বনহুরের মুখে খুশী ফুটে উঠলো।
নূরীকে নিবিড় ভাবে টেনে নিতে গেলে বনহুর কিন্তু নূরী ভয়ে সঙ্কুচিত হয়ে পড়লো। অস্ফুট কন্ঠে বললো–আমাকে ছেড়ে দাও, নইলে ঐ জলস্রোতে ঝাপিয়ে পড়বো।
বনহুর বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো—নূরী।
নূরী রাগে অধর দংশন করে বললো–তোমাকে আমি চিনিনা।
নূরী।
আমাকে তুমি যেতে দাও।
কোথায় যাবে?
নূরী আনমনা হয়ে যায়, গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করে।
বনহুর বলে–তাহলে যাও।
নূরী নতমুখে বসে থাকে।
বনহুর পুনরায় বলে উঠে—তুমি স্মরণ করো নূরী, মনে করতে চেষ্টা করো……. সেই কান্দাই বন, সেই ভূগর্ভে আস্তানা, তোমার বনহুর…. মনে পড়ে? নূরী, কোথায় তোমার সেই মনি? নূরী–নূরী, কি হয়েছে তোমার? বনহুর দুহাতে নিজের মাথার চুল টানতে থাকে, অধর দংশন করে সে।
নূরী বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, কি যেন সব এলোমেলো হয়ে যায়, স্মরণ হয় না কিছু। অনেক চিন্তা করেও নূরী মনে করতে পারেনা ওর কথাগুলো।
১২.
গাছের ফল পেড়ে বনহুর নূরীকে দেয়—খাও।
নুরী নিজে খায়, ভাবে লোকটা তাকে সত্যি কত স্নেহ করে–ভালবাসে। বনহুর নূরীকে খেতে দিয়ে নিজে চুপ চাপ বসে থাকে বিমর্ষ মুখে।
নূরী দুঃখ পায়, সে খাচ্ছে অথচ লেকাটা খাচ্ছেনা। ব্যথা পায় হৃদয়ে। একটা ফল হাতে তুলে নিয়ে বনহুরের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে—তুমি খাও।
বনহুর ফিরে তাকায় নূরীর দিকে, অফুরন্ত একটা আনন্দ নাড়া দিয়ে যায় তার মনে। নূরীর হাত থেকে ফলটা নিয়ে খায় বনহুর।
একটা গাছের ছায়ায় ঘাসের উপর ঘুমিয়ে পড়ে বনহুর। আজ দুদিন তার চোখে এতোটুকু ঘুম নেই।
নূরী বসে থাকে তার পাশে।
বনহুরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নূরী নিষ্পলক নয়নে। এর পূর্বে কোথাও তাকে দেখে ছিলো কিনা স্মরণ করতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতে ওর মনে পড়ে না কোন কথা।
নূরীর মায়া হয়লোকটা তার জন্য কতইনা কষ্ট করেছে তাকে বাঁচাবার জন্য নিজের জীবন বিনষ্ট করতেও সে কুণ্ঠা বোধ করছিলোনা। নূরী এগিয়ে আসে, বনহুরের মাথাটা ধীরে ধীরে তুলে নেয় নিজের কোলে।
বনহুর গভীর ঘুমে মগ্ন থাকলেও সতর্ক ছিলো। একটু মাথায় হাত লাগতেই জেগে উঠলো, কিন্তু সে চোখ মেললো না। ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে রইলো।
নূরী ধীরে ধীরে বনহুরের চুলগুলি আংগুল দিয়ে আঁচড়ে দেওয়ার মত ঠিক করে দিতে লাগলো অতি যত্ন সহকারে বেশ কিছুক্ষণ এই কাজ করলো নূরী।
বনহুর হঠাৎ উঠে বসলো।
নূরী লজ্জায় মরিয়া হয়ে মাথা নত করলো।
বনহুর বললো—এতে লজ্জার কি আছে। সত্যি তুমি কত সুন্দর নূরী!
