রীতিমত হাঁপাচ্ছে সে।
নূরীর শরীরের ওড়নাখানা কখন যে ভেসে গেছে স্রোতের টানে। শুধু ঘাড় আর একটা আট-সাট ব্লাউজ রয়েছে তার শরীরে।
বনহুর তাকালো এবার নূরীর দিকে।
নূরী নিজের ভিজে চুপসে যাওয়া শরীরের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলো।
এতা বিপদেও বনহুরের হাসি পেলো। এখনই মৃত্যু যার অনিবার্য ছিলো তার আবার এতো লজ্জা।
বনহুর নিজের গা থেকে জামাটা খুলে এগিয়ে ধরলো-নাও।
নূরী দ্রুত হস্তে বনহুরের হাত থেকে জামাটা নিয়ে নিজের যৌবন ভরা শরীরে চাপা দিলো।
মাথার উপরে অসীম আকাশ।
নীচে যমদূতের মত জলোচ্ছাস।
সামান্য একটা পাথরখণ্ডে উপবিষ্ট দুটি প্রাণ।
ভয়ঙ্কর বিপদের গভীর বেদান ভরা মুহূর্তেও বনহুর নূরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো-নূরী, এখনও তুমি আমাকে চিনতে পারছোনা? আমি কে?
ধীরে ধীরে মাথা নাড়ালো নূরী, বললো–না।
নূরী! ব্যাকুল কণ্ঠে ডাকলো বনহুর।
নূরী দুচোখের ভীতি আর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলো নূরীর পাশে।
প্রচণ্ড প্রচণ্ড ঢেউগুলি আছাড় খেয়ে পড়ছে পাথরটার গায়ে। উচ্ছ্বসিত জলরাশি বনহুর আর নূরীর শরীরকেও বার বার ভিজিয়ে দিচ্ছিলো। যে কোন মুহূর্তে তারা গড়িয়ে পড়তে পারে এই অশান্ত জলস্রোতের মধ্যে। তখন কোন উপায় থাকবে না রক্ষার।
বনহুর নূরীকে ঐ ভীষণ জলপ্রপাতের দিকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বললো–হঠাৎ যদি পড়ে যাও তাহলে ঐ হাজার ফিট নীচে গড়িয়ে পড়বে।
শিউরে উঠে নূরী।
সেই মুহূর্তে একটা প্রচণ্ড ঢেউ আছড়ে পড়ে তাদের গায়ে।
নূরী ভয়-বিবর্ণ মুখে আঁকড়ে ধরে বনহুরকে।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে।
বনহুরের প্রশস্ত বুকের মধ্যে নিজকে নির্ভয়শীলা মনে করে নূরী।
কিন্তু চোখে-মুখে তখনও তার অপরিচিতার ভাব। নূরী এখনও চিনতে পারেনি বনহুরকে।
গোটা বেলা কেটে গেলো, কতক্ষণ এইভাবে সামান্য একটা পাথরখণ্ডে বসে কাটানো যায়। সম্মুখে মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে। যে কোন দন্ডে গড়িয়ে পড়লে আর নিস্তার নেই।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
অস্তমিত সূর্যের রশ্মি এসে পড়লো বনহুর আর নূরীর মুখে। সন্ধ্যা হবার আর বেশী বিলম্ব নেই। বনহুরের ললাট কুঞ্চিত হয়ে উঠলোএখন উপায়? যতক্ষণ না এই স্থান থেকে তীরে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে, ততক্ষণ বাঁচবার কোনও ভরসাই নেই তাদের।
বার বার ঢেউ এর উচ্ছ্বসিত জলরাশিতে বনহুর আর নূরীর দেহ স্কি হয়ে উঠছিলো। তার সঙ্গে ছিলো দমকা হাওয়া-নূরীর শরীরে কাঁপন ধরে গেলো।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে এলো।
চারিদিকে শুধু জলোচ্ছ্বসের প্রচণ্ড শব্দ
বনহুর আর নূরী উভয়ে উভয়েকে আঁকড়ে ধরে বসে রইলো—এতোটুকু নড়লে বা গড়িয়ে পড়লে মৃত্যু অনিবার্য।
সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘন জমাট হয়ে উঠলো।
