বনহুর আর জ্যোছনা রায়ের যখন কথা হচ্ছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষের শার্শির ফাঁকে দুটো চোখ ভেসে উঠে মিলিয়ে গিয়েছিল।
বনহুর চিনতে পারেনি। তার চিনতে পারাও অসম্ভব ছিলো। কারণ শুধুমাত্র দুটো চোখই সে দেখতে পেরেছিলো।
আরও কয়েকবার বনহুর এই চোখ দুটি দেখেছে।
যখনই জ্যোছনা তার কাছে এসেছে তখনই বনহুর লক্ষ্য করেছে কে যেন তাদেরকে দেখছে।
কিন্তু কে সে? যার দৃষ্টি জ্যোছনা রায় ও তার মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রাচীর সৃষ্টি করেছে?— এ চোখ দুটো শুধু বনহুরই লক্ষ্য করেছে, জ্যোছনা রায় বিন্দুমাত্র টের পায়নি।
বনহুর জ্যোছনা রায়কে ইচ্ছা করেই বলেনি কথাটা। কিন্তু সে নিজে সব সময় সংযত রয়েছে, জ্যোছনা রায় তার পাশে এলেই বনহুর তাকে নিজের কাছ থেকে দূরে রেখেছে-কিছু বলতে গেলে কথার মোড় অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে সাবধান হয়েছে কিন্তু কোন্ অদৃশ্য ব্যক্তির এ চোখ দুটি!
শুনেছিলো বনহুর-চিত্রনায়ক অরুণ সেন গভীরভাবে ভালবাসতো জ্যোছনা রায়কে–তবে কি–
বনহুর চুলে আঙ্গুল চালাতে লাগলো। যেন অস্বস্তি বোধ করছে সে। না, আর ওসব কথা ভেবে মন চঞ্চল করবে না। চোখ বন্ধ করলো বনহু, ঘুমাবে এবার। কিছুক্ষণ নিপ পড়ে রইলো, কিন্তু ঘুম এলো না তার চোখে। এপাশ ওপাশ করতে লাগলো বনহুর। তারপর হঠাৎ শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো, স্লিপিং গাউনটা আলনা থেকে টেনে পরে নিলো গায়ে। কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে পায়চারী করলো সে। কক্ষের মাঝের দরজার দিকে তাকালো। ওপাশে নূরীর কক্ষ।
কখন যে সে নূরীর বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বনহুর নিজেই
খেয়াল করতে পারেনি।
কক্ষে. ডিমলাইট জ্বলছিলো, বনহুর নির্নিশেষ নয়নে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে। তারপর সাবধানে আলগোছে হাত রাখলো নূরীর কপালে।
সঙ্গে সঙ্গে নূরীর ঘুম ছুটে গেলো, চমকে উঠে বসলো বিছানায়। সম্মুখে তাকিয়ে ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো সে আপনি!
বনহুর সোজা হয়ে দাঁড়ালো, কোনো কথা বললো না।
নূরী রাগে ফোঁস করে উঠলো-শুধু আজ নয়, আরও কয়েক দিন আপনি কথা শেষ করতে পারে না নূরী।
বনহুর নূরীর পাশে বসে পড়ে, ওর দক্ষিণ হাতখানা মুঠোয় চেপে ধরে অবেগভরা কণ্ঠে বলে-নূরী!
আমি বলছি আমি নূরী নই, আপনি ভুল করছেন।
নূরী, তুমি কি হয়ে গেছে! আজও তুমি আমাকে চিনতে পারলে না! নূরী তাকিয়ে দেখো, ভাল করে তাকিয়ে দেখো আমার মুখের দিকে।
না, কোনো কথাই আমার স্মরণ হচ্ছে না। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে রেহাই দিন–
এবার বনহুর রাগতকণ্ঠে বললো-নূরী, কি চাও তুমি?
আমাকে বিদায় দিন, যেদিকে আমার দুচোখ যায় চলে যাবো।
গর্জে উঠলো বনহুর-নূরী!
