বনহুর হরশঙ্করকে এতো সহজে মৃত্যুবরণ করতে দেখে হতবাক হয়েছিলো। এবার বুঝতে পারলো—গাছের শিকড়ে তৈরী খোলসটা অত্যন্ত আঁটসাট, ওর মধ্যে প্রবেশ করলে কেউ নড়তে পারবে না। যতক্ষণ না ধীরেসুস্থে সে পিছন দিয়ে বের হয়।
বনহুর খোলসটা নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলো।
হঠাৎ খোলসের ভিতরে এক জায়গায় নজর পড়তেই বিস্ময়ে আড়ষ্ট হলো। কতকগুলো কল-কজার মত জিনিস আঁটা রয়েছে। বনহুর একটা সুইচের মত জিনিসে চাপ দিতেই অকস্মাৎ ধূম্র রাশিতে ভরে উঠলো স্থানটা। অবাক হলো বনহুর। আর একটা চাকার মত জিনিস নজরে পড়লো তার। এবার সে ঐ চাকার মত জিনিসটায় হাত দিলো। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো। সম্মুখে একটা জায়গার মাটি সরে গেলো ধীরে ধীরে এক পাশে। বনহুর দ্রুত এগিয়ে গেলো, দেখলো একটি সুড়ঙ্গ পথ বেরিয়ে এসেছে।
বনহুর দ্রুত সেই সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করলো।
ভয় ভীতি বলতে কিছুই ছিলোনা তার। সুড়ঙ্গের ধাপে ধাপে পা রেখে সন্তর্পণে নীচে নামতে লাগলো। কিছুদূর এগুতেই বনহুরের শরীরে একটা গরম তাপ অনুভব করলো। আর একটু এগুতেই দেখতে পেলো একটা মেশিনের মত জিনিস অবিরাম চক্রাকারে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারই একটা নল উঠে গেছে উপরের দিকে বনহুর বুঝতে পারলো—এই মেশিনটাই গভীর মাটির নীচে ধূম্র সৃষ্টি করছে, আর ঐ নলটা দিয়ে ধূম্র-রাশি উপরে উঠে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। হরশঙ্কর তার বটবৃক্ষের শিকড়ের খোলসের মধ্যে বসে এই সব যন্ত্র চালনা করতো। এটাই ছিলো মায়াজালের মায়াচক্র। এখান থেকে সৃষ্টি করতো সে নানা সময় না না অদ্ভুত জিনিস।
বনহুর আর বিলম্ব না করে দ্রুত সুড়ঙ্গ বেয়ে উঠে এলো উপরে, কিন্তু সুড়ঙ্গের বাইরে আসার সুযোগ তার হলো না, সঙ্গে সঙ্গে মাথায় প্রচণ্ড একটা আঘাত অনুভব করলো।
হরশঙ্করের কয়েকজন অনুচর দাঁড়িয়েছিলো সুড়ঙ্গ পথের মুখে, তারা গুরুদেবের মৃতদেহ বটবৃক্ষ তলায় পড়ে থাকতে দেখে বুঝতে পেরেছিলোনিশ্চয়ই কোন অজ্ঞাত লোক গুরুদেবকে হত্যা করেছে এবং তারা দেখতে পেয়েছিলো, সুড়ঙ্গের মুখ খোলা, তাই পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিলো।
বনহুর অকস্মাৎ মস্তকে আঘাত পাওয়ায় টাল সামলাতে পারলো না, ঘুরপাক খেয়ে পড়ে গেলো নীচে।
তারপর যখন জ্ঞান ফিরলো অসহ্য, একটা চাপ অনুভব করলো নিজের বুকে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো বনহুর, কিন্তু চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়লোনা। দক্ষিণ হাতখানা বুকের দিকে আনতেই বুঝতে পারলো তার বুকের উপর বিরাট একখানা পাথর রাখা হয়েছে।
বনহুরের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। মাথায় হাত বুলাতেই হাতখানা ভিজে চুপসে উঠলো। কেমন চটচটে মনে হলো, তবে কি তার মাথাটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়েছিলো!