এখন কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছেনা। মৃত্যুর বিভীষিকা যেন মহাকালবেগে গ্রাস করতে আসছে বনহুর আর নূরীকে।
যার দৃষ্টির কাছে নূরী কিছু সময় আগেও লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ছিলো, যাকে সে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা, এক্ষণে তারই বুকের মধ্যে খুঁজে নিয়েছে সে আশ্রয়।
বনহুর সজাগ ভাবে নূরীকে ধরে রাখলো।
এতোটুকু শিথিলতা এলেই নূরীকে হারাবে সে। রাত্রি বেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নূরী ঝিমিয়ে পড়েছে। বনহুর বুঝতে পারলো, এতো বিপদের মধ্যেও তার দুচোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে। কিছুতেই নূরী নিজকে জাগিয়ে রাখতে পারছে না।
এক সময় নূরীর দেহটা ঘুমে এলিয়ে পড়লো।
বনহুর অতি সাবধানে ধরে রাখলো ওকে।
১০.
ভোরের আলো ফুটে উঠার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠলো নূরী। তাকালো চোখ মেলে। ফুটন্ত গোলাপ কুঁড়ির মত দুটো আঁখির পাতা মেলে ধরলো বনহুরের মুখের দিকে। এতোক্ষণে যেন লজ্জা আর সঙ্কোচ এসে তাকে সঙ্কুচিত করে তুললো। তাড়াতাড়ি সরে বসতে গেলো নুরী।
বনহুরের দ্ৰিাহীন চোখ দুটিতে ফুটে উঠলো অপরূপ এক দৃষ্টি, এক টুকরা হাসি দেখা দিলো তার ঠোঁটের কোণে। নূরীর গালে মৃদু চাপ দিয়ে বললো—নড়লেই ছিটকে পড়বে, আর রক্ষা থাকবে না।
নূরী ছুটে আসা ঢেউগুলির দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলো।
বনহুর নূরীর ভয়-বিহুল মুখের দিকে তাকিয়ে বললো ভয় নেই নূরী। আমি তোমাকে মরতে দেবোনা।
পূর্ব আকাশ রাঙা করে তখন উষার কিরণ ফুটে উঠেছে।
বনহুর ভাবতে লাগলো, কি করে এই মরণ-বিভীষিকা থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। দিনের পর দিন এখানে প্রতীক্ষা করলেও কোন নাবিক বা কোন জলযানের সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই। ক্ষুধায় কাতর তারা, ভাগ্য পানিটা লবণাক্ত নয়—তাই রক্ষা। যখন উচ্ছ্বসিত ঢেউগুলি আছড়ে পড়ে তাদের গায়ে এবং আশে পাশে, তখন নূরী আর বনহুর আজলা, ভরে পান করে সেই পানি। কিন্তু শুধু পানি পান করে কতক্ষণ এই পাথরটার উপরে বেঁচে থাকা যাবে!
যতই বেলা বেড়ে উঠছে, বনহুর ততই বিষণ্ণ মলিন হয়ে পড়ছে আর বুঝি রক্ষার কোন উপায় নেই। দেহের শক্তিও ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে আসছে যেন। বেঁচে থাকার যে উদ্দীপনা, সব যেন নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বনহুর যখন উদ্ধারের কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না, ঠিক তখন দূরে একটা মস্ত বড় কালো মত কিছু যেন এদিকে ভেসে আসছে বলে মনে হলো তার। বনহুর ভাল করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো-বিরাট একটা গাছ গড়িয়ে ভেসে আসছে। ধ্বসে পড়া তীরস্থ কোন বটবৃক্ষ বা ঐ ধরনের কোন বৃক্ষ হবে।
