ভীতা হরিণীর মত লঘু পদক্ষেপে পা পা করে এগিয়ে এলো সে বনহুরের বিছানার পাশে।
মেঝেতে পড়ে থাকা বনহুরের স্লিপিং গাউনখানা স্পর্শ করতেই নূরীর সমস্ত শরীরে একটা অভূতপূর্ব শিহরণ জাগলো। বুকে চেপে ধরে-মুখে গালে লাগালো। তারপর তুলে রাখলো আলনায়।
খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপলক নয়নে তাকিয়ে রইলো বনহুরের মুখের দিকে।
মনের মধ্যে আশঙ্কা জাগলো নূরীর, হঠাৎ যদি জেগে ওঠে-তখন কি হবে, পালাবার পথ পাবে না সে।–যেমন মন্থর গতিতে এসেছিলো তেমনি তাড়াতাড়ি চুপি চুপি বেরিয়ে গেলো নূরী।
আজ একটু বেলা করে ঘুম ভাঙলো বনহুরের। ইয়াসিন অনেকক্ষণ চা টেবিলে রেখে শিয়রে দাঁড়িয়েছিলো। বার দুই ডেকেও ছিলো সে, কিন্তু ঘুম ভাঙলো না বনহুরের।
গোটা রাত অনিদ্রায় কাটিয়ে ভোরের দিকে ঘুমিয়েছিলো, তাই জাগতে এত বেলা হয়েছিলো।
ঘুম ভাঙতেই বললো ইয়াসিন-সাহেব, একজন ভদ্রলোক আপনাগো লগে দেখা করতে আইছেন।
চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে থেমে পড়লো বনহুর, বললো-কোথায় তিনি?
বসবার ঘরে বইসেছেন।
আচ্ছা, চলো দেখি। চা
যে ঠাণ্ডা অইয়া যাইবো?
হতে দাও। বনহুর শয্যা ত্যাগ করে নেমে দাঁড়ালো, স্লিপিং গাউনটার দিকে হাত বাড়াতেই মনে পড়লো, ওটা কাল মেঝেতে পড়েছিলো-আলনায় রাখলো কে? তবে কি ইয়াসিন ওটা উঠিয়ে রেখেছে? স্লিপিং গাউনটা হাতে নিয়ে পরতে পরতে বললো বনহুর-ইয়াসিন, এটা তুমি উঠিয়ে রেখেছিলে?
মাথা চুলকে বলে ইয়াসিন-না সাহেব, ওটা আলনাতেই ছিলো।
বনহুর আর কোনো কথা না বলে একটু অন্যমনস্কভাবে কি যেন ভাবলো, তারপর বললো-দুকাপ চা ড্রইংরুমে পাঠিয়ে দিও।
আচ্ছা সাহেব।
বনহুর ড্রইংরুমে প্রবেশ করতেই অবাক হলো, অরুণ কুমার সেন বসে আছে তার প্রতীক্ষায়।
বনহুর আদাব জানালো।
অরুণ কুমার বনহুরের আদাব গ্রহণ না করেই বললো-মিঃ চৌধুরী, আপনাকে সকাল বেলা বিরক্ত করলাম, করতে বাধ্য হলাম।
হেসে আসন গ্রহণ করলো বনহুর। বললো-হঠাৎ কি মনে করে এলেন। মিঃ সেন?
অরুণ কুমার গম্ভীর মুখে বসে ছিলো, গম্ভীর কণ্ঠেই বললো–একটা কথা আছে আপনার সঙ্গে।
বলুন? প্রশ্নভরা দৃষ্টি মেলে তাকালো বনহুর অরুণ কুমারের মুখের দিকে।
অরুণ কুমার কক্ষে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললো-মিঃ চৌধুরী, আপনি নিশ্চয়ই জ্ঞানী, বুদ্ধিমান…..
বনহুর বললো-ভূমিকার দরকার নেই, বলুন?
বনহুরের কথায় অরুণ কুমারের মুখমণ্ডল মুহূর্তে রাঙা হয়ে পরক্ষণেই স্বাভাবিক হলো। ভ্রূকুঞ্চিত করে বললো সে-আপনি জানেন আমি. মিস রায়কে ভালবাসি।
বনহুরের মুখখাভাবে কিছুমাত্র পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো না। স্বচ্ছকণ্ঠে বলে সে-এ কথা শোনাবার জন্যই কি আপনি…..
