ধন্যবাদ। কিন্তু কবে আসবেন উনি?
সে কথা জানাবার জন্যই আমি এলাম মিঃ চৌধুরী, আপনি তাকে আসার অনুমতি দিলেই সে…..
ছিঃ ছিঃ, কেন আমাকে লজ্জা দিচ্ছেন মিঃ উল্লাহ! তার বাড়ি, তিনি যখন খুশি আসতে পারেন।
থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ। শুনে খুশি হলাম মিঃ চৌধুরী।
বনহুর ইয়াসিনকে ডাকলো-ইয়াসিন?
ইয়াসিন এসে দাঁড়ালো-জ্বী সাহেব। সঙ্গে সঙ্গে আরফান উল্লাহর উপর নজর পড়তেই বিবর্ণ হলো ইয়াসিনের মুখমণ্ডল। লম্বা সালাম ঠকে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালো।
বনহুর বললো-ইয়াসিন, চা-নাস্তা নিয়ে এসো।
আরফান উল্লাহ ব্যস্তকণ্ঠে বলে উঠলেন-মাফ করবেন, এইমাত্র নাস্তা করে এসেছি।
শুধু এক কাপ চা।
তা-ও না।
আচ্ছা, তাহলে উনি…মানে আপনার কন্যা মিস আতিয়াকে কবে কখন নিয়ে আসছেন? আমার এবার একনাগাড়ে কদিন সুটিং আছে কিনা!
এ কদিন কি জ্যোছনা রায়ের সঙ্গেই আপনার কাজ হবে?
সে কথা এখনও মিঃ নাহার আমাকে সঠিক জানাননি।
আচ্ছা। উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন-গুড বাই।
বনহুর একটা সিগারেটে অগ্নিংসযোগ করে অন্তঃপুরের দিকে পা বাড়ালো। ভোর হতে না হতে পর পর দুজন ব্যক্তির আগমন-একজন তার পথ হতে সড়ে দাঁড়াবার জন্য অনুরোধ, অপরজন তাকে কন্যার সঙ্গে পরিচিত করার জন্য আগ্রহশিল।
আজ বনহুরের কোন সুটিং ছিলো না, গোটা দিনটা তার হাতে। বই পড়ে, শুয়ে থেকেও সময় কাটতে চায় না তার। কয়েকবার নূরীর কক্ষে উঁকি দিয়ে দেখেছে বনহুর-নূরী আপন মনে বসে আছে, কখনও বা রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে শূন্য আকাশের দিকে। এত কাছে নূরী, তবু যেন কত দূরে। বনহুরের বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।
বিকেলে বনহুর বাইরে বের হবার জন্য তৈরি হচ্ছে। কাপড় পরা তার হয়ে গেছে, চিরুণী দিয়ে মাথা আঁচড়াচ্ছিল, এমন সময় নূরী এসে দাঁড়ায় তার পাশে।
হঠাৎ পাশে শব্দ শুনে ফিরে তাকায় বনহুর, বিস্ময়ে বলে ওঠে-তুমি!
নূরী আজ এই প্রথম স্বেচ্ছায় এসেছে বনহুরের পাশে।
বনহুর বললো-কিছু বলবে?
নূরীর ঠোঁট দুখানা কেঁপে উঠলো, কিছু বলতে চায় সে।
বনহুর ঝুঁকে পড়লো নূরীর মুখের কাছে-বলো, বলো নূরী? নূরী বনহুরের চোখের দিকে তাকিয়ে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল, বনহুর খপ করে ধরে ফেললো ওর হাতখানা-নূরী যেও না।
ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন আমাকে। নূরী বনহুরের হাতের মুঠা থেকে নিজের হাত দুখানা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগলো।
কিন্তু বনহুরের হাতের মুঠা থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে পারলো।
বনহুর বললো-কি বলতে চাও নূরী, বলো?
নূরী ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো, বললো-আমাকে ছেড়ে দিন।
নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবো, বলল কি বলতে এসেছিলে তুমি?
আপনি চলে গেলে একা একা আমার বড্ড খারাপ লাগে।
নুরী!
বনহুর খুশির আবেগে নুরীকে টেনে নিলো কাছে। এই প্রথম নূরীর মুখে স্বাভাবিক স্বর শুনতে পেলো। আবেগভরা কণ্ঠে বললো বনহুর নূরী, নূরী…আমার নূরী। বনহুর নূরীকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেললো।
নূরী বনহুরের বাহুবন্ধনে ঘেমে উঠলো।
পালাবার জন্য অস্থির হয়ে পড়লো সে।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে মোটরের হর্ন বেজে উঠলো। পরক্ষণেই ইয়াসিনের কণ্ঠস্বর-সাহেব, সাহেব, মালিক আইসেছেন-মালিকের মাইয়াও আইসেছেন।
বনহুর নূরীকে মুক্ত করে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
নূরী ছাড়া পেয়ে দ্রুত পালিয়ে গেলো সেখান থেকে। বনহুর বেরিয়ে এলো কক্ষ থেকে।
ইয়াসিন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো, বললো-বসবার ঘরে তারা বইছেন।
বনহুর এগিয়ে গেলো ড্রইংরুমের দিকে।
কক্ষে প্রবেশ করার পূর্বে টাইটা ঠিক করে নিলো বনহুর।
আরফান উল্লাহ এসেছেন তার কন্যা আতিয়াকে নিয়ে পরিচয় করাতে। কিন্তু আজ কতদিন হলো এসেছে সে এই বাড়িতে-কই, আতিয়া তো একদিনও এলো না, অথচ আরফান উল্লাহ কন্যার গল্পে পঞ্চমুখ-সে নাকি তার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহশিল!
বনহুরও কম আগ্রহান্বিত নয় আতিয়ার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য।
যার এত আছে, বাড়ি-গাড়ি, নিজস্ব স্টুডিও, ইণ্ডাস্ট্রি আরও কত কি, না জানি সে কেমন!
যে বাড়িটাতে বনহুর এখনও বসবাস করছে, সে বাড়িও তো তার। বাড়িটার সৌন্দর্য বনহুরকে মুগ্ধ করেছিলো। বনহুর কল্পনায় বাড়ির অধিনায়িকার যে ছবি মনের পর্দায় এঁকে রেখেছিলো তা মনোমুগ্ধকর এক নারীর।
এ বাড়িতে আসবার পর হতে বনহুরের ইচ্ছা বাড়ির অধিনায়িকার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, কিন্তু আরফান উল্লাহ কেন যে তার কন্যাকে এতদিনেও আনলেন না এবং তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন না বুঝতে পারে না কস্তু।
আজ বনহুর অত্যন্ত আগ্রহশিল হয়ে প্রবেশ করলো ড্রইংরুমে।
রুমে প্রবেশ করেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো বনহুর। সম্মুখস্থ সোফায় বসে আছেন আরফান উল্লাহ, পাশে একটা তরুণী-পিপে বা তেলের জালা বললেও ভুল হবে না! তরুণীর গায়ের রঙ আবলুসের মত কালো। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, মেমদের মত বক করে ছাটা।
বহুর প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললো-হ্যালো মিঃ উল্লাহ?
আরফান উল্লাহ হেসে বললেন-মিঃ চৌধুরী, এ আমার কন্যা মিস আতিয়া। আর উনি মিঃ চৌধুরী।
বনহু হাত তুলে বললো-আদাব! আতিয়া হাসলো একটু, যেন মেঘের কোলে বিদ্যুৎ চমকালো।
বনহুর জীবনে বহু নারীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছে, কিন্তু মিস আতিয়ার মত নারী সে কোনোদিন দেখেছে কিনা সন্দেহ।
