এতো বেশী স্রোতের টানেও অতি ধীরে ধীরে গাছটা গড়িয়ে আসছে। বনহুর বুঝতে পারলো-গাছটা ছোট খাটো বা পাতলা কোন গাছ নয়–অত্যন্ত ভারী এবং বৃহৎ বৃক্ষ।
বনহুর তাকিয়ে দেখলো, আশেপাশে তাদের পাথরটার অদূরে আরও কতকগুলি বড় বড় পাথর জলস্রোতের মধ্যে কচ্ছপের পিঠের মত উঁচু হয়ে আছে। আশায় আনন্দে ওর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। কারণ, ঐ বিরাট গাছটা যদি কোনক্রমে তাদের এতোদূর এসে পড়ে তাহলে আর সামনে গড়িয়ে যেতে পারবে না। অনেকগুলি বড় বড় পাথর তার পথে বাধার সৃষ্টি করবে।
বিপুল আগ্রহ নিয়ে বনহুর তাকিয়ে রইলো গাছটার দিকে।
ধীরে ধীরে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে আসছে গাছটা?।
বনহুর নূরীকে আঁকড়ে ধরে বললো–নূরী, এবার আমরা বাঁচবো। ঐ গাছটা আমাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে।
নূরী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো, কোন জবাব দিলো না।
নূরীর জবাবের প্রতীক্ষা না করে বনহুর আবার তাকালো গাছটার দিকে।
অনেক এগিয়ে এসেছে গাছটা।
হঠাৎ একটা পাথরখণ্ডে গাছটা আটকে গেছে বলে মনে হলো বনহুরের, কারণ আর এগুচ্ছে না গাছটা।
বনহুরের গোটা মন হতাশায় ভরে উঠলো। হায়, এবার উপায়-গাছটা আর এগিয়ে আসতে সক্ষম হবে না। পাথরটার সঙ্গে আটকে গেছে গাছটা।
কিন্তু এখনও উচ্ছ্বসিত ঢেউএর আঘাতে দোল খাচ্ছে গাছটা। কোন ক্রমে পাথরটা গা থেকে ছাড়া পেলেই চলে আসতো তাদের দিকে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
বনহুরের আশা পূর্ণ হলো, ঢেউএর আঘাতে গাছটা খসে এলো পাথরটার গা থেকে।
বনহুর আনন্দ ধ্বনি করে উঠলো–সাবাস!
এবার গাছটা বেশ দ্রুত গতিতে এগুচ্ছে। স্রোতের টান–এদিকে আরও শতগুণ বেশী।
ভীষণ বেগে ছুটে আসছে এবার গাছটা।
কিন্তু যে ভাবে আসছে, হঠাৎ পাথরটার গায়ে ধাক্কা খেয়ে তারা দুজনা ছিটকে না পড়ে।
বনহুর নূরীকে শক্ত করে এটে ধরলো, গাছটার ধাক্কা বা আঘাতে তারা যেন বিছিন্ন হয়ে না পড়ে।
এসে গেছে, অতি নিকটে এসে পড়েছে গাছটা।
যা ভেবেছিলো বনহুর, গাছটা তীরবেগে ছুটে এসে ঝাপটা খেয়ে আটকে পড়লো কয়েকটা পাথরখণ্ডের সঙ্গে।
প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি বা ঐ রকম কিছুর আশা করেছিল বনহুর কিন্তু আশ্চর্য, এতোটুক ঝাকুনি বা কোন রকম অসুবিধা হলোনা তাদের।
গাছটা সম্পূর্ণ আড়াআড়িভাবে লম্বা হয়ে আটকে পড়লো। এবার আর কোন জলস্রোতেই তাকে ভাসিয়ে নিতে সক্ষম হবে না। কোনদিনই গাছটা ঐ হাজার ফিট জলপ্রপাতের নীচে পাথরের উপর আছড়ে পড়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ হবেনা অনেকগুলি পাথরের গায়ে আটকে পড়েছে গাছটা।
বনহুরের চোখে-মুখে খুশীর উৎস।
এ ভাবে যে তাদের উদ্ধারের পথ হয়ে যাবে, কল্পনাও করতে পারেনি সে।
এবার বনহুর আর নূরী উঠে দাঁড়ালো, তাদের পাশেই গাছটার শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে আছে। বিরাট গাছ, প্রায় বিশ-পঁচিশ গজ লম্বা হবে। পুরোনো বটবৃক্ষ এটা। গাছটার গুড়ি প্রায় তীরের সন্নিকটে পৌঁছে গেছে। হাত কয়েক দূরেই তীর ভূমি।
বনহুর নূরীকে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো, বললো বনহুর–নূরী, আমি তোমাকে ধরছি, তুমি দক্ষিণ হস্তে গাছটার ডাল ধরে গুড়িটার উপরে উঠে পড়ো। সাবধান, কোন সময় শাখা ছেড়ে দেবে না।
নূরী মাথা কাৎ করে জানালো—আচ্ছা।
১১.