বনহুর এবার বুকের উপর থেকে পাথরটা নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলো। অসমী শক্তির অধিকারী বনহুর। যদিও পাথরখণ্ডটা বিরাট বড় এবং ভয়ঙ্কর ভারী, তবু বনহুর অল্পক্ষণের মধ্যেই সেটা নামিয়ে ফেলতে সক্ষম হলো।
উঠে বসলো বনহুর, তাকালো চারিদিকে।
জমাট অন্ধকার।
একটা শব্দ কানে ভেসে আসছে বনহুরের। ভাল করে লক্ষ্য করতেই বুঝতে পারলো—এটা সেই সুড়ঙ্গর মধ্যের মেশিন-কক্ষ। এতোক্ষণ সে ঐ মেশিন-কক্ষের মেঝেই শুয়েছিলো।
উঠে দাঁড়ালো বনহুর।
অতি সাবধানে এগুতে লাগলো, হঠাৎ যদি ঐ ঘূর্ণিয়মান মেশিনটায় গিয়ে পড়ে তাহলে তার দেহটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। তাই বনহুর যে দিকে থেকে শব্দটা আসছিলো সেদিক না এগিয়ে অপর দিকে এগুতে লাগলো।
বনহুর আন্দাজেই বুঝে নিলো, সুড়ঙ্গ মুখটা তখন কোন দিকে ছিলো। অল্প সময়ে সুড়ঙ্গ মুখ আবিষ্কার করে নিলো সে। এবার বনহুর এগুতে লাগলো সুড়ঙ্গ পথে, কিন্তু সুড়ঙ্গ মুখ বন্ধ থাকায় বের হতে পারলো না।
সুড়ঙ্গ পথটা অত্যন্ত সংকীর্ণ ও চাপা হওয়ায় কয়েক বার মাথায় আঘাত পেলো বনহুর। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে। একটা ভ্যাপসা গন্ধে তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো।
বনহুর বাইরে বের হবার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠলো।
অসহ্য লাগছে, বৈশীক্ষণ এভাবে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হলে মৃত্যু তার অনিবার্য।
বনহুর সুড়ঙ্গ পথের দেয়াল হাতড়ে দেখতে লাগলো ভিতর থেকে। বাইরে বের হবার কোন উপায় আছে কিনা। কিন্তু আর যেন দাঁড়াতে পারছে না, নিশ্বাস নিতে ভয়ংকর কষ্ট হচ্ছে। তবু অনেক কষ্টে দেয়াল হাতড়ে চললো বনহুর।
এই বুঝি তার জীবনের শেষ পরিণতি!
এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ মধ্যে ছিলো দস্যু বনহুরের মৃত্যু!
বসে পড়লো বনহুর,খুব কষ্ট হচ্ছে তার।
সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে উঠেছে। হাঁপাচ্ছে সে। তবু অনেক কষ্টে আবার উঠে দাঁড়ালো, মৃত্যুর পূর্বে আর একবার শেষ চেষ্টা করবে সে।
কিন্তু দাঁড়াতে পাড়লো না বনহুর, পা দুখানা শিথিল হয়ে আসছে। পড়ে গেলো হুমড়ি খেয়ে……
এখানে বনহুর যখন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে ডাকলো—মা……
ঠিক সেই মুহূর্তে মরিয়ম বেগম ফজরের নামাজান্তে খোদার নিকটে হাত তুলে মোনাজাত করছিলেন–হে দয়াময়, পাক-পরওয়ারদেগার, তুমি আমার মনিরকে সুস্থ সবল রেখো। যেখানেই থাক সে, তাকে তুমি রক্ষা করো, দেখো প্রভু।
মায়ের এ প্রার্থনা খোদা কবুল করলেন।
