বনহুর নিজের জন্য যতখানি চিন্তিত না হলো, তার চেয়ে বেশী হলো নূরীর জন্য। নূরীকে আর বুঝি রক্ষা করা যাবে না।
নূরী বালির উপর বসে পড়লো।
বনহুর তাড়াতাড়ি নূরীর পাশে হাটু গেড়ে বললো—খুব কষ্ট হচ্ছে?
হাঁ, আমি আর পারছিনা।
নূরী, কি করবো বলো?
নূরী নীরব আঁখি দুটি তুলে ধরলো বনহুরের মুখের দিকে।
বেলা শেষ হয়ে এসেছে।
সূর্যের আলোকরশ্মি স্তিমিত হয়ে আসছে।
শুভ্র বলাকার দল ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে দূর হতে দূরান্তে।
বনহুর বললো–নূরী, ঐ পাখীগুলির আশ্রয় আছে। তারাও সন্ধ্যার আগে ফিরে যাচ্ছে নিজ নিজ ঘরে আর আমরা………. আমাদের কোন আশ্রয়
নেই, নেই কোন মাথা লুকোবার ঠাই। কোথায় যাই বলো?
নূরী নীরব।
অসহ্য লাগে বনহুরের কাছে নূরীর এ নীরবতা। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা করে তার। কিন্তু কি হবে কেঁদে, তার কাদা নূরীর প্রাণে এতোটুকু দোলা জাগাবেনা।
ঐ রাত্রি বালির মধ্যেই কেটে গেলো বনহুর আর নূরীর।
পরদিন আবার হলো তাদের যাত্রা শুরু।
এবার বনহুর আর নূরী সাগর তীরে ধরে এগিয়ে চললো। যদিও নূরী অবসন্ন ক্লান্ত তবু বনহুরের হাত ধরে অতি কষ্টে এগুতে লাগলো।
চলেছে তো চলেছে।
কিন্তু নূরী আর পারছে না, বসে পড়লো ভূতলে।
বনহুর বিপদে পড়লো, বুঝতে পারলোনূরী একেবারে ক্ষীণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। চলতে আর পারছেনা—এখন উপায়!
না চললেও নয়, যতক্ষণ নিশ্বাস আছে ততক্ষণ বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেই হবে।
বনহুর নূরীকে তুলে নিলো হাতের উপরে।
নূরী লেতিয়ে পড়লো, আর বাধা বা আপত্তি করতে পারলো না।
বেশ কিছুদূর এগুলো বনহুর নূরীকে ঐ ভাবে দুহাতের উপর তুলে নিয়ে। হঠাৎ বনহুরের নজরে পড়লো, দূরে—কিছু দূরে দুটি লোক বালির উপরে ভীষণভাবে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে।
নূরীকে নিয়ে থমকে দাঁড়ালো বনহুর। ভাল করে লক্ষ্য করতেই চমকে উঠলো, একটি লোকের হস্তে সুতীক্ষ্ণ ধার ছোরা অপর ব্যক্তি নিরস্ত্র। ছোরাওয়ালা লোকটার কবল থেকে স্যুটপ্যান্ট পরা লোকটা নিজেকে বাঁচাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ভীষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি চলেছে। আশেপাশে বেশ কিছুটা ঝোপঝাড় রয়েছে।
বনহুর বুঝতে পারলো কোন অসহায় ভদ্রলোক কোন দস্যু কবলে। আক্রান্ত হয়েছে। বনহুরের ধমনীর রক্ত মুহূর্তে উষ্ণ হয়ে উঠলো, যদিও সে আজ কদিন সম্পূর্ণ উপবাসী—তবু এতোটুকু বিচলিত হলোনা। নূরীকে বালির উপর নামিয়ে দিয়ে দ্রুত ছুটে চললো সে লোক দুটির দিকে।
বনহুরের লক্ষ্য আর কোন দিকে নেই, সোজা সে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোক দুটির উপরে। ছোরাওয়ালা লোকটার নাকে প্রচণ্ড এক ঘুষি বসিয়ে দিতেই, চারিদিক থেকে বেরিয়ে এলো কতকগুলো স্যুট-প্যান্ট-ক্যাপ পরা লোক, একসঙ্গে সবাই বলে উঠলো–আহা একি করছেন? একি করছেন?