নূরী আরও জড়োসড়ো হয়ে পড়লো।
বনহুর নূরীর চিবুক ধরে উচু করে তুলে বললো আমাকে তোমার কেমন লাগে?
নূরী নীরব রইলো, কোন জবাব দিলোনা।
বনহুর নূরীর দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে আবেগ ভরা কন্ঠে বললো নূরী, জবাব দাও? জবাব দাও?
নূরী পাথরের মূর্তির মতই নিশ্চুপ বসে রইলো।
বনহুর হঠাৎ প্রচণ্ড এক চড় বসিয়ে দিলো নূরীর গালে।
নূরী তবু স্থিরভাবে যেমন বসেছিলো তেমনি রইলো।
বনহুর নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতখানাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলতে লাগলো, হঠাৎ এ–সে কি করে বসলো। নৃরীকে সে আঘাত করলো! বনহুর নিজের হাতখানাকে মাটিতে আছড়াতে লাগলো।
নূরী ধরে ফেললো বনহুরকে।
বনহুর স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকালো নূরীর দিকে, একি নূরীর চোখে পানি নেই। এতোটুকু বিচলিত হয়নি সে।
বনহুর দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো ছোট্ট বালকের মত।
নূরী অবাক হয়ে দেখছে তার দিকে।
১৩.
বনহুর নূরীকে যতই স্মরণ করাতে চেষ্টা করছে, ততই মূরী যেন কিছুই বুঝতে পারছেনা। বনহুর যতই পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে, ওকে নিবিড়ভাবে পেতে চায়, নূরী ততই সরে যায় দূরে, সঙ্কুচিতভাবে নিজকে সরিয়ে রাখে বনহুরের পাশ থেকে।
কিন্তু রাতের বেলায় হয় যত মুস্কিল।
গহন বন। অন্ধকার রাত্রি, চারিদিকে হিংস্র জন্তুর গর্জন। নূরী ভয়ে কাঁপতে থাকে, তখন জড়োসড়ো ভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে বনহুরের কাছে।
অন্ধকারে নূরীর গতিবিধি লক্ষ্য করে হাসে বনহুর।
এমনি করে কেটে যায় দুটি দিন আর দুটি রাত।
নূরী এখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে এসেছে। বনহুর এবার বুঝতে পারলো–নূরীর হাটতে এখন কোন কষ্ট হবেনা!
নদীর ধার ধরে বনহুর আর নূরী এগিয়ে চললো।
সমস্ত দিন একটানা চলার পর ক্লান্ত অবশ পা দুখানা আর যেন উঠতে চায়না তাদের। বনহুর যদিও তেমন কোন অসুবিধা বোধ করছেনা তবু নূরীর জন্য তাকেও ধীরে ধীরে চলতে হচ্ছিলো বা বনহুর নূরীকে হাত ধরে চলায় সাহায্য করছিলো।
গোটা দিন অবিরাম চলে এমন একস্থানে এসে তারা পৌঁছলো যেখানে নদীটা প্রশস্ত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। তীর থেকে সম্মুখে তাকালে শুধু জল আর জল। আকাশ যেন মিশে গেছে ঐ সাগরবক্ষে।
বনহুর নূরীকে লক্ষ্য করে বললো নূরী, আমরা সাগর তীরে এসে গেছি। হয়তো কোন জাহাজ এই পথে এসে যেতে পারে, তাহলেই আমরা বাচবো।
নূরীর কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছে।
এ কয়টা দিন একমাত্র গাছের জংলী ফল খেয়ে বেঁচে আছে তারা। পানি পান করবার সুযোগ হয়নি আর।
নূরীর ক্লান্ত অবসন্ন করুণ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে বললো বনহুর তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে, তাই না নূরী?
নূরী মাথা নীচু করলো।
বনহুর বুঝতে পারলোনূরীর আর চলবার শক্তি নেই। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলো বনহুর–কোথাও গাছ-পালা বা কোন ছায়া নেই, ফল-মূল তো দূরের কথা।