হাঁ মিঃ চৌধুরী, শুধু এ কথা শোনাবার জন্যই আমি এই সাত সকালে ছুটে এসেছি। জানি আপনি সারাদিন ব্যস্ত থাকেন, অন্য সময় আপনাকে পাওয়া মুশকিল, তাই….।
তাই আপনি অনুগ্রহ করে এসেছেন মিস রায়কে ভালোবাসেন কথাটা জানাতে!
হাঁ তাই। অরুণ কুমারের মুখমণ্ডল অমাবস্যার রাতের মত অন্ধকার হয়ে
কাজেই আমি যেন আপনার পথে বাধার সৃষ্টি না করি, তাই না? বললো বনহুর।
এমন সময় ইয়াসিন ট্রে হাতে কক্ষে প্রবেশ করলো।
ট্রে টেবিলে নামিয়ে রাখতেই বনহুর এক কাপ চা অরুণ কুমারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো-নিন।
চা আমি খাই না। বললো অরুণ কুমার।
বনহুর একটা কাপ হাতে উঠিয়ে নিতে নিতে মুখ নীচু করে একটু হাসলো। তারপর কাপে চুমুক দিয়ে বললো-ভয় নেই, আপনার চলার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবো না।
ধন্যবাদ। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো অরুণ কুমার।
বনহুর কিছু বলবার পূর্বেই কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো সে। পরক্ষণেই বাইরে মোটর স্টার্টের শব্দ হলো।
বনহুর আপন মনেই হেসে উঠলো-হাঃ হাঃ হাঃ, হাঃ হাঃ হাঃ…
ইয়াসিন সে হাসির শব্দে ছুটে এলো।
নূরীও ঘরে বসে সে হাসির শব্দ শুনতে পেলো, চমকে উঠলো সে।
বনহুরের হাসি শেষ হতেই কক্ষে প্রবেশ করলেন প্রযোজক আরফান উল্লাহ-গুড মনিং মিঃ চৌধুরী!
বনহুরের হাসির রেশ তখনও ড্রইংরুমের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আরফান উল্লাহকে দেখে জবাব দিলো-গুড মর্নিং, আসুন!
আরফান উল্লাহ তাঁর বিরাট বপু নিয়ে এগিয়ে এসে একটা সোফায় বালির বস্তার মত ধপ করে বসে পড়লেন।
বনহুর উঠে দাঁড়িয়েছিলো, পুনরায় আসন গ্রহণ করলো। একটা প্রশ্ন উঁকি দিলো বনহুরের মনে। রাতেই দেখা হয়েছে তার সঙ্গে, তাছাড়া স্বয়ং আরফান উল্লাহই তাকে পৌঁছে দিয়ে গেছেন অথচ ভোরেই আবার এমন কি প্রয়োজন যার জন্য তিনি ছুটে এসেছেন তার কাছে।
বনহুর লোকমুখে শুনেছে, নিজেও গোপন অনুসন্ধান নিয়ে জেনেছেআরফান উল্লাহ শুধু এক চলচ্চিত্র ব্যবসা নিয়েই থাকেন না, তার আরও বিভিন্ন কারবার আছে। শুধু ছবিই তাঁকে লাখ লাখ টাকা এনে দেয় না, এমন কিছু গোপনীয় ব্যবসা তিনি করেন, যা তাঁকে অগাধ ঐশ্বর্যের অধিকারী করেছে।
আরফান উল্লাহ আসন গ্রহণ করে বললেন-আমার কন্যা মিস্ আতিয়া আজ আপনার এখানে আসবে।
কথাটা শুনে মনে মনে বিরক্তি বোধ করলেও মুখোভাব প্রসন্ন রেখে বললো বনহুর-আমার পরম সৌভাগ্য মিঃ উল্লাহ। কিন্তু উনি কষ্ট করে না এসে, বরং আমিই….।
ভেবে দেখলাম তা হয় না, আপনি আমাদের সম্মানিত অতিথি, কাজেই আতিয়া নিজেই আসবে আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে।
