পথে গাড়িতে বসে অনেক কথা হলো আরফানউল্লাহর সঙ্গে বনহুরের। আরফানউল্লাহ বললেন তার মত একজন সুদর্শন যুবককে তাঁর ছবির নায়ক হিসেবে পেয়ে অনেক খুশি হয়েছেন তিনি। অনেকদিন থেকে তিনি এমনি একটা ছেলেকে খুঁজছিলেন—এ কথাটাই বারবার বললেন আরফানউল্লাহ। অদৃষ্ট প্রসন্নতাই পেয়েছেন নাকি তাকে। আরও বললেন, একদিন তার বাড়িতে বনহুরকে নিয়ে যাবেন। আতিয়া নাকি তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী।
বনহুর এ কথায় বলেছিলো, তার বাড়িতেই রয়েছি, অথচ আজও তার সাথে পর্যন্ত দেখা হলো না। আমারই কি কম আগ্রহ তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার! নিশ্চয়ই যাবো–কথা দিয়েছে বনহুর।
বাসায় ফিরে সর্বাগ্রে নূরীর কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর।
খাটের উপর অঘোরে ঘুমাচ্ছে নূরী।
যে মেয়েটাকে নূরীর দেখাশোনার জন্য রেখেছে বনহুর সে তখনও জেগে ছিলো, বনহুর ফিরে আসতেই সে বললো–আমি এবার যাই হুজুর।
বনহুর বললো-তুমি ঘুমাওনি?
না হুজুর।
বেশ যাও, ঘুমাওগে।
মেয়েটা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো নিজের কক্ষের দিকে।
নিজের অজ্ঞাতে নূরীর ঘুমন্ত মুখের দিকে বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো আবার। কিছুক্ষণ নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে রইলো বনহুর তার মুখের দিকে।
হঠাৎ ইয়াসিনের কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে এলো বনহুরেরসাহেব, টেবিলে আপনাগো খাবার দেওয়া অইছে।
কে, ইয়াসিন?
দরজার বাইরে থেকে আবার শোনা গেলো ইয়াসিনের কণ্ঠস্বর–হ সাহেব, আমি ইয়াসিন। টেবিলে খাবার দেওয়া অইছে।
আচ্ছা আসছি। বনহুর কথাটা বলে নিজের কক্ষে ফিরে আসে। জামাকাপড় ছেড়ে বাথরুমে প্রবেশ করে বনহুর।
অনেকক্ষণ ধরে ঠাণ্ডা পানিতে হাতমুখ ঘোয়। এখন বেশ স্বস্তি বোধ করছে সে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসে সে।
ইয়াসিন জড়োসড়োভাবে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
খেতে খেতে বললো বনহুর-ইয়াসিন, তুমি ঘুমাওনি?
না সাহেব, আপনি না খাইলে আমি কি ঘুমাইতে পারি?
সত্যি, তুমি খুব ভাল।
কিন্তু বাড়ির মালিক কন, আমি নাকি একেবারে অকেজো।
না না, ঠাট্টা করে ওকথা তোমাকে বলেন তিনি। আচ্ছা, ইয়াসিন?
কন হুজুর!
তুমি কতদিন হয় আছে এখানে?
তা সায়েব বছর বিশ-একুশ অইব—
ওঃ তুমি তো তাহলে খুব পুরোনো লোক।
সাহেবের মাইয়ার যখন সাত বছর বয়স তখন আমি আইছি।
এখন বুঝি সাহেবের মেয়ে খুব বড় হয়েছে?
কার কথা কইছেন, আতিয়া আপার কথা?
হাঁ।
মস্ত বড়, আপনাগো দুইডা অইব।
তাই নাকি?
