ঠিক সেই সময় অদূরে শোনা যায় অনেকগুলি লোকের চীৎকার–পালালো—পালালো ধরে ফেললা—ধরে ফেললা……..
বনহুর দেখলো বনের মধ্যে থেকে বর্শা আর বল্লম হাতে তীর বেগে ছুটে আসছে অগণিত লোক।
বনহুর দ্রুত হস্তে মৃত দেহটাকে পানিতে নিক্ষেপ করে ইঞ্জিনে ষ্টার্ট দিলো।
একটা শব্দ করে মোটর-বোটখানা তীর বেগে ছুটতে শুরু করলো। ততক্ষণে নদী তীরে অসংখ্য শয়তান বদমাইশের দল বল্লম আর বর্শা হস্তে এসে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ মোটর-বোট লক্ষ্য করে বল্লম আর বর্শা ছুঁড়ে মারতে লাগলো।
কেউ কেউ নদীবক্ষে ঝাপিয়ে পড়ে মোটর-বোটখানা ধরতে গেলো। কিন্তু বনহুরের হস্তে বোটখানা উল্কা বেগে ছুটে চলেছে।
একটা বর্শা ছিটকে এসে পড়লো মোটর-বোর্টের উপরে। ভাগ্যিস, বনহুরের পিঠে বিদ্ধ না হয়ে হলো ঠিক পাশে, মোটর-বোটের তক্তায়।
বনহুর একবার ফিরে তাকিয়ে দেখি নিলো মাত্র, তারপর অতি দ্রুত চালাতে লাগলো মোটর-বোটখানা।
ক্রমে শয়তান লোকগুলির কলকণ্ঠ আর চিৎকার মিশে এলো। আর দেখা যাচ্ছেনা ওদের। বনহুর এবার তার মোটর-বোটের গতি স্বাভাবিক করে নিলো।
কিন্তু এখনও বন্ধ্যা বন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বনহুর নিশ্চিন্ত নয়!
মাঝে মাঝে বনহুর নূরীর দিকে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিলো।
বোটের একটি আসনে চুপটি করে বসে আছে সে। চুল-গুলি এলোমেলো, চোখ দুটিতে কেমন অসহায়ার দৃষ্টি। মুখমণ্ডল বিষণ্ণ মলিন।
বনহুরের মায়া হচ্ছিলো নূরীর দিকে তাকিয়ে।
হাস্যময়ী নূরীর একি অবস্থা হয়েছে।
বনহুর কোনদিন কল্পনাও করেনি, নূরীকে সে এইভাবে দেখবে।
অবিরাম গতিতে প্রায় কয়েক ঘন্টা চালানোর পর বন্ধ্যা বনের বাইরে এসে পৌঁছলো বনহুরের মোটর-বোটখানা। এবার চারিদিকে শুধু ফাঁকা, দুধারে সমতল ভূমির মধ্যে মাঝে মাঝে দুএকটা ঝোপঝাড় ও টিলা দেখা যাচ্ছে।
এখানে নদীটা পূর্বের চেয়ে অনেকটা প্রশস্ত। গভীরও বেশ মনে হচ্ছে। স্রোতও রয়েছে খুব।
মোটর-বোটখানা যেন আপন মনে ছুটতে শুরু করলো।
একি! বনহুর চমকে উঠলো, বনহুর বাধ্য হয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো, তবু তীরবেগে মোটর-বোটখানা ছুটে চলেছে।
বনহুর মোটর-বোটখানার মোড় ফেরাতে চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই বাগে আনতে সক্ষম হচ্ছেনা সে। বনহুর এবার বুঝতে পারলোকোন নীচু জলপ্রপাতের সঙ্গে এ নদীটার যোগাযোগ রয়েছে। পাহাড়িয়া নদী অসম্ভব কিছু নেই।
বনহুর ভীত হলো—সত্যই যদি তাই হয়, এই জলধারা যদি কোন উচু স্থান থেকে গভীর নীচে গিয়ে আছড়ে পড়ে তাহলে উপায়! মৃত্যুছাড়া কোন পথ নেই।
কিন্তু এতো করে বেঁচে আসার পর মরতে হবে!
