কুন্তিবাঈ এর নায়িকা জ্যোছনা রায় ও তার সহচরী অনেক যুবতীই ছিলো এই জাহাজে, কাজেই নূরীকে পেয়ে তারা খুশীই হলো।
বনহুর যখন বাথরুম থেকে বের হলো তখন তাকে রাজ পুত্রের মতই সুন্দর লাগছিলো।
পরিচালক নাহার চৌধুরী জড়িয়ে ধরলেন বনহুরকে, বনহুরের অপরূপ সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে ফেললো।
এতোক্ষণ বনহুরের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি গোঁফ থাকায় তার সত্যিকারের রূপ, ঢাকা পড়েছিলো, এখন সেভ করে নতুন পোষাক পরায় তাকে অপরূপ দেখাচ্ছে।
কুন্তিবাঈ ছবির সুপুরুষ নায়ক অরুণ সেন বনহুরের দীপ্ত চেহারার কাছে সঙ্কুচিত হলো। সে মনে করতো, তার চেয়ে সুন্দর সুপুরুষ আর বুঝি কেউ নেই। হিংসা হলো অরুণ সেনের মনে, সকলের অলক্ষ্যে তাকালো অরুণ সেন জ্যোছনা রায়ের দিকে।
অদূরে দাঁড়িয়ে জ্যোছনা রায় তখন নিষ্পলক নয়নে তাকিয়ে আছে বনহুরের দিকে।
পরিচালক অরুণ সেন ও জ্যোছনা রায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন বনহুরের।
আমার ছবির নায়িকা জ্যোছনা রায়।
হাত জুড়ে নমস্কার জানালো জ্যোছনা রায়।
আর ইনি নায়ক অরুণ কুমার সেন।
বনহুর অরুণের দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডসেক করলো।
বৈকালে বাকী সুটিং শেষ করে কুন্তিবাঙ্গ ছবির ইউনিট যাত্রা শুরু করলো।
হঠাৎ বনহুরের ভাগ্য এতো প্রসন্ন হবে, ভাবতেও পারেনি সে নিজে। মৃত্যুর মুখ থেকে যেন ফিরে এলো তারা।
পরিচালক নাহার চৌধুরী বনহুরের সঙ্গে গভীরভাবে ভাব জমিয়ে ফেললেন। এমন একজন ব্যক্তি যদি তাদের দলে থাকে তবে তাদের সৌভাগ্য বলতে হবে। নাহার চৌধুরী জানেন–কান্দাই এর হায়দার উদ্দিন চৌধুরী বিরাট ধনবান, ইচ্ছা করলে তিনি এক সঙ্গে পাঁচখানা ছবির প্রযোজনা করতে পারেন। আর এমন সুন্দর সুপুরুষ তার ছেলে, হিরো বাইরে খুঁজতে হবে কেনো। কিন্তু বড় বেরসিক ভদ্রলোক, এতো অর্থের মালিক হয়েও এ ব্যবসায় দৃষ্টি দেন না।
পথে আরও একটা দৃশ্যের সুটিং শেষ করে তবেই ফিরবেন পরিচালক। একটা ঘোড়দৌড়ের দৃশ্য নেওয়া হবে। কিন্তু সেই দৃশ্যটা এমন স্থানে হতে হবে যেখান বেশ ফাঁকা বিস্তৃত মাঠ ও কিছুটা পাহাড় রয়েছে, আরও থাকতে হবে কিছু ঝোপ-ঝাড়-টিলা। এই দৃশ্যটা নেওয়া হলেই কুন্তিবাঈ ছবির ইউনিট স্বদেশে ফিরে যাবে।
জাহাজখানা তীরের অনতিদূর দিয়ে এগুতে লাগলো। ডেকে দাঁড়িয়ে দুরবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগিয়ে দেখছেন পরিচালক স্বয়ং। ক্যামেরাম্যান অনন্ত বাবুও মাঝে মাঝে পরিচালকের হাত থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটা নিয়ে দেখছিলেন।
