বনহুর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েও বুক দিয়ে এগুতে লাগলো। হঠাৎ তার হাতে একটা লম্বা হ্যাণ্ডেলের মত কিছু লাগলো বলে মনে হলো তার।
বনহুর প্রাণ পণ চেষ্টায় হ্যাণ্ডেলের মত জিনিসটা ধরে টান দিলোসঙ্গে সঙ্গে সুড়ঙ্গ মুখ থেকে একটা বিরাট কিছু সরে যাচ্ছে বলে অনুভব করলো। একট ঝাপসা আলোর রশ্মি সুড়ঙ্গ পথে নেমে এলো নীচে।
বনহুর এতোক্ষণে বাঁচবার ভরসা পেলো। বুঝতে পারলো—ঐ হ্যাণ্ডেলটা অন্য কিছু নয়, সুড়ঙ্গ মুখের আবরণ উন্মোচন করার একটি যন্ত্র।
এবার বনহুর হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও বা বুকে চলে সুড়ঙ্গ-মুখের বাইরে এসে পৌঁছলো।
প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো বনহুর।
তারপর উঠে দাঁড়ালো, কপাল বেয়ে তখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। হাতের পিঠে গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে নিয়ে ফিরে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো, দুজন যমদূতের মত বলিষ্ঠ লোক বর্শা হাতে ছুটে আসছে তাকে দেখতে পেয়ে।
বনহুর মুহূর্তে প্রস্তুত হয়ে নিলো।
মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিশ্বাস নিয়ে সে আবার পূর্ব শক্তি সঞ্চয় করে নিতে পেরেছে।
ভয়ঙ্কর লোক দুটো তীর বেগে ছুটে আসছে।
বনহুর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, পালাবার জন সে নয়। দাঁড়িয়ে থেকে মৃত্যুকে বরণ করবে, নয় ওদেরকে পরাজিত করবে।
লোক দুটি বর্শা উঁচিয়ে ছুটে এলো।
বনহুর সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে উবু হয়ে শুয়ে পড়লো।
অমনি লোকদুটি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো ভূতলে।
বনহুর মুর্হত বিলম্ব না করে একজন ভূতলশায়ী লোকের হাত থেকে বর্শা কেড়ে নিয়ে সজোরে বসিয়ে দিলো তার বুকে।
তীব্র আর্তনাদ করে লোকটা মুখ বিকৃত করে ফেললো।
অন্য একজন সে ধড়মড় করে উঠে রুখে এলো বনহুরের দিকে। কিন্তু বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা তার একার কাজ নয়। লোকটা যখন এগুলো অমনি বনহুরের বর্শা বিদ্ধ হলো তার বুকে।
বনহুর এক ঝটকায় লোকটার বুক থেকে বর্শা উচিয়ে নিতেই হুমড়ি খেয়ে লোকটা পড়ে গেলো ভূতলে,ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো।
আর এক দণ্ড বিলম্ব না করে বনহুর বর্শা হাতেই ছুটলো বনের পশ্চিমাংশে।
কাঠ দিয়ে তৈরী সেই কুটির নিকটে পৌঁছে হতবাক হলো। কাঠের তৈরী কুটিরখানা শূন্য পড়ে রয়েছে—কুঠরিতে একটি জনপ্রাণী নেই।
বনহুর হতভম্ব হলো, এতোগুলি নারী সব গেলো কোথায়? কোথায়ই বা
নূরী, বনহুরের মাথায় যেন আকাশ ভেংগে পড়লো। নূরীকে বুঝি পেয়েও আবার হারালো সে।
ক্ষুধায় পিপাসায় অত্যন্ত কাতর বনহুর। প্র
থমে তার এতোটুকু পিপাসা নিবারণের প্রয়োজন।
বনহুর চারিদিকে লক্ষ্য করে দ্রুত এগুতে লাগলো বনের মধ্যে পাহাড়িয়া নদীটার দিকে।
