পরিচালক আনন্দধ্বনি করে উঠলেন–সাবাস!
এখন নায়ক অরুণ কুমারের কাজ।
অরুণ কুমার তার সাদা ধবধবে ঘোড়াটার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
ক্যামেরা ঠিক করে নিলেন অনন্ত বাবু।
পরিচালক অরুণ বাবুর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন স্ক্রিপ্ট হাতে।
অন্যান্য যার যা কাজ সবই ঠিক হয়ে কাজ শুরু করবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন।
শব্দযন্ত্রী কাওসার আহম্মদের এখন কোন কাজ নেই। তিনি ঘোড়ার খুঁড়ের শব্দ পরে সংযোগ করে নেবেন, এখন তিনি কাজ দেখে যাচ্ছেন শুধু।
অরুণ কুমারকে পরিচালক তার কাজ বুঝিয়ে দিতেই অরুণ বাবুর মুখ বিবর্ণ হলো, তাকে অনেক করে ঘোড়া চড়া শেখানো হয়েছিল, কিন্তু আজ বলছেন, আমি এটা পারবো কিনা সন্দেহ।
পরিচালক বিপদে পড়লেন; এমনটি যে হবে কল্পনাও করতে পারেন নি। তিনি ভেবেছিলেন, অরুণ কুমারকে যে ভাবে ঘোড়ায় চড়া শিখিয়ে নেওয়া হলো তাতেই কাজ চলবে।
কিন্তু এখন একেবারে তিনি বেঁকে বসলেন, ঘোড়ায় চড়ে দৌড়তে পারবেন না।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন পরিচালক নাহার চৌধুরী।
স্টুডিওতে ছবির প্রাথমিক কাজ শেষ করে আউটডোরে সুটিং এ বেরিয়েছেন নাহার চৌধুরী। আউটডোরের কিছু দৃশ্য গ্রহণের পর ইনডোরে কাজ শুরু করবেন—এই তার ইচ্ছা। হিরোর দুটো মাত্র দশ্য ইতিপূর্বে গ্রহণ করা হয়েছে। ঘোড়া চড়া দৃশ্যগুলি বাকী রেখে, তাকে ঘোড়া চড়া শেখানো হচ্ছিলো।
আজ পরিচালক নাহার চৌধুরী বিপদে পড়ে গেলেন। এ দৃশ্য এই স্থানেই গ্রহণ করতে হবে। বিস্তৃত বালুকাভূমি, মাঝ মাঝে টিলা আর ঝোপ জাড়, অদূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে।
পরিচালক অরুণ কুমার চেষ্টা নিতে বললেন।
তিনি ঘোড়ায় চড়লেন বেটে কিন্তু ঘোড়ার পিঠে এই উঁচু নীচু স্থান দিয়ে দৌড়াতে রাজি হলেন না, ভয়ে কুকড়ে গেলেন—যদি পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ভেংগে যায়!
বেশ কিছুক্ষণ এ সব নিয়েই কেটে গেলো।
এবার উপায়? অন্ততঃপক্ষে ঘোড়ায় চড়া ব্যাপারটা আর একজনকে নিয়েও চালানো যায়, কিন্তু তাদের ইউনিটে কেউ ঘোড়ায় চাপতে জানেনা। পরিচালক এনিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।
পরিচালক যখন উপায়ন্তর না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়লেন তখন বনহুর এগিয়ে এলো—নায়ক ছাড়া যদি চলে তবে আমি একবার চেষ্টা নিতে পারি কি?
