নাহার চৌধুরী অনুনয়ের সুরে বললো আপনি আমাকে বাঁচান মিঃ মকছুদ।
বনহুর সম্বিৎ ফিরে পেলো, বললেন—আমি তো অভিনয় জানিনা।
বনহুরের কথায় নাহার চৌধুরীর দুচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বনহুরের নরম সুরে তিনি যেন ভরসা পেলেন খুজে। আনন্দ ভরা কণ্ঠে বললেনআপনি শুধু রাজি হলে আমরা কৃতার্থ। অভিনয় আপনাকে জানতে হবেনা, যা করতে হয় আমি সব শিখিয়ে নেবো!
বেশ রাজি।
নাহার চৌধুরী আর একবার বনহুরকে জড়িয়ে ধরলেন আনন্দের আতিশয্যে।
অনন্ত বাবুর চোখমুখেও খুশীর উচ্ছ্বাস, তিনি এতোক্ষণ গম্ভীর মুখে প্রতীক্ষা করছিলেন মিঃ মকসুদ রাজি হন কি না। অনন্ত বাবুই নাহার চৌধুরীকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, অরুণ বাবু কাজ করতে চান না বেশ ভাল কথা। দেখুন যদি মিঃ মকছুদ সাহেবকে রাজি করাতে পারেন…..
বাস্-কথাটা নাহার চৌধুরীর মনে লেগে গিয়েছিলো। তিনিও অন্তরে অন্তরে এমনি চিন্তাই করছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেননি। অনন্ত বাবু। কথাটা বলায় তার মনে একটা উদ্যম বাসনা ছাড়া নিয়ে উঠেছিলো, তিনি খুশী হয়েছিলেন খুব। এবং কথাটা ছবির নায়িকা, জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে আলাপ করে আরও আনন্দিত হয়েছিলেন।
জ্যোছনা রায় বলেছিলো—অরুণ কুমার বাবু যদি কাজ না করতে চান তবে তাকে দিয়ে জোর করে কাজ আদায় করা যাবে না। এতে ছবি হতে পারে কিন্তু ছবির মধ্যে কোন আন্তরিকতা থাকবে না। শেষ পর্যন্ত ছবি হিট না-ও করতে পারে। মিঃ মকছুদ সাহেব যদি রাজি হন তবে কোন কথা নেই।
নাহার চৌধুরীর মন খুশীতে ভরে উঠেছিলো। তিনি জ্যোছনা রায় সহ, তাই মিঃ মকছুদের পাশে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন।
বনহুর রাজি হওয়ায় জ্যোছনা রায়ের মুখমণ্ডল দীপ্তময় হয়ে উঠলো।
বনহুর ওর দিকে চাইতে হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানালো জ্যোছনা রায়।
১৪.
বৈকালে নির্জন শান্ত পরিবেশে ডেকে দাঁড়িয়েছিলো বনহুর। ফুরফুরে হওয়ায় বনহুরের কোঁকড়ানো চুলগুলি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। বনহুর বারবার হাত দিয়ে চুলগুলি পিছনে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছিলো। দক্ষিণ হস্তে ধুমায়িত সিগারেট।
জ্যোছনা রায় এসে দাঁড়ালো বনহুরের পাশে হ্যালো মিঃ মকছুদ।
ফিরে তাকালো বনহুর, স্মিত হাসি হেসে বললো—আসুন।
জ্যোছনা রায় এক থোকা রজনী গন্ধার মত বনহুরের পাশে এসে দাঁড়ালো, সুমধুর কণ্ঠস্বরে বললো–আপনার বোন কোথায়?