কিন্তু মনমতো জায়গা কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। যদি পাওয়া যায় সুন্দর বালুকাময় বিস্তৃত প্রান্তর, আশেপাশে কোথাও টিলা বা পাহাড়ের চিহ্ন নেই আবার যদি পাওয়া যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়, আশেপাশে কোন ফাঁকা মাঠ বা বিস্তৃত প্রান্তর নেই। গোটা দুটো দিন মনমতো জায়গার অভাবে কেটে গেলো কুন্তিবাঈ ইউনিটের।
জাহাজ আজ দক্ষিণ পূর্ব কোণ ধরে এগুচ্ছে।
পরিচালক নাহার চৌধুরী দুরবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। হঠাৎ একদিন জুটে গেলো তার মনমতো জায়গা।
তীরের অনতিদুরে জাহাজ নোঙ্গর করলো।
ঠিক পরিচালকের মনের মত স্থান। খুশীতে আত্মহারা হলেন নাহার চৌধুরী। জাহাজ থেকে বোট নামানো হলো, সবাই বোটে চেপে তীরে এলেন।
পরিচালকের আনন্দ আর ধরছেনা।
যেমনটি চেয়েছিলেন ঠিক তেমনটিই নাকি পেয়েছেন।
বিস্তৃত বালুকাময় বেলাভূমি, মাছে মাঝে ছোট ছোট টিলা আর ঝোপঝাড়। একটু দূরেই ছোটখাটো কয়েকখানা পাহাড়।
সুটিং শুরু করবেন পরিচালক।
জাহাজ থেকে দুটো ঘোড়া নামিয়ে আনা হলো। একটি সাদা ধবধবে, একটি সাদা-কালো মেশানো! ঘোড়া দুটি যেমন বলিষ্ঠ, তেমনি তেজী।
জায়গা বেছে নিয়ে ক্যামেরা বসানো হলো।
নায়িকা জ্যোছনা রায়কে মেকআপ দিচ্ছেন মল্লিক বাবু।
এ দৃশ্যে থাকবে নায়িকা, নায়ক ও ভিলেন।
নায়ক অরুণ কুমার ও ভিলেন নায়ক বিশুর মেকআপ নেওয়া হয়ে গেছে। এ দৃশ্যে থাকবে…..
নায়িকা কলসী কাখে জল নিয়ে ফিরছিলো।
একটা ঘোড়ার পিঠে হঠাৎ এগিয়ে এলো ভিলেন। রাজার সেনাপতির বেশ চোখে মুখে লালসা পূর্ণ ক্ষুব্ধ শার্দুলের চাহনী। অশ্বপষ্ঠে ছুটে আসছে। ভিলেন নায়িকার দিকে, নায়িকার পাশ কেটে চলে যাবার সময় এক ঝটকায় ভিলেন নায়িকাকে তুলে নিলো ঘোড়ার পিঠে। নায়িকার হাত থেকে ভরা কলসীটা পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে গেলো। নায়িকা তীব্র চীৎকার করে উঠলো–বাঁচাও, বাঁচাও, বাঁচাও…
অদূরে একটা ঘোড়ার পিঠে নায়ক ছুটে আসে, দাঁড়ায় একটু ঘোড়াটা দুপা উঁচু করে চিহি শব্দ করে তারপর তীর বেগে ছুটে যায়….
মেকআপ নেওয়া হয়ে গেলো।
নায়িকা কলসী কাখে এসে দাঁড়ালো পথের মধ্যে।
পরিচালক স্ক্রিপ্ট খুলে তার কার্যসূচী বুঝিয়ে দিলেন নায়িকা জ্যোছনা রায়কে।
ক্যামেরা নায়িকাকে ধরে এগুচ্ছে।
নায়িকা আপন মনে কলসী নিয়ে পথ বেয়ে চলেছে।
পরিচালক চীকার করে উঠলো-কাট।
এদিকে অশ্বপৃষ্ঠে দ্রুত এগিয়ে আসছে ভিলেন। ক্যামেরা এবার অশ্বসহ ভিলেনকে ধরলো। ক্যামেরা ধীরে ধীরে ঘুরছে।
দ্রুত এগিয়ে আসছে ভিলেন।
পরিচালক নাহার চৌধুরীর কণ্ঠস্বর-কাট।
আবার নায়িকাকে ধরলো ক্যামেরা, ছুটে আসছে ভিলেন অশ্বপৃষ্ঠে। ক্যামেরায় এক সঙ্গে ধরা হলো ভিলেন নায়িকাকে এক ঝটকায় তুলে নিলো অশ্বপৃষ্ঠে, তারপর অশ্বপৃষ্ঠে নায়িকা সহ ভিলেন ছুটে চলেছে। কলসীটা নায়িকার হাত থেকে খসে পড়ে খান খান হয়ে ভেংগে গেলো। এ দৃশ্যটাও ক্যমেরা ম্যান অনন্ত বাবু ধরে নিলেন একই সঙ্গে।