বনহুর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকালো—এ কি! তার চারপাশে অনেকগুলি ভদ্রলোক গোলাকার হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। অদূরে তাকাতেই। বনহুরের মাথাটা লজ্জায় নুয়ে এলো। একি করেছে সে! কিছুদূরে একটা ঝোপের পাশে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক মোটা মত ভদ্রলোক, মুখে-চোখে তার বিরক্তির ছাপ।
ভীড় ঠেলে বনহুরের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন পরিচালক স্বয়ং, গম্ভীর শান্ত কণ্ঠে বললেন—আপনি নিশ্চয়ই ভুল করেছেন, আমাদের কুন্তিবাঈ ছবির সুটিং হচ্ছিলো।
বনহুর হেসে বললো—মাফ করবেন—না জেনে…..
নিশ্চয়ই? কিন্তু আপনি কে?
অন্যান্য সবাই তখন বিপুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে, কে এই লোক—নির্জন সাগর সৈকতে এলোই বা কোথা থেকে। যে লোকটার নাকে বনহুর প্রচণ্ড ঘুষি লাগিয়ে দিয়েছিলো, তার নাক দিয়ে তখন রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। লোকটা বারবার রুমালে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে নিচ্ছিলো।
পরিচালকের প্রশ্নের জবাবে একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিলো বনহুর জাহাজডুবিতে আমাদের এই অবস্থা হয়েছে। কোন রকমে আমি ও আমার বোন প্রাণে বেঁচে গেছি। কান্দাই শহরে আমার বাড়ী।
পরিচালক উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন-কান্দাই শহরে আপনার বাড়ী? আপনার পরিচয়?
জনাব হায়দার উদ্দিন চৌধুরীর সন্তান আমি। আমার নাম মকছুদ চৌধুরী।
বনহুর কান্দাই এর সবচেয়ে ধনি ব্ল্যাক মার্কেটার হায়দার চৌধুরীর সন্তান বলে নিজকে পরিচিত করলো।
পরিচালক খুশী হয়ে বললেন আমাদের বাড়ী বসুন্দা নগরে। যদিও কান্দাই থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে, তবু কান্দাই এর সঙ্গে আমাদের যথেষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। জনাব হায়দার উদ্দিন চৌধুরীর নাম শুনেছি। তিনি মস্ত ধনবান ব্যক্তি একথাও আমরা জানি। আপনি তারই পুত্র…………. পরিচালকের গলা ব্যথায় জড়িয়ে এলো।
বনহুর বলে উঠলো—হাঁ, আজ আমারই এ দশা………..
দুঃখ করবেন না, সবই অদৃষ্ট। কই, আপনার ভগ্নি কোথায়?
বনহুর দূরে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বললো—ঐ যে ওখানে। আজ কদিন আমি এবং আমার ভগ্নি সম্পূর্ণ উপবাসী। ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।
পরিচালক বনহুরকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—আপনাদের আর কোন চিন্তা নেই। এবার আমাদের হাতে আপনারা এসে গেছেন। তারপর নিজেদের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন–এসো, আগে এনাদের ব্যবস্থা ঠিক করে তবে আবার সুটিং শুরু করবো।
অদূরে একটা বাকের মত জায়গায় কুন্তিবাঈ ছবির ইউনিটের জাহাজ নোঙ্গর করে ছিলো। ছোট ছোট কয়েকখানা বোটনৌকা ছিলো তাদের সঙ্গে, বনহুর আর নূরীকে নিয়ে পরিচালক নাহার সাহেব তাদের জাহাজে গেলেন। এবং বনহুর আর নুরীর জন্য একটা ক্যাবিন ছেড়ে দিলেন। থাকা খাওয়ার সব ব্যবস্থা তিনি নিজে করলেন। বনহুর ও নৃরীর জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, এসবও তিনি সংগ্রহ করে দিলেন। জাহাজে এসব জিনিসের কোন অভাব ছিলো না।