বনহুর সম্মুখের খরস্রোত জলধারার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করতে লাগলো।
নূরীও তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বনহুরের মুখের দিকে। সেও বুঝতে পারছে, তাদের মোটর-বোটখানা কোন বিপদের মুখে ছুটে যাচ্ছে। আজ যদি নূরীর পূর্বের কথা স্মরণ থাকতো তাহলে তার মনে ভেসে উঠতো আর একদিনের কথা। যেদিন নূরী মৃতবৎ শিশু মনিকে নিয়ে নৌকার মধ্যে এমনি এক অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলো।
আজ নূরী সম্পূর্ণ অতীতকে বিস্মৃত হয়েছে।
যাদুকর হরশঙ্কর তাকে এমন একটা ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে যার জন্য নূরী কিছুতেই পূর্ব কথা স্মরণ করতে সক্ষম হচ্ছিলো না।
নূরী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছিলো শুধু। বুঝতে পারছিলো, বিপদ তাদের ঘনিয়ে আসছে।
বনহুর আর নূরীর মোটর-বোট আজ যেদিক ছুটে চলেছে, একদিন ঐ পথেই নূরী আর মনিসহ নৌকাখানা ছুটে চলেছিলো। ভাগ্য সেদিন প্রসন্ন ছিলো, তাই নৌকাখানা আটকে গিয়েছিলো দুটি পাথর খণ্ডের সঙ্গে। আর আজ ঠিক তার অপর দিক দিয়ে বনহুর আর নূরীর নৌকা দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে।
আর বেশী নয়, প্রায় অর্ধমাইল দূরেই সেই ভীষণ জলপ্রপাত। হাজার হাজার ফিট নীচে আছড়ে পড়ছে খরস্রোত নদীটা।
বনহুর আর নূরী মৃত্যুর জন্য যেন প্রতীক্ষা করছে। নদীবক্ষে এবার মাঝে মাঝে পাথরখণ্ড দেখা যাচ্ছে। বনহুর আতঙ্কিত হলো, হঠাৎ যদি ওর একটা পাথরের সঙ্গে তাদের মোটর-বোট খানা ধাক্কা খায় তাহলে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে বোট-খানা, সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থাও হবে মর্মবিদারক।
বনহুর আর নূরীর মোটর বোট অতি অল্পক্ষণে সেই ভয়ঙ্কর জলপ্রপাতের নিকটবর্তী হয়ে পড়লো।
শিউরে উঠলো বনহুর।
তার সাহসী প্রাণও কেঁপে উঠলো। মুর্হত বিলম্ব না করে নূরীকে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো নদীবক্ষে।
প্রচণ্ড জলোচ্ছাসে সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেলো উভয়ে।
বনহুর নূরীকে দৃঢ় হস্তে ধরে রাখলো অতি সাবধানে।
কিন্তু কিছুতেই বনহুর নিজকে স্থির রাখতে পারছেনা। খরস্রোতে ভেসে যাচ্ছে ওরা দুজনা।
নূরীও মরিয়া হয়ে ধরে আছে বনহুরকে।
সেকি দারুণ অবস্থা, একবার ডুবছে, একবার উঠছে, কখনও ভেসে যাচ্ছে। অদূরেই জলপ্রপাত।
হাজার হাজার ফিট নীচে আছড়ে পড়ছে পানিগুলো।
বনহুর আর নূরী মোটর-বোট থেকে নদীবক্ষে লাফিয়ে পড়তেই বোটখানা তীর বেগে ছুটে গেলো, পরক্ষণেই হাজার ফিট নীচে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।
বনহুর আর নুরী ঝাপটা ঝাপটি করছে।
দুজন দুজনাকে আঁকড়ে ধরে আছে প্রাণপণে।
তবু ভেসে ভেসে গড়িয়ে যাচ্ছে ওরা, কিছুতেই আর রক্ষা নেই। হঠাৎ বনহুর সম্মুখে একটা পাথর পেয়ে আঁকড়ে ধরলো। প্রথম হাত ফসকে গেলো, এই হয়েছিলো আর কি, আবার বনহুর এটে ধরলো পাথরটা। কোনরকমে নূরীকে নিয়ে পাথরটার উপরে চড়ে বসলো বনহুর।