এতো বেশী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো বনহুর, আর হাটতে পারছেনা তবু চললো সে।
নদীটার নিকটবর্তী হয়ে বনহুর হাটু গেড়ে বসে পড়লো।
সচ্ছ সাবলীল জলধারা কল কল করে ছুটে চলেছে। বনহুর আজলা ভরে পানি তুলে নিয়ে পান করলো। একটা অনাবিল তৃপ্তি বনহুরের সমস্ত দেহ। মনকে ভরিয়ে দিলো। প্রাণ ভরে সুশীতল পানি পান করলো সে।
এমন সময় হঠাৎ একটা ঝুপ ঝাপ শব্দ কানে ভেসে এলো বনহুরের। ফিরে তাকালো আচম্বিতে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠলো বনহুর। অদূরে নদীবক্ষে একটা মোটর-বোট দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই একটা লোক একটি যুবতীকে মোটর-বোটটায় তুলে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে।
বনহুর তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো-লোকটা যুবতীকে টেনে হিচড়ে মোটর-বোটে উঠিয়ে নিলো।
মুহূর্ত বিলম্ব না করে বনহুর ছুটলো সেই দিকে।
যুবতী যেই হোক তাকে নিশ্চয়ই কোন শয়তান জোরপূর্বক হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে।
বনহুর প্রাণপণে ছুটলো।
লোকটা তখন যুবতীর হাত পা মজবুত করে বাঁধছিলো।
যুবতী হাত পা ছোড়াছুড়ি করায় বাঁধতে বিলম্ব হচ্ছিল তার। হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিলো লোকটা।
বনহুরকে ছুটে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি ইঞ্জিনের পাশে গিয়ে বসেলো; যেমন স্টার্ট দিতে যাবে, অমনি বনহুর ব্যাঘের মত ঝাপিয়ে পড়লো মোটরবোট খানার উপরে।
বলিষ্ট মুষ্ঠিতে চেপে ধরলো লোকটার গলা।
লোকটাও কম শক্তিশালী নয়, সেও দুহাত দিয়ে নিজকে বাঁচিয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগলো।
শুরু হলো ভীষণ ধস্তাধস্তি।
একবার বনহুর পড়ে যাচ্ছে নীচে, লোকটা চেপে বসছে তার বুকে। আবার লোকটা নীচে পড়ে যাচ্ছে, বনহুর উঠে বসছে ওর বুকে। চললো সেকি অদ্ভুত লড়াই।
কিন্তু বনহুরের সঙ্গে পেরে উঠা সেকি যার তার কর্ম!
দৃঢ় মুষ্ঠিতে বনহুর টিপে ধরলো লোকটার গলা। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ দিতে লাগলো।
একটা গোঙ্গানীর শব্দ বেরিয়ে এলো লোকটার মুখ থেকে। পরক্ষণেই তাজা লাল টুকটুকে রক্ত গড়িয়ে পড়লো মোটর-বোট খানার, মেঝেয়। কয়েকবার ঝাঁকুনি দিয়ে নীরব হয়ে গেলো লোকটার দেহ।
বনহুর এবার উঠে দাঁড়ালো লোকটার বুক থেকে, তারপর যুবতীর দিকে ফিরে তাকাতেই বিস্মিত হলো, যুবতী অন্য কেহ নয়-নূরী। আনন্দে বনহুরের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
নূরী তখন বনহুরের দিকে অপরিচিতের মত তাকিয়ে আছে।
বনহুর দ্রুত এগিয়ে এলো নূরীর নিকটে, আবেগ ভরা কণ্ঠে ডাকলো–নূরী!
নূরী ভীতভাবে তাকিয়ে বললো, না না আমি তোমাকে চিনি নে। কে তুমি?
নূরী, আমি তোমার হুর—তোমার সাথী।
না, আমার মনে পড়ে না তোমার কথা। তোমাকে আমি কোন দিন দেখি নি।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠে বনহুর-নূরী। দুহাতে ওকে টেনে নিতে যায় কাছে।
