাচার হয়ে পড়লো যেন। বাপ আর মেয়ের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবার উপায় খুঁজতে লাগলো।
এমন সময় ইয়াসিন ট্রে হাতে কক্ষে প্রবেশ করলো।
আরফান উল্লাহ বললেন-নাও মা, আরম্ভ করো-উনি আবার বাইরে যাবেন….
হাঁ, আরম্ভ করুন মিস আতিয়া।
আপনি নেবেন না?
এইমাত্র ওসব সেরে নিয়েছি।
আরফান উল্লাহ ততক্ষণে খেতে শুরু করেছেন।
আতিয়াও খেতে আরম্ভ করলো।
বনহুর অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো পিতা ও কন্যার মুখের দিকে।
খেতে খেতে বললেন আরফান উল্লাহ-চমক্কার নাস্তা তৈরি করেছিস ইয়াসিন।
ইয়াসিন হাত কচলাতে লাগলো।
বনহুর ততক্ষণে সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চললো।
আরফান উল্লাহ এবার খেতে খেতে বনহুরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন-জানো মা আতিয়া, মিঃ চৌধুরী শুধু দেখতেই অপূর্ব নন, তার অভিনয়ও অদ্ভুত।
কই, একদিনও তুমি আমাকে সুটিং দেখতে আনলে না?
এবার তো মিঃ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হলে, যখন খুশি এসো-উনাকে সঙ্গে করে স্টুডিওতে গিয়ে কত সুটিং দেখবে দেখো..কি বলেন মিঃ চৌধুরী, সত্যি কি না?
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই-কিন্তু আমি তো, মানে সব সময় বাড়ি থেকে সুটিংয়ে যাই না, কখনো বাইরে থেকেই চলে যাই..
বনহুর যতই যা বলুক আরফান উল্লাহ ও আতিয়ার কবল থেকে রক্ষা পাওয়া মুশকিল। •
শেষ পর্যন্ত আতিয়ার গাড়িতে বনহুরকে বেরুতে হলো। কিন্তু যাবে কোথায়? সত্যি বাইরে তো আজ তার কোনো কাজ নেই। বনহুর বেরুচ্ছিলো হয় ক্লাব বা কোনো লেকের ধারে কিংবা পার্কে যাবার জন্য।