আনন্দে অস্ফুট ধ্বনি করে বনহুরকে জড়িয়ে ধরলেন পরিচালক নাহার চৌধুরী। খুশীতে যেন ফেটে পড়লেন বললেন–আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো।
হেসে বললো বনহুর—থাক আগে কাজ হোক।
দৃশ্যটা গ্রহণ করা হয়ে গেলো।
গোটা ইউনিট জয়ধ্বনি করে উঠলো।
বনহুরকে সামান্য মেকআপ দেওয়া হয়েছিলো–তাতেই তকে অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছিলো। তাছাড়া ঘোড়ায় চড়া কালে মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয় নাই, কাজেই অসুবিধা হলোনা কিছু।
পরিচালক নাহার চৌধুরী জড়িয়ে ধরলেন বনহুরকে।
সুদক্ষ অভিনেতার মতই নাকি সে কাজ করেছে। বনহুরের প্রশংসায় সকলে পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো। এতো অল্প সময়ে এতো সুন্দরভাবে কোন অভিজ্ঞ অভিনেতাও নাকি কাজ করতে পারেনা।
সেদিনের সুটিং শেষ করে আবার যাত্রা শুরু করলেন পরিচালক নাহার চৌধুরী।
কিন্তু সেদিনের পর হঠাৎ অরুণ কুমার বেঁকে বসলেন, এ ছবিতে তিনি আর কাজ করবেন না।
পরিচালক কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন।
অনেক করেও অরুণ কুমারকে মত করানো গেলোনা।
সেদিনে বনহুরের কৃতিত্ব তার আত্মমর্যাদায় চরম আঘাত করেছিলো। একেই অরুন কুমার বনহুরের সৌন্দর্য দর্শনে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। চিত্রজগতে অরুন কুমার নামকরা সুপুরুষ। শহরের বহু যুবতী অরুণ কুমারের সঙ্গে এতোটুকু আলাপ করার জন্য সদা উন্মুখ। সেই অরুণ কুমার সেনের এই চরম অপমান। তার সৌন্দর্য স্নান হয়ে গেছে মকছুদ চৌধুরীর কাছে। নিজকে অপমানিত বোধ করে অরুণ কুমার।
অরুণ কুমার কুন্তিবাঈ ছবির জন্য চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি অসম্ভবভাবে বেঁকে বসলেন।
পরিচালক নাহার চৌধুরী ভেংগে পড়বার লোক না। অরুণ কুমার তার ছবিতে কাজ না করলেও তিনি ছবি ছেড়ে পালাবেন না। কুন্তিবাঈ ছবির প্রযোজক আরফান উল্লাহর দৃঢ় বিশ্বাস নাহার চৌধুরীর উপর। ভদ্রলোকের আরও তিনখানা ছবিতে নাহার চৌধুরী পরিচালনা করেছেন। প্রত্যেকটা ছবি তিনি আপ্রাণ চেষ্টা ও আন্তরিকতা নিয়ে সমাধা করেছিলেন। তিন খানাই হিট ছবি হয়েছিলো। প্রচুর পয়সা পেয়েছেন প্রযোজক আরফান উল্লাহ!
.
নাহার চৌধুরী প্রত্যেকটা ছবিতে নতুন মুখ আবিষ্কার করেন। প্রাণঢালা যত্নে তিনি এদের শিখিয়ে কার্যক্ষম করে গড়ে তোলেন। এহেন জন অরুণ কুমারের এই অহেতুক অভিমানে হতাশ হলেন না।
সেদিন বনহুর আর নূরী ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস দেখছিলো, আর মাঝে মাঝে বনহুর নুরীকে দুএকটা পূর্ব কথা বলে তার স্মরণশক্তি ফেরবার চেষ্টা করছিলো বনহুর যতই যা করুক, সব সময় নূরীর জন্য তার চিন্তার অন্ত নেই। নারীর স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে না আসা অরধি নানাভাবে নানা কাজের মধ্যে দিয়ে ওকে পূর্ব কথা স্মরণ করাতে চেষ্টা করত সে। আজও এ-কথা সে-কথা বলে নূরীর জ্ঞান পরীক্ষা করছিলো।
এমন সময় পরিচালক নাহার চৌধুরী ও নায়িকা জ্যোছনা রায় এসে দাঁড়ালেন তাদের পাশে।
আকাশে পূর্ণ চন্দ্র।
জ্যোছনার আলোতে ডেকখানা আলোকিত।
নাহার চৌধুরী হেসে বললেন-আপনারা এখানে; আর আমরা খুঁজে এলাম আপনাদের ক্যাবিনে।