শিউরে উঠলো নূরী। বনহুরের গম্ভীর কঠিন কষ্ঠে নূরীর বুক কেঁপে উঠলো।
বনহুরের নিশ্বাস দ্রুত বইছে, দৃষ্টিতে ঝরে পড়ছে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
বনহুরের এ রুদ্রমূর্তি দেখে নূরী ভীষণ ভয় পেয়ে গেলো, বুকটা ওর ধকধক করতে লাগলো। এতদিনের মধ্যে নূরী কোনোদিন বনহুরকে এমনভাবে রাগান্বিত হতে দেখেনি।
বনহুরের হাতের মুঠায় হাত দুখানা যেন নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছিলো, খুব কষ্ট হচ্ছিলো নূরীর।
গম্ভীর স্থিরকণ্ঠে বললো বনহুর-আজ আমি নিঃসহায় সঙ্গীহীন–তুমি–তুমি–কি হলো তোমার! বেশ, আর তোমাকে বিরক্ত করবো না-বনহুর নুরীকে ছেড়ে দিয়ে নিজের কক্ষে ফিরে যায়। স্লিপিং গাউনটা খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় দূরে মেঝেতে। তারপর ধপ করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। দুহাতে নিজের মাথার চুল টানতে লাগলো, একি হলো নূরীর! তার সম্বিৎ কোনোদিন কি আর ফিরে আসবে না? নূরীকে বনহুর গভীরভাবে ভালবাসে-যেমন বাসে মনিরাকে।
অসহ্য একটা ব্যথা গুমড়ে কেঁদে ফিরতে লাগলো বনহুরের মনে, কিন্তু কোনো উপায় নেই–নূরী আজ সম্বিৎহারা।
বনহুর চলে আসতেই নূরী সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিলো।
চমকে উঠলো বনহুর। দরজাটা যেন তার বুকের পাজরে ধাক্কা মারলো।
এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো বনহুর।
সুন্দর দীপ্ত মুখমন্ডলে তখনও ফুটে রয়েছে গভীর চিন্তার সুস্পষ্ট ছাপ।
ওদিকে দরজা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসলো নূরী। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় লাল হয়ে উঠছে ওর চোখ দুটো। কেমন যেন এলোমেলো লাগছে সব ওর কাছে। অনেক ভেবে আজও নূরী স্মরণ করতে পারেনি-কে এই যুবক, যে তার জন্য মরণের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে উদ্ধার করে এনেছে। সত্যিই কি তার পরিচিত লোক ঐ যুবক? কিন্তু কই, মনে পড়ে না তো, ওকে কোথাও কোন সময় দেখেছে বা পরিচয় ছিলো তার সঙ্গে।
বেশি ভাবতে গেলেই নূরীর মাথা টনটন করে ওঠে। সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।
খুব ভোরে শয্যা ত্যাগ করলো নূরী। গত রাতের কথা স্মরণ হলো। যুবকটার জন্য মনটা হঠাৎ চিন্তিত হয়ে পড়লো। বনহুরকে চিনতে না পারলেও ওর জন্য মায়া হলো নূরীর। কিন্তু কেমন যেন সহ্য করতে পারতো
সে ওকে। দূর থেকেই নূরী বনহুরকে দেখতো, সুন্দর লাগতো ওকে। ভালো লাগতো, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো, কেবল সে কাছে এলে তার বুক কেমন যেন দুরু দুরু করে কাঁপতো। নূরী কোনো সময় নিজে বনহুরের কাছে যেতো না বা কথা বলতো না। একজন অপরিচিত যুবকের সঙ্গে কি কথা বলবে সে।
গত রাতের কথা মনে করে নূরীর অনুশোচনা হলো। ব্যথার খোঁচা লাগলো মনের কোণে। দরজা খুলে এ ঘরে প্রবেশ করলো নূরী। তাকিয়ে দেখলো, দুগ্ধফেনিল শুভ্র বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে বনহুর।