অনেক কষ্টে গাছটার শেষ সীমান্তে এসে উপস্থিত হলো বনহুর আর নূরী। গাছটা ঢেউ এর চাপে দুলছে, সাবধানে এগুতে হয়েছে তাদের। নূরীকে বনহুর অতি কৌশলে ধরে ধীরে এতোদূর নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখন উপায়, এখনও তীর প্রায় পাঁচ ছহাত দূরে। বনহুর একা হলে চিন্তা ছিলোনা, সে অতি কৌশলে সাঁতার কেটে এই জায়গাটুকু পার হয়ে আসতে পারতো। কিন্তু নূরীকে নিয়ে কি ভাবে এই ভয়ঙ্কর খরস্রোত পার হবে।
বনহুর যেন বিপদে পড়লো।
কিন্তু কোন উপায় নেই, সাঁতার দিয়ে এই জায়গাটুকু পার হতেই হবে।
বনহুর নূরীকে বললো-নূরী, হয় জীবন ফিরে পাবো, নয় মৃত্যু। চলো–অস্ফুট কণ্ঠে বললো নূরী–কোথায়?
এতো দুঃখেও বনহুরের মুখে হাসি ফুটলো, বললো সে-ঐ নদীবক্ষে।
ভয়ে নূরী বনহুরকে আঁকড়ে ধরলো।
বনহুর আর বিলম্ব না করে বললো নূরী, আমাকে শক্ত করে ধরে রেখো, কোন রকমেই যেন তোমার হাত খসে না যায়। ধরো আমার গলা…
নৃরী বনহুরের গলা জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।
বনহুর লাফিয়ে পড়লো ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে।
সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাত ভেসে গেলো দূরে, সেই মৃত্যুর মুখের দিকে, কিছুদূরেই জলপ্রপাত।
বনহুর প্রাণপণ চেষ্টায় সাঁতার কাটতে লাগলো।
তবু কিছুতেই স্রোতের অপর দিকে এগুতে সক্ষম হচ্ছেনা।
নূরীর হাত দুখানা ক্রমে শিথিল হয়ে আসছে। আর রক্ষা নেই। এমন সময় বনহুর যেন পায়ে মাটির ছোয়া পেলো।
অতি কষ্টে, অতি সাবধানে বনহুর তীরে উঠে আসতে সক্ষম হলো।
কিন্তু নূরী তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
ক্ষুধা তৃষ্ণার কাতর নূরী, তারপর এই প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসের বেগে কিছুতেই স্থির থাকতে পারলোনা, অজ্ঞান হয়ে পড়লো।
বনহুর যতই শক্তিশালী পুরুষই হোক, তবু মানুষতো।
তার অবস্থাও নাজেহাল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সে একেবারে হতাশ হয়ে। পড়েনি। নূরীর জ্ঞান ফেরানোর জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করতে লাগলো।
এতোটুকু সান্তনা এখন বনহুরের বুকে তারা তীরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। মস্ত একটা বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে বনহুর আর নূরী।
ঘন্টা কয়েক পরে জ্ঞান ফিরে এলো নূরীর।