হ।
এমনি নানা কথাবার্তার মধ্য দিয়ে বনহুরের খাওয়া শেষ হলো।
কিন্তু বিছানায় শুয়ে কিছুতেই দুচোখ বন্ধ করতে পারলো না সে। ঘুম পেলে জোর করে তো ঘুমানো যায় না। বিছানায় ছটফট করলো কিছুক্ষণ। তারপর উঠে বসলো—কি যেন ভাবলো, আবার বালিশটা আঁকড়ে ধরে শুয়ে পড়লো। আজকের ঘটনাগুলো ভেসে উঠলো তার মনের পর্দায়। সুটিংয়ের অবসরে যখন বনহুর বিশ্রামকক্ষে একটা সোফায় বসে সিগারেট পান করছিলো, তখন জ্যোছনা রায় প্রবেশ করলো সেই কক্ষে।
এ কক্ষটা শুধু নায়কের বিশ্রামের জন্যই নির্দিষ্ট করা।
বনহুর পদশব্দে ফিরে তাকাতেই অবাক হলো।
অসময়ে তার কক্ষে জ্যোছনা রায়কে দেখে উঠে দাঁড়ালো বনহুর। কিছু পূবেই জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে বাসর কক্ষের একটা দৃশ্যের শুটিং হয়েছে। এখনও জ্যোছনা রায়ের দেহে নববধুর ড্রেস শোভা পাচ্ছে। মেকআপের উপর চন্দনের ফোটাগুলো বড় সুন্দর লাগছিলো।
বনহুর হেসে অভ্যার্থন জানালো—আসুন মিস রায়।
সুন নয়, এসো বলুন-যেমন একটু আগে বলেছিলেন।
তাহলে আপনি খুশি হবেন মিস রায়?
খুব খুশি হবো। জ্যোছনা রায় বসে পড়লো একটা সোফায়।
বনহুর তখনও দাঁড়িয়ে। সিগারেট থেকে একরাশ ধোঁয়া নির্গত করে বললো—এখানে আপনি?
গোটা রাত কাজ আছে, ভাল লাগছে না।
বনহুর একটু হাসলো। আজ কয়েকদিন হলো সে লক্ষ্য করেছে—জ্যোছনা রায় তার সঙ্গে যখন কাজ করে তখন তার মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা দেয়। চোখে মুখে ফুটে ওঠে একটা উচ্ছসিত ভাব, যা অতি চেষ্টা করেও গোপন রাখতে সক্ষম হয় না জ্যোছনা রায়। বনহুরের সঙ্গই যেন তার কামনা। তবে কি জ্যোছনা রায় তাকে ভালবেসে ফেলেছে!–বনহুরের ললাট কুঞ্চিত হয়ে উঠলো।
স্টুডিওর সবাই বনহুরকে মকছুদ চৌধুরীর পরিবর্তে শুধু মিঃ চৌধুরী বলে সম্বোধন করতো।
জ্যোছনা রায়ের কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় বনহুর, বলে সে-অস্বস্তি বোধ করছেন না তো! বলুন তাহলে ডাক্তার ডাকি।
না না, অসুস্থ নয়–কিছু বলতে গিয়ে জ্যোছনা রায় থেমে গেলো।
বনহুর বুঝতে পেরেছে, তবু না বোঝার ভান করে বললো–এ ড্রেসে বুঝি আপনার কাজ আছে আরও?
হাঁ।
কার সঙ্গে?
বিশু রায়ের সঙ্গে।
একটু থেমে বললো জ্যোছনা রায়-মিঃ চৌধুরী, আপনি কি এখনই চলে যাবেন?
আমার কাজ যখন শেষ হয়েছে তখন আর রাত জেগে কি হবে বলুন?
জ্যোছনা রায়ের মুখমণ্ডল মলিন হয়ে উঠলো, উঠে দাঁড়ালো সে-চলি, গুড নাইট।
বনহুর তাকালো জ্যোছনা রায়ের দিকে সে মুখে বনহুর দেখতে পেলো একটা ব্যথারুণ আভাস। কি বলতে এসেছিলো জ্যোছনা রায়, যা সে বলতে চেয়েও বললো না।
বাড়ি ফিরে আসার পর বারবার জ্যোছনা রায়ের কথাই মনে পড়ছে বনহুরের। স্টুডিওতে আর একটা ব্যাপার বিশেষভাবে তার দৃষ্টিতে পড়েছিলো এবং সেই কারণেই বনহুর জ্যোছনা রায়ের মনের কথা জানার বাসনা থাকলেও এড়িয়ে গেছে সাভাবে।