বললো বনহুর-ক্যাবিনে।
এই সুন্দর বৈকালে ক্যাবিনের অন্ধকারে? আশ্চর্য মেয়ে সত্যি আপনার বোনটা। কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলতে চান না।
হাঁ, আগে ঠিক অমন ছিলোনা, জাহাজডুবির পর থেকে ওর কি যেন হয়েছে—কারো সঙ্গে মিশতে বা কথা বলতে চায় না। এমন কি আমার সঙ্গেও ঠিকভাবে কথাবার্তা বলে না।
জ্যোছনা রায় বললো সত্যি বড় দুঃখের কথা! নিশ্চয়ই ব্রেনে কোন গোলযোগ হয়েছে।
হাঁ, আমারও তাই মনে হয়।
ওকে ঠিকভাবে চিকিৎসা করা দরকার।
শহরে পৌঁছে ওর চিকিৎসা ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে।
কিছুক্ষণ উভয়ে নীরবে কাটে।
জ্যোছনা রায়ের দেহে আজ ফিকে গোলাপী শাড়ী! ব্লাউজটাও ঠিক শাড়ীর রঙ-ফিকে গোলাপী। একরাশ কালো কোঁকড়ানো চুল মাথায় উপরে চূড়ো করে বাধা। একটা গোলাপ ফুল গোজা রয়েছে চূড়োর বাম পাশে। ফুলটা অবশ্য সত্যি গোলাপ নয়, প্লাষ্টিকের ফুল। কিন্তু দেখলে কেউ ভাবতে পারবে না ওটা নকল ফুল। একেবারে যেন সদ্য গাছ থেকে তুলে আনা গোলাপ ওটা। পায়ের জুতোও গোলাপী, ভ্যানিটি ও রুমালখানাও সে শাড়ীর সঙ্গে ম্যাচ করে পরেছে। তার দুধে আলতা মেশানো দেহটার সঙ্গে মিশে গেছে যেন এসব। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে জ্যোছনা রায়কে আজ।
অভিনেত্রী জ্যোছনা রায় শুধু সুন্দরীই নয়। তার মিষ্টি হাসিটুকু দর্শকগণকে উন্মাদ করে তোলে। জ্যোছনা রায় যে ছবিতে থাকে সে ছবি হিট না করে যায় না। সমস্ত দেশজোড়া নাম জ্যোছনা রায়ের। জ্যোছনা রায়কে না দেখলে দর্শকমণ্ডলীর প্রাণই যেন ভরে না।
সেই সুন্দরী অভিনেত্রী জ্যোছনা রায় এসে দাঁড়িয়েছে বনহুরের পাশে। সেন্টের একটা সুমিষ্ট গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চার ধারে। সদ্য ফোটা গোলাপ ফুলের সুবাসের মত। বনহুর চট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না। তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ নয়নে।
মৃদু হেসে বললো জ্যোছনা রায়–কি দেখছেন?
অপূর্ব।
কি?
আপনি।
বনহুরের মুখে এই কথাটা শুনবার জন্যই যেন জ্যোছনা উন্মুখ হৃদয় নিয়ে প্রতিক্ষা করছিলো। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো যে সে। দৃষ্টি নত করে নিয়ে বললো জ্যোছনা রায় –বেশী বাড়িয়ে বলছেন।
মোটেই না। মিস রায়, সত্যি আপনি অপূর্ব।
যাক ওসব বাজে কথা।
এটা যদি বাজে কথা হয় তবে কোনটা কাজের কথা, বলুন?
সত্যি, আপনি আমার বিপরীতে কাজ করবেন জেনে অনেক খুশী হয়েছি। ধন্যবাদ জানাতে এলাম আপনাকে।
ও? এই কথা? হাঁ, আপনার ধন্যবাদটুকু, এখনও পাইনি। কিন্তু এখন তো আপনারা খুব ধন্যবাদ দিচ্ছেন, যখন দেখবেন ক্যামেরার সম্মুখে দাঁড়িয়ে একেবারে সব গোল পাকিয়ে দেবো তখন হবে মজা। কথা শেষ করে হেসে উঠলো বনহুর।
জ্যোছনা রায় বনহুরের হাস্য উজ্জ্বল দীপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো নিষ্পলক নয়নে।
১.১৫ চিত্রনায়ক দস্যু বনহুর
০১.
স্টুডিও থেকে ফিরতে রাত প্রায় দুটো বেজে গেলো বনহুরের। স্বয়ং প্রযোজক তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। সেদিনের সেটে ভিলেন বিশু রায়ের সঙ্গে জ্যোছনা রায়ের কাজ ছিলো, কাজেই পরিচালক নাহার চৌধুরী আসতে পারলেন না। সুটিং শেষ হতে ভোর হয়ে যেতে পারে। কাজেই বনহুরের কাজ হয়ে যেতেই আর বিলম্ব না করে বাসায় ফিরে এলো সে।
